NASA: মহাকাশ বিজ্ঞানের জগৎ থেকে এক বিস্ময়কর খবর পাওয়া গেছে। নাসার ‘পারসিভিয়ারেন্স’ রোভার মঙ্গল গ্রহের তাপমাত্রা নিয়ে এক অভাবনীয় তথ্য উন্মোচন করেছে। সাধারণত কোনো গ্রহের তাপমাত্রার কথা ভাবলে আমরা পুরো এলাকায় আবহাওয়ার একটি অভিন্ন অবস্থার কথা কল্পনা করি; যেমন—পৃথিবীতে ভূপৃষ্ঠ এবং তার আশেপাশের বাতাসের তাপমাত্রা মোটামুটি একই রকম থাকে। কিন্তু মঙ্গল গ্রহে এই নিয়মটি সম্পূর্ণভাবে খাটে না। ‘লাল গ্রহ’ বা মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল এতটাই অদ্ভুত ও অনন্য যে, একজন মানুষের উচ্চতার সমান দূরত্বের মধ্যেই সেখানে তাপমাত্রার দুটি ভিন্ন বলয় বা স্তর দেখা যায়।
মঙ্গলে মানুষের শরীরের দুটি ভিন্ন অংশ একই সময়ে দুটি ভিন্ন ঋতুর অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। কোনো ব্যক্তি যদি দুপুরের সময় মঙ্গল গ্রহের বিষুবরেখায় দাঁড়িয়ে থাকেন, তবে তাঁর পা বসন্তের মতো উষ্ণতা অনুভব করবে, অথচ তাঁর মাথা হাড়-কাঁপানো শীতের কবলে পড়বে।
এটি কোনো বিভ্রম বা অনুমান নয়, বরং জেজেরো ক্রেটারে অবস্থানরত রোভারের MEDA যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যের উপর ভিত্তি করে করা বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
১.৫ মিটার দূরত্বে ২৬ ডিগ্রির পার্থক্য
‘জার্নাল অফ জিওফিজিক্যাল রিসার্চ’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, মঙ্গল গ্রহের উপরিভাগ এবং তার ঠিক ১.৫ মিটার (প্রায় একজন মানুষের উচ্চতার সমান) ওপরের বাতাসের মধ্যে বিকেলের দিকে তাপমাত্রার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য—প্রতি মিটারে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত—পরিলক্ষিত হয়েছে।
এ সময় মাটির কাছাকাছি তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে পৌঁছালেও, ওপরের বাতাস হিমাঙ্ক (০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা তার চেয়ে কম তাপমাত্রায় থাকে। বিকেলের দিকে সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে তাপমাত্রার এই ব্যবধান ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
এমনটা কেন ঘটে?
পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের তাপমাত্রাগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে—
পাতলা বায়ুমণ্ডল
পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল অনেক বেশি পাতলা। এটি মূলত কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন এবং আর্গন গ্যাস দিয়ে গঠিত।
তাপ ধরে রাখার অক্ষমতা
মঙ্গল গ্রহের শিলা ও মাটি সূর্যালোক শোষণ করে দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু সেখানকার পাতলা বায়ুমণ্ডল সেই তাপ ধরে রাখতে এবং তা বাতাসে ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয়।
তাপ ছড়িয়ে পড়া
বায়ুমণ্ডলে গ্যাসীয় কণার স্বল্পতার কারণে পৃষ্ঠতলের তাপ দ্রুত মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে মাটির ঠিক ওপরের বাতাস শীতলই থেকে যায়।
মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ
এই আবিষ্কারটি কেবল বিজ্ঞানের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ নয়, বরং মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানো এবং স্পেসস্যুট বা রোভারের নকশা তৈরির মতো ভবিষ্যৎ অভিযানের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোভারের যে অংশগুলো মাটির কাছাকাছি থাকে, সেগুলোকে প্রচণ্ড তাপের মোকাবিলা করতে হয়; অন্যদিকে ওপরের অংশগুলোকে সহ্য করতে হয় হাড়কাঁপানো শীত। তাপমাত্রার এই চরম তারতম্য থেকে যন্ত্রাংশগুলোকে রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে কোনো মানুষ যদি মঙ্গলের মাটিতে পা রাখে, তবে সেখানকার ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও তা আরামদায়ক মনে হতে পারে; কিন্তু বিশেষ তাপ-নিয়ন্ত্রিত পোশাক (থার্মাল স্যুট) ছাড়া সেখানে বেঁচে থাকা অসম্ভব হবে, কারণ সেখানকার বাতাস হবে হাড়জমানো শীতল।
