H4 EAD নিয়ে নতুন মার্কিন পদক্ষেপ, ভারতীয় স্বামী-স্ত্রীদের এখনই কেন আতঙ্ক নয়

ওয়াশিংটন:  ট্রাম্প প্রশাসনের এইচ-৪ কর্মসংস্থান অনুমোদন বা এইচ-৪ ইএডি (H4 EAD) নিয়ে সর্বশেষ পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হাজার হাজার ভারতীয় পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে…

h4-ead-latest-us-action-indian-spouses-what-it-means

ওয়াশিংটন:  ট্রাম্প প্রশাসনের এইচ-৪ কর্মসংস্থান অনুমোদন বা এইচ-৪ ইএডি (H4 EAD) নিয়ে সর্বশেষ পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হাজার হাজার ভারতীয় পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার: এই মুহূর্তে এইচ-৪ ইএডি হোল্ডারদের জন্য কোনও নিয়ম পরিবর্তন হয়নি।

Advertisements

মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বা ডিএইচএস তাদের নিয়ন্ত্রক কর্মসূচির তালিকায় একটি প্রস্তাব যুক্ত করেছে। এর শিরোনাম, “রিমুভিং এইচ-৪ ডিপেনডেন্ট স্পাউসেস ফ্রম দ্য ক্লাসেস অব ননসিটিজেনস এলিজিবল ফর এমপ্লয়মেন্ট অথরাইজেশন (ইএডি)”।

   

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ২০১৫ সালের সেই নিয়ম বাতিল হতে পারে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী এইচ-১বি কর্মীদের এইচ-৪ ভিসাধারী স্বামী বা স্ত্রী কর্মসংস্থানের অনুমতি বা ইএডি-র জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে এটিকে এখনও প্রস্তাবিত নিয়ম বলা যাচ্ছে না।

এখনই এইচ-৪ ইএডি বন্ধ হচ্ছে না

ডিএইচএস-এর নিয়ন্ত্রক কর্মসূচির তালিকায় বিষয়টি “লং-টার্ম অ্যাকশন” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়ম প্রকাশের তারিখও এখনও নির্ধারিত হয়নি। অর্থাৎ, বর্তমানে কোনও খসড়া নিয়ম প্রকাশিত হয়নি এবং সেটি প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়সীমাও নেই। আপাতত এটি ভবিষ্যতে ডিএইচএস কী নিয়ে কাজ করতে চায়, তার একটি ইঙ্গিত মাত্র।  এইচ-৪ ইএডি বাস্তবে বাতিল করতে হলে ডিএইচএস-কে বেশ কয়েকটি ধাপ পেরোতে হবে।

Advertisements

প্রথমে একটি প্রস্তাবিত নিয়ম প্রকাশ করতে হবে। এরপর সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়ার জন্য পাবলিক কমেন্টের সুযোগ দিতে হবে। সেই মতামত পর্যালোচনা ও তার জবাব দেওয়ার পর চূড়ান্ত নিয়ম প্রকাশ করতে হবে এবং তার কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় অন্তত কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। কোনও চূড়ান্ত নিয়ম আদালতে চ্যালেঞ্জও হতে পারে।

ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নি জনাথন ওয়াসডেন এইচ-৪ ইএডি হোল্ডারদের এখনই আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমান উদ্যোগ থেকে বাস্তবে নিয়ম পরিবর্তন হওয়ার আগে এখনও দীর্ঘ প্রক্রিয়া বাকি।

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, অতীতেও একই ধরনের উদ্যোগ অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ সংক্রান্ত সমস্যার কারণে চূড়ান্ত নিয়মে পরিণত হয়নি। তাঁর মতে, নতুন নিয়ম হলেও সেটির প্রভাব ভবিষ্যৎ বা প্রস্পেক্টিভ হতে পারে। ফলে বর্তমানে যোগ্যতা অর্জন করে ইএডি থাকা ব্যক্তিরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, এমনটা এখনই বলা যায় না।

ভারতীয় পরিবারগুলির জন্য বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

এইচ-৪ ইএডি-র গুরুত্ব বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এমপ্লয়মেন্ট-বেসড গ্রিন কার্ড ব্যাকলগের দিকে তাকাতে হবে।  হাজার হাজার ভারতীয় পরিবারের কাছে এইচ-১বি ভিসা শুধু সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার সুযোগ নয়। গ্রিন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের দীর্ঘ অপেক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।

ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর আমেরিকান পলিসি বা এনএফএপি-র সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম তিনটি এমপ্লয়মেন্ট-বেসড গ্রিন কার্ড ক্যাটেগরিতে নির্ভরশীল সদস্যসহ ১০ লাখেরও বেশি ভারতীয় অপেক্ষায় ছিলেন। অনেক ভারতীয় পেশাদার এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার পাশাপাশি ইবি-২ অথবা ইবি-৩ ক্যাটেগরির মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের চেষ্টা করেন।

ইবি-২-তে অ্যাডভান্সড ডিগ্রিধারী পেশাদার এবং বিজ্ঞান, শিল্প বা ব্যবসায় অসাধারণ দক্ষতার অধিকারীরা পড়েন। নির্দিষ্ট শর্তে স্নাতক ডিগ্রির পর পাঁচ বছরের প্রগতিশীল অভিজ্ঞতাও অ্যাডভান্সড ডিগ্রির সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।  ইবি-৩ ক্যাটেগরিতে পেশাদার, দক্ষ কর্মী এবং অন্যান্য কর্মীরা অন্তর্ভুক্ত।

ভারতীয়দের গ্রিন কার্ড পেতে অপেক্ষা কত দীর্ঘ?

এনএফএপি-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি বা তার পরে ভারতীয় নাগরিকদের এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ইমিগ্রেশন পিটিশন বা লেবার সার্টিফিকেশন আবেদন করা হলে ইবি-২ ক্যাটেগরিতে স্থায়ী বসবাসের জন্য সম্ভাব্য অপেক্ষার সময় ১৭৯ বছর পর্যন্ত হতে পারে। ইবি-৩ ক্যাটেগরিতে সম্ভাব্য অপেক্ষার সময় প্রায় ৩৮ বছর পর্যন্ত হতে পারে।  এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণেই এইচ-৪ ইএডি অনেক ভারতীয় পরিবারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এইচ-৪ ইএডি কী সুবিধা দেয়?

এইচ-৪ ইএডি থাকার ফলে যোগ্য এইচ-৪ ভিসাধারী স্বামী বা স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করতে পারেন।  অনেক ক্ষেত্রেই এই ব্যক্তিরা উচ্চশিক্ষিত এবং নিজের পেশাগত ক্যারিয়ার তৈরি করতে চান। ইএডি তাদের কাজ করার পাশাপাশি স্বাধীনভাবে আয় করার সুযোগ দেয়। কেউ চাকরি করতে পারেন, কেউ স্বনিযুক্ত হিসেবে কাজ করতে পারেন। ফলে দীর্ঘ গ্রিন কার্ড অপেক্ষার সময়েও পরিবারে দ্বিতীয় উপার্জনের উৎস তৈরি হয়। প্রায় এক লাখ ভারতীয় স্বামী বা স্ত্রী এইচ-৪ ইএডি ধারণ করেন বলে বিভিন্ন হিসাব থেকে জানা যায়। তাই এই কর্মসংস্থান অনুমোদন শেষ হয়ে গেলে বিপুল সংখ্যক পরিবারের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব পড়তে পারে।

২০১৫ সালে কেন এইচ-৪ ইএডি চালু হয়েছিল?

এইচ-৪ ইএডি নিয়মটি ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় চালু হয়।  এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে এমপ্লয়মেন্ট-বেসড গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলিকে কিছুটা আর্থিক ও পেশাগত স্বাধীনতা দেওয়া। নির্দিষ্ট এইচ-৪ স্বামী বা স্ত্রী তখন ইএডির জন্য আবেদন করতে পারতেন, যদি তাদের এইচ-১বি ভিসাধারী স্বামী বা স্ত্রী গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে থাকেন অথবা স্বাভাবিক ছয় বছরের সীমার পর এইচ-১বি ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করে থাকেন।

এই লড়াই নতুন নয়

এইচ-৪ ইএডি বাতিলের চেষ্টা এর আগেও হয়েছে।  প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৭ সালে এইচ-৪ ইএডি যোগ্যতা বাতিল করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। তবে সেই উদ্যোগ কখনও প্রস্তাবিত নিয়ম প্রকাশের পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়নি এবং শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করা হয়। এই কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াইটিও চলেছে।

সেভ জবস ইউএসএ নামের একটি সংগঠন এইচ-৪ ইএডি নিয়মকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছিল। তাদের দাবি ছিল, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের অধীনে ডিএইচএস এইচ-৪ নির্ভরশীলদের কাজের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে কলাম্বিয়া সার্কিট কোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখে। সেই রায়ে বলা হয়েছিল, এইচ-৪ ভিসাধারীদের ইএডি দেওয়ার ক্ষমতা ডিএইচএস-এর রয়েছে।

এখন কী করবেন এইচ-৪ ইএডি হোল্ডাররা?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সহজ৷ এইচ-৪ ইএডি বর্তমানে কার্যকর রয়েছে। তাই শুধু ডিএইচএস-এর নিয়ন্ত্রক কর্মসূচির তালিকায় নতুন উদ্যোগ যুক্ত হওয়ার কারণে এখনই কাজের অনুমতি হারানোর আশঙ্কা করার কারণ নেই। আসল পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে তখনই, যখন ডিএইচএস ফেডারেল রেজিস্টারে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবিত নিয়ম প্রকাশ করবে। সেই পর্যায়ে জানা যাবে, ডিএইচএস ঠিক কাদের প্রভাবিত করতে চাইছে, কী পরিবর্তন আনতে চাইছে এবং তা কখন কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে। ততদিন ভারতীয় পরিবারগুলির উচিত বিষয়টি সম্পর্কে আপডেট থাকা, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিকে তাৎক্ষণিক এইচ-৪ ইএডি বাতিল হিসেবে দেখা উচিত নয়।

তবে এইচ-৪ ইএডি হোল্ডারদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার। ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর বা তার পরে জমা দেওয়া ইএডি নবীকরণ আবেদনের ক্ষেত্রে ডিএইচএস স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মসংস্থান অনুমোদনের মেয়াদ বাড়ানোর সুবিধা বন্ধ করেছে। এর ফলে কিছু কর্মীর ক্ষেত্রে নবীকরণ প্রক্রিয়া চলাকালীন কাজের অনুমতিতে ফাঁক তৈরি হয়েছে এবং চাকরি হারানো, আর্থিক চাপ ও অন্যান্য সমস্যার ঘটনায় আদালতে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। সুতরাং, এখনই আতঙ্ক নয়, বরং পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবিত নিয়ম প্রকাশিত হয় কি না, সেটিই নজরে রাখার বিষয়।

Advertisements