নয়াদিল্লি: ভারতীয় বায়ুসেনার (Indian Air Force) অস্ত্রভাণ্ডারে শীঘ্রই যুক্ত হতে চলেছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি নতুন প্রজন্মের স্মার্ট অস্ত্র। উপগ্রহনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থার নতুন সংস্করণ স্যাটেলাইট স্মার্ট অ্যান্টি-এয়ারফিল্ড ওয়েপন বা স্যাট-সাও বায়ুসেনার স্ট্যান্ড-অফ আঘাতের ক্ষমতা আরও বাড়াবে। নির্দিষ্ট উচ্চতা ও গতিতে বিমান থেকে নিক্ষেপ করলে এই অস্ত্রের ঘোষিত পাল্লা ১০০ কিলোমিটার। ফলে শত্রুর অধিকাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকর পাল্লার বাইরে থেকেই বিমান এই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে।
৮১০.৭৯ কোটি টাকার চুক্তি
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য ১৬০টি স্যাটেলাইট স্মার্ট অ্যান্টি-এয়ারফিল্ড ওয়েপন বা স্যাট-সাও এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কেনার জন্য ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেডের সঙ্গে ৮১০.৭৯ কোটি টাকার চুক্তি করেছে।
এই চুক্তিটি ‘বাই ইন্ডিয়ান-ইন্ডিয়ান-ইন্ডিজেনাসলি ডিজাইন্ড, ডেভেলপড অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচার্ড’ বা আইডিডিএম শ্রেণির অধীনে হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয়ভাবে নকশা, উন্নয়ন এবং উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যতের ব্যাচে উৎপাদনের সময় প্রাথমিকভাবে হওয়া খরচ কমে গেলে প্রতি ইউনিটের দামও কমতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: মুসলিম ল অনুসারে বিয়ে হলেও নাবালিকার সঙ্গে যৌন সংসর্গে POCSO! রায় দিল্লি হাইকোর্টের
রানওয়ে থেকে বাঙ্কার, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত
স্মার্ট অ্যান্টি-এয়ারফিল্ড ওয়েপন মূলত শক্তিশালী ও সুরক্ষিত স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের জন্য তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রানওয়ে, বাঙ্কার, শক্তিশালী বিমান আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষিত কাঠামো। প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অস্ত্র ইতিমধ্যেই জাগুয়ার এবং এসইউ-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমান থেকে পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে তেজস যুদ্ধবিমান থেকে এর পরীক্ষা বা মোতায়েনের তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
৬০ শতাংশ দেশীয় উপাদান
স্যাট-সাও একটি আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য নির্ভুল নির্দেশিত গ্লাইড বোমা। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও দেশীয়ভাবে এই অস্ত্র তৈরি করেছে। অস্ত্রটিতে ৬০ শতাংশ দেশীয় উপাদান থাকবে। সাধারণ নির্দেশনাহীন বোমার তুলনায় গ্লাইড বোমার অন্যতম সুবিধা হল, এতে নিক্ষেপের পর দূরত্ব বাড়ানোর জন্য ভাঁজযোগ্য ডানা থাকে। একই সঙ্গে উপগ্রহ ও জড়ত্বনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থা অস্ত্রটিকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। এর ফলে আক্রমণকারী বিমানকে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার খুব কাছে যেতে হয় না। বিমান তুলনামূলক নিরাপদ দূরত্বে থেকে অস্ত্র নিক্ষেপ করেও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। আধুনিক বিমান অভিযানে এই স্ট্যান্ড-অফ ক্ষমতা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন: যোগী রাজ্যে অনুপ্রেরণার গল্প! ২৭ বছর চেষ্টার পর ৫৯ বছরে সরকারি শিক্ষক বিজয় শর্মা
গ্লাইড বোমা কর্মসূচি আরও বড় হচ্ছে
ভারতের দেশীয় গ্লাইড বোমা কর্মসূচি শুধু স্যাট-সাওয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডিআরডিও বর্তমানে বিদ্যমান স্মার্ট অ্যান্টি-এয়ারফিল্ড ওয়েপনে একটি ছোট টারবাইন ইঞ্জিন যুক্ত করার কাজ করছে। বর্তমান অস্ত্রটির পাল্লা ১০০ কিলোমিটার হওয়ায় নতুন পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই দূরত্ব প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়াও ৫০০ কেজি এবং ১,০০০ কেজি ওজনের গৌরব শ্রেণির গ্লাইড বোমার পাল্লাও প্রায় ১০০ কিলোমিটার। অন্যদিকে ট্যাকটিক্যাল অ্যাডভান্সড রেঞ্জ অগমেন্টেশন বা তারা কিট তুলনামূলক কম খরচে সাধারণ বোমাকে ৩০ কিলোমিটার পাল্লার নির্ভুল অস্ত্রে পরিণত করতে পারে।
বেসরকারি শিল্পও এই ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেছে। জেএসআর ডায়নামিক্স খাগতাঙ্ক নামে একটি গ্লাইড বোমা তৈরি করছে, যার দাবি করা পাল্লা ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত। অস্ত্রটির পরীক্ষা ভারতীয় বায়ুসেনা ইতিমধ্যেই করেছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বজুড়েও বাড়ছে গ্লাইড বোমার ব্যবহার
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও গ্লাইড বোমার ব্যবহার বাড়ছে। রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে অভিযানে সোভিয়েত যুগের বিভিন্ন বোমাকে ইউএমপিকে গ্লাইড কিটের সঙ্গে ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি ইউএমপিবি নামে নতুন ধরনের অস্ত্রও ব্যবহার করা হচ্ছে, যার পাল্লা প্রায় ৯০ কিলোমিটার। মার্কিন নৌবাহিনীও মার্ক-৮০ সিরিজের বোমার জন্য একটি রেঞ্জ এক্সটেনশন কিট প্রকাশ করেছে। ছোট টারবাইন ইঞ্জিন ব্যবহার করা এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পাল্লা ৩৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। এই দূরত্ব মূল ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের ঘোষিত পাল্লার থেকেও বেশি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রযুক্তির নতুন রূপ
গ্লাইড বোমার ধারণা অবশ্য নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির ফ্রিৎস-এক্স এবং হেনশেল এইচএস-২৯৩-এর মতো অস্ত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে সেই ধারণাই আধুনিক নির্দেশনা ব্যবস্থা, উন্নত ডানা এবং দীর্ঘ পাল্লার প্রযুক্তির সঙ্গে নতুনভাবে ফিরে আসছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তুলনামূলক কম খরচে দূর থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সুযোগ থাকায় গ্লাইড বোমা ব্যয়বহুল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এর ফলে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও শুধু প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, কম খরচের ইন্টারসেপ্টর এবং একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো পাল্টা ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
স্যাট-সাও যুক্ত হলে ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে এমন একটি দেশীয় অস্ত্র থাকবে, যা বিমানকে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছাকাছি না গিয়েও সুরক্ষিত স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত করার সুযোগ দেবে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।
