তেহেরান: হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার চেষ্টার অভিযোগ তুলে ইরানে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-র ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে আমেরিকার সেনাবাহিনী। মঙ্গলবার এই হামলা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা আমেরিকান সেনাদের বিরুদ্ধে আইআরজিসি-র সাম্প্রতিক হামলার চেষ্টার পরেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
সেন্টকম জানিয়েছে, মঙ্গলবার ১৬০০ জিএমটি থেকে ইরানে হামলা শুরু হয়। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ওই অঞ্চলে থাকা আমেরিকান সেনাদের বিরুদ্ধে আইআরজিসি-র সাম্প্রতিক হামলার চেষ্টার পরেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে সরাসরি আমেরিকান হামলার খবর না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি ফের দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর পাশাপাশি পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: পরিবহনে বিপ্লব আনতে অস্ট্রেলিয়ার কনসাল জেনারেল বার্নার্ড লিঞ্চের সঙ্গে বৈঠকে অর্জুন
এর আগে সোমবার হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে থাকা দুটি রকেট লঞ্চার লক্ষ্য করে সীমিত ও নির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছিল আমেরিকার সেনাবাহিনী। সেন্টকম জানিয়েছিল, ওই রকেট লঞ্চারগুলিতে হামলার প্রস্তুতি চলছিল। সেগুলি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে রকেট ছোড়া এবং সমুদ্রের নিচে মাইন বা বিস্ফোরক পেতে রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল বলে দাবি করেছিল আমেরিকা।
লারাক দ্বীপে আমেরিকার হামলায় দু’জন নিহত এবং দু’জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের আইআরজিসি। এরপর আমেরিকার হামলার জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয় ইরানের এই শক্তিশালী সামরিক বাহিনী।
এর পরেই ইরান জানায়, তারা জর্ডানে থাকা আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সোমবার ভোরে তারা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দিয়েছে।
ইরানের সরকারি টেলিভিশন আরও দাবি করে, ইরানি বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে থাকা একটি বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই দাবি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, একটি ড্রোন তারা গুলি করে নামিয়েছে।
আরও পড়ুন: ৫ দিনের ব্যাংকিং সপ্তাহের দাবিতে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে ব্যাংক ধর্মঘট
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সরকারি টেলিভিশনে উদ্ধৃত এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরান যুদ্ধ চায় না। তবে যারা আগ্রাসন চালাবে, তাদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেওয়া হবে।
বর্তমান সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে অবস্থিত এই জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে সরু অংশে এর প্রস্থ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দুই পক্ষের সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহণের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে যেত। ফেব্রুয়ারি থেকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা তৈরি করেছে।
ইরান লারাক দ্বীপের কাছ দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচলের ক্ষেত্রে পরীক্ষা বা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি, ওই জলপথ দিয়ে যাওয়ার জন্য জাহাজগুলিকে ২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: ভয়ঙ্কর বন্যায় কীভাবে টিকে রইল নেপালের সেই ‘সবুজ বাড়ি’? জানালেন খোদ মালিক
ইরানের আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম দাবি করেছে, লারাক দ্বীপে আমেরিকার হামলা ড্রোন ব্যবহার করে চালানো হয়েছিল। পরে ইরানের সংবাদমাধ্যম জানায়, আমেরিকার হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে আইআরজিসি জর্ডানের কিং হুসেইন এবং আল-আজরাক সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
ইরানের বিদেশ মন্ত্রক লারাক দ্বীপে আমেরিকার হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। এই হামলাকে তারা আমেরিকার সামরিক আগ্রাসন বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে জর্ডানের ঘাঁটিতে হামলাকে বৈধ আত্মরক্ষা বলে দাবি করেছে তেহরান।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরে ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, আমেরিকা এর জবাব কঠোরভাবে দেবে।
হরমুজ প্রণালিতে একটি সুপারট্যাঙ্কার সমুদ্রের মাইনে ধাক্কা খেয়ে আগুন ধরে যাওয়ার বিষয়ে আইআরজিসি-র করা আগের দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে সেন্টকম। আইআরজিসি দাবি করেছিল, ইরানের অনুমোদন না থাকা একটি পথ দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করার সময় ওই জাহাজটি সমুদ্রের মাইনে ধাক্কা মারে এবং আগুন ধরে যায়।
তাসনিম একটি জাহাজে আগুন লাগার ছবি প্রকাশ করলেও সেটি কোন ট্যাঙ্কারের ছবি বা কখন ছবিটি তোলা হয়েছিল, তা জানায়নি। ফলে ওই দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সেন্টকম এই দাবিকে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে ভয় দেখানোর জন্য আইআরজিসি-র ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য বলে অভিহিত করেছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালিতে যে মাইন পেতেছিল, সেগুলির কিছু বিস্ফোরিত হয়েছে এবং কিছু সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নতুন করে কোনও জাহাজে মাইন পেতে দেওয়ার চেষ্টা হলে সেটি ধ্বংস করা হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। তবে ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এই দাবিকে প্রচারমূলক বিভ্রান্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ইরান ও আমেরিকার এই সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি তেহরানের উপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। ২৪ আগস্ট আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এর লক্ষ্য ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করা এবং ইরানকে সমর্থন করা দেশ ও সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানো।
এর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধও বজায় রেখেছে আমেরিকা। শনিবার সেন্টকম জানিয়েছিল, অবরোধের অংশ হিসেবে তাদের বাহিনী তিনটি জাহাজের কার্যক্রম বন্ধ করেছে, দুটি জাহাজে উঠে তল্লাশি চালিয়েছে এবং ৮২টি জাহাজের গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে শুরু করা সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে থামানোর পর ইরানে আমেরিকার এটিই প্রথম জানা হামলা। ফলে লারাক দ্বীপে হামলা এবং তার পরবর্তী পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আমেরিকা ও ইরানের সংঘাত আরও বড় আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ঘিরে পরিস্থিতি আগামী দিনগুলিতে কীভাবে এগোয়, সেদিকেই নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের।
