বদলের বঙ্গে সক্রিয় বাম! অস্তিত্বের সংকটে তৃণমূল

রানা দাস, কলকাতা: ২০১২ সাল থেকে বামেরা প্রচার করছে লালবৈশাখি আসছে। সেটা আজও আসেনি। উল্টে ৫ বছর শূন্যের গেরোয় ছিল। ছাব্বিশে একটা আসন কপালে জুটেছে।…

west-bengal-politics-left-revival-tmc-existential-crisis-2026 West Bengal Politics

রানা দাস, কলকাতা: ২০১২ সাল থেকে বামেরা প্রচার করছে লালবৈশাখি আসছে। সেটা আজও আসেনি। উল্টে ৫ বছর শূন্যের গেরোয় ছিল। ছাব্বিশে একটা আসন কপালে জুটেছে। তবে গেরুয়া রাজ্যে রাজনীতিতে (West Bengal Politics) প্রাসঙ্গিক হয়েছে লাল ঝান্ডা। মালদহ-মুর্শিদাবাদের মতো জায়গায় যেন জেগে উঠেছে কংগ্রেস। আর ক্ষমতা হারিয়ে ছন্নছাড়া তৃণমূল ভুগছে অস্তিত্বের সংকটে।

Advertisements

১৯৭৭ থেকে ২০১১- টানা ৩৪ বছর রাজ্য শাসন করেছে বামেরা। আজও তা রেকর্ড। তারপর ক্ষমতায় এল তৃণমূল। ক্ষয় হতে সুরু করল বামেদের শক্তি। ২০১৬ সালে ক্ষমতার লোভে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেছিল। লাভের লাভ কিছুই হয়নি। উল্টে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা বাড়ে। তাদের অনেকে তৃণমূলে নাম লিখিয়ে মমতার হাত শক্ত করে। তখনও কিছু কমরেড আশা ছাড়েনি। খাতায় কমলে তখনও বিরোধী দল বামেরা। কিন্তু নানান নীতি মূলত ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থে পদে পদে হোঁচট খেতে হচ্ছিল কমরেডদের। কারণ মুসলিম তোষণের শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল তৃণমূল। আর সেই পরিস্থিতিতে বিজেপির দিকে ঝুঁকছিল সংখ্যাগুরু বাঙালিদের বড় অংশ।

   

Also Read | ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৌদি-তুরস্ক কতটা পাশে থাকবে! সন্দেহ বিশেষজ্ঞদের

বঙ্গে বিজেপির হাওয়া টের পাওয়া গিয়েছিল ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে। তবে সাংগঠনিক শক্তি কম থাকায় সেভাবে লড়াই দিতে পারেনি। ২০১৬ সালেও আহামরি কিছু না হলেও অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল। ২০১৭ থেকে খেলা ঘুরতে শুরু করে। রাজ্যের নানা প্রান্তে তৃণমূলস্তরে বিজেপিতে নাম লেখায় বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মীরা। বেশিরভাগই তৃণমূলের দ্বারা অত্যাচারিত কিংবা তৃণমূলের বঞ্চিত। এর মধ্যে বড় চমক ছিল সে বছরের শেষের দিকে। ঘাস ফুল ছেড়ে পদ্ম বাগানে সামিল হন মুকুল রায়। যার ফল টের পাওয়া যায় ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে।

Advertisements

মুকুল রায় বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে ভালো ফল করে তৃণমূল। তবে সে সবই ছিল দাদাগিরির কামাল। সেই পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূলের তাণ্ডব বিজেপির এগনোর পথ সহজ করে দিয়েছিল। ২০১৯ সালের ভোটের আগে সৌমিত্র খাঁ, অর্জুন সিংয়ের মতো নেতারাও বিজেপিতে নাম লেখায়। তখনই রাজ্যের রাজনীতি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। তৃণমূল আর বিজেপি। প্রধান বিরোধী দল বামেদের নিয়ে আলোচনাও প্রায় শেষ। তারা যে লড়াই থেকে হারিয়ে গেল সেটা নিয়েই চর্চা হতো। উনিশের পর একুশে ক্ষমতা দখলে আত্মবিশ্বাসী ছিল বিজেপি। কিন্তু সেটা হয়নি। এর পিছনেও বড় ভূমিকা ছিল বামেদের। বিজেপির বিরুদ্ধে বামেদের জোরাল প্রচারে ভারি হয়েছিল তৃণমূলের ঝুলি। অন্যদিকে, বিজেপি নেতাদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যেন ডুবিয়ে দিয়েছেন প্রবল সম্ভাবনাময় পরিবর্তন। আর সেবছরই বিধানসভায় শূন্য হয়ে যায় সিপিএম।

Also Read | যাদবপুরে ধুন্ধুমার! বোতল-পাথর বৃষ্টি, পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা ABVP-SFI-এর

একুশের ভোটে কংগ্রেসের পাশাপাশি আইএসএফের সঙ্গেও জোট করে বামেরা। এ নিয়েও দলের অন্দরে নানা প্রশ্ন ছিল। এরপর চব্বিশের ভোটে জোট ভেঙে একলা লড়াই। প্রত্যাশিত ভরাডুবি। উল্টে ভোট ভাগাভাগির খেলায় কয়েকটি আসনে তৃণমূলের জয়ের পথ সহজ হয়ে যায়।

এরপর ছাব্বিশে ভালো ফলের আশায় বুখ বাঁধছিলেন কমরেডরা। পউইঁজি বলতে ছিল ২০২৪ সালের আর জি কর আন্দোলন। আন্দোলনের আশেপাশে বিজেপির নেতাকর্মীদের ঘেঁসতে দেননি কমরেডরা। কিন্তু সেই গুড়ে বালি ফেলে দেয় ২০২৫ সালের সামশেরগঞ্জ। কমরেড হরগোবিন্দ এবং তাঁর ছেলে চন্দন দাসকে কুপিয়ে খুন করে জেহাদিরা। তারপরেও নেতৃত্বের মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি শুনে নিচুতলার মন ঘুরে যায়। মেরুকরণের সুযোগ পায় বিজেপি। যা স্পষ্ট হয়েছে বিধানসভা ভোটের ফলে।

Also Read | বাঁকুড়ার বড়জোড়ায় ইস্পাত কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ! ঝলসে গেলেন ৩ শ্রমিক

২০২৬ বিধানসভা ভোটে যে আহামরি কিছু হবে না তা খুব ভালো জানতেন বাম নেতারা। তবে ভোটের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এক মাসের মধ্যে তৃণমূল ছন্নছাড়া। দলের ক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়েছিল তৃণমূলের বড় অংশের নেতাকর্মীর রুটিরুজি। নীতিহীন তৃণমূল ক্ষমতা হারাতেই সেই নেতাকর্মীরা আর নেই। কাগজে কলমে বিরোধীদের অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। এই পরিস্থিতে হারানো জমি ফিরে পাচ্ছে বামেরা। এর পিছনে তাদের কোনও আন্দোলন বা কর্মসূচি নেই। তৃণমূলের শেষ হয়ে যাওয়া এবং ভালো তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির যোগসাজশই বামেদের ঘুরে দাঁড়ানোর সহায়ক হয়েছে।

বদলের বঙ্গে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন কমরেডরা। তৃণমূলের সৌজন্যে বছর পাঁচেক আগেও সেটা অলীক কল্পনা ছিল। এখন আর তা নেই- খেলা ঘুরছে। তবে লালবৈশাখীর মতো অবস্থা এখনও হয়নি। খুব সহজে তা হবেও না। কিন্তু কমরেডদের হাল ছাড়লে চলবে না। আর ধর্মনিরপেক্ষতার নামে তোষণ করলে বিজেপির সুবিধা হবে। এই অঙ্ক ভুলে গেলে আবারও বড় ভুল করবেন কমরেডরা।

Advertisements