আকাশযুদ্ধের ভবিষ্যৎ ক্রমশ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড মার্টিনের স্কাঙ্ক ওয়ার্কস তাদের স্টেলথ কমব্যাট ড্রোন ভেক্টিস-এর নকশা সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশ করেছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রথমবার সামনে আসা এই কলাবরেটিভ কমব্যাট এয়ারক্রাফট বা সিসিএ প্রকল্পটি এবার নতুন নকশার বিস্তারিত নিয়ে আলোচনায় এসেছে।
ভেক্টিসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে এর এয়ার ইনটেক বা বায়ুপ্রবেশ পথ। এটি ফিউজলাজের উপরের অংশে বেশ গভীরে বসানো এবং তার সামনে রয়েছে নিচের দিকে ঢালু ভি-আকৃতির একটি চ্যানেল। আগের প্রকাশিত নকশার তুলনায় এই ব্যবস্থা অনেক বেশি জটিল। ভারতের এখনও উন্নয়নাধীন ক্যাটস ওয়ারিয়র-এর নকশায় ব্যবহৃত এয়ার ইনটেকের সঙ্গে এর যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
লেজবিহীন স্টেলথ নকশা
ভেক্টিসকে বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে এর লেজবিহীন বা টেললেস নকশা। যুক্তরাষ্ট্রের কোনও নির্মাতার তৈরি সিসিএ প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে এটি প্রথম টেললেস ডিজাইন হিসেবে সামনে এসেছে।
বিমানটির ডানা ল্যাম্বডা আকৃতির। এর ফিউজলাজে রয়েছে স্পষ্ট চিন লাইন এবং সামনের অংশে অ্যারোহেড আকৃতির নাক। ভেক্টিসের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪ ফুট এবং ডানার বিস্তার প্রায় ৩৮ ফুট। অর্থাৎ আকারের দিক থেকে এটি মার্কিন নৌবাহিনীর টি-৪৫ গোশক প্রশিক্ষণ বিমানের কাছাকাছি।
লকহিড মার্টিনের স্কাঙ্ক ওয়ার্কসের মতে, ফিউজলাজের ভিতরে গভীরে বসানো এয়ার ইনটেক বিমানের সামনের দিকের ড্র্যাগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে জ্বালানি সাশ্রয় এবং উড়ানের পরিসর বাড়ানোর সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
আরও একটি সুবিধা হল, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তুলনামূলক অপরিষ্কার বা সীমিত পরিকাঠামোর রানওয়ে থেকে কাজ করার সময় বাইরের বস্তু ইঞ্জিনে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি কমানো। এই ধারণাটি মার্কিন বিমানবাহিনীর অ্যাজাইল কমব্যাট এমপ্লয়মেন্ট বা এসিই পরিকল্পনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আগামী বছরই প্রথম উড়ানের লক্ষ্য
ভেক্টিসের প্রথম প্রোটোটাইপ তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। লকহিড মার্টিন আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রথম উড়ান পরিচালনার লক্ষ্য নিয়েছে। সংস্থাটি নিজস্ব অর্থায়নে আরও চারটি প্রোটোটাইপ তৈরির পরিকল্পনাও জানিয়েছে।
প্রকল্পটির উন্নয়নের গতি নিয়েও লকহিড মার্টিন জোর দিচ্ছে। সংস্থার দাবি, প্রাথমিক নকশা থেকে উইন্ড টানেল যাচাই পর্যন্ত যেতে সময় লেগেছে দুই মাসেরও কম। প্রথম ডিজিটাল বিল্ড তৈরি করতে প্রায় ছয় মাস এবং প্রথম যন্ত্রাংশ তৈরির অনুমোদন দিতে আট মাস সময় লেগেছে।
এই দ্রুত উন্নয়নের পেছনে উন্নত ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মিনিমাল টুলিং ডিটারমিন্যান্ট অ্যাসেম্বলি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্থার দাবি, এর ফলে শ্রমঘণ্টা সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে।
আকাশ ও স্থল, দুই ধরনের যুদ্ধেই সক্ষম
ভেক্টিসকে শুধু আকাশযুদ্ধের জন্য তৈরি করা হচ্ছে না। এটি একই সঙ্গে আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে মাটিতে হামলার মতো মিশন পরিচালনা করতে পারবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকাশিত প্রচারমূলক ছবিতে বিমানটিকে অভ্যন্তরীণ অস্ত্রভাণ্ডার থেকে এআইএম-১২০ অ্যামরাম এবং জিবিইউ-৫৩/বি স্টর্মব্রেকার গ্লাইড বোমা ছুড়তে দেখা যায়। অভ্যন্তরীণ অস্ত্রভাণ্ডারে অন্তত দুটি অস্ত্র রাখার জায়গা রয়েছে বলে নকশা থেকে বোঝা যায়।
এর সঙ্গে একটি ইলেকট্রো-অপটিক্যাল এবং ইনফ্রারেড সেন্সর টারেটও থাকবে। ফলে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে ড্রোনটি স্বয়ংক্রিয় বা আধা-স্বয়ংক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের ক্যাটস ওয়ারিয়রও একই ভবিষ্যতের দিকে
স্টেলথ ও স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধবিমানের এই প্রবণতা থেকে পিছিয়ে নেই ভারতও। দেশে একই সঙ্গে একাধিক মানবহীন যুদ্ধবিমান প্রকল্পের কাজ চলছে।
ডিআরডিওর ঘাতক প্রকল্পে একটি ফ্লাইং-উইং আকৃতির স্টেলথ মানবহীন কমব্যাট এয়ার ভেহিকল তৈরি করা হচ্ছে। দেশীয় কাবেরী ইঞ্জিনের ড্রাই ভ্যারিয়েন্ট ব্যবহার করে এই প্ল্যাটফর্মকে শত্রুপক্ষের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অঞ্চলের গভীরে গিয়ে নির্ভুল অস্ত্র হামলা চালানোর উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অন্যতম লক্ষ্য হল পাইলটকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে উচ্চঝুঁকির মিশন পরিচালনা করা।
এর পাশাপাশি হ্যাল তাদের ক্যাটস ওয়ারিয়র প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। কমব্যাট এয়ার টিমিং সিস্টেম বা ক্যাটস কর্মসূচির অংশ হিসেবে তৈরি এই প্ল্যাটফর্মটি একটি দুই-ইঞ্জিনের মানবহীন যুদ্ধবিমান হিসেবে পরিকল্পিত। এতে দেশীয় পিটিএই-৭ ইঞ্জিন ব্যবহারের কথা রয়েছে।
তেজস থেকে এএমসিএ, একসঙ্গে কাজ করবে মানবহীন বিমান
ক্যাটস ওয়ারিয়রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এটি একা কাজ করার পাশাপাশি যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সমন্বয় করে উড়তে পারবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তেজস এমকে-১এ, সুখোই-৩০ এমকেআই এবং জাগুয়ারের মতো বর্তমান যুদ্ধবিমানের সঙ্গে এটি কাজ করতে পারে।
ভবিষ্যতে তেজস এমকে-২ এবং ভারতের পঞ্চম প্রজন্মের এএমসিএ-র সঙ্গেও এই ধরনের মানবহীন প্ল্যাটফর্মকে সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ মানুষচালিত যুদ্ধবিমান এবং স্বয়ংক্রিয় বা মানবহীন কমব্যাট ড্রোনকে একসঙ্গে ব্যবহার করে একটি সমন্বিত যুদ্ধব্যবস্থা তৈরি করাই ভারতের এই কর্মসূচিগুলির অন্যতম লক্ষ্য।
বিশ্বজুড়েই বাড়ছে স্টেলথ ড্রোনের প্রতিযোগিতা
শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত নয়, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক এবং ফ্রান্সও ফ্লাইং-উইং ও স্টেলথ মানবহীন যুদ্ধবিমান নিয়ে কাজ করছে। ফলে ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধে পাইলটবিহীন প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ভেক্টিসের নতুন নকশা দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সিসিএ কর্মসূচিতে স্টেলথ, দীর্ঘ পরিসর, অভ্যন্তরীণ অস্ত্রবহন এবং দ্রুত উৎপাদনযোগ্যতার মতো বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে ঘাতক ও ক্যাটস ওয়ারিয়রের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতও উন্নত মানবহীন যুদ্ধব্যবস্থা তৈরির দিকে এগোচ্ছে। ফলে আগামী দিনে মানুষচালিত যুদ্ধবিমানের সঙ্গে মানবহীন স্টেলথ প্ল্যাটফর্মের সমন্বয় আধুনিক আকাশযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories — On Kolkata24x7 Business.
