নয়াদিল্লি: যখনই ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ‘দেশীয়করণ’ (Indigenisation) বা আত্মনির্ভরতার কথা ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তেজস যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক, হেলিকপ্টার বা যুদ্ধজাহাজের মতো বড় বড় সামরিক সরঞ্জামের নাম সবার আগে মাথায় আসে। কিন্তু সম্প্রতি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা বাইরে থেকে ততটা দৃশ্যমান না হলেও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সামরিক যানগুলি সচল রাখতে যে অসংখ্য ছোট-বড় যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়, এবার সেগুলি দেশেই তৈরির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে সরকার।
কী পদক্ষেপ নিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রক?
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্থ ‘ডিপার্টমেন্ট অফ ডিফেন্স প্রোডাকশন’ সম্প্রতি ষষ্ঠ ‘পজিটিভ ইন্ডিজেনাইজেশন লিস্ট’ (Positive Indigenisation List বা PIL) প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় এমন ৪০৫টি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামের নাম রয়েছে, যেগুলি এবার থেকে বিদেশ থেকে আমদানির বদলে দেশেই তৈরি করা হবে। মন্ত্রক জানিয়েছে, এই ৪০৫টি আইটেমের মধ্যে ১৬টি ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং বাকি ৩৮৯টি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির জন্য নির্ধারিত। এর আনুমানিক ব্যবসায়িক মূল্য প্রায় ৩,০৭০ কোটি টাকা। এই তালিকায় লাইন রিপ্লেসেবল ইউনিট (LRU), সাব-সিস্টেম, স্পেয়ার পার্টস এবং কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সুখোই-৩০ এমকেআই (Su-30MKI), তেজস (Tejas/LCA), অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার (ALH), বিভিন্ন ট্যাঙ্ক এবং যুদ্ধজাহাজে ব্যবহৃত হবে।
ছোট যন্ত্রাংশ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান বা ট্যাঙ্ক হাজার হাজার ছোট ছোট যন্ত্রাংশ নিয়ে তৈরি হয়। একটি দেশের হাতে যতই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান থাক না কেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ খুচরো যন্ত্রাংশের অভাবে সেটি মাটি থেকে উড়তেই পারবে না। একই কথা প্রযোজ্য ট্যাঙ্ক, হেলিকপ্টার বা যুদ্ধজাহাজের ক্ষেত্রেও। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র মিসাইল বা গোলাবারুদই নয়, সামরিক যানগুলিকে সচল রাখতে প্রচুর পরিমাণে স্পেয়ার পার্টস, টায়ার বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। বিদেশ থেকে এসব যন্ত্রাংশ আমদানি করতে অনেক সময় লাগে, যা যুদ্ধের সময় মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই এই ছোট অংশগুলির আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সাপ্লাই চেইন তৈরি করাটাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
তেজস, সুখোই এবং টি-৯০ ট্যাঙ্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব
এই তালিকার অর্থ এই নয় যে ভারত রাতারাতি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে সুখোই বা টি-৯০ ট্যাঙ্ক তৈরি করে ফেলবে। বরং, এগুলি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে যন্ত্রাংশগুলি লাগে, তা দেশেই তৈরি হবে।
তেজস: লাইট কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট তেজস ভারতেই তৈরি হলেও এর ইঞ্জিন (GE F404) এখনও বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। তবে সরকার ধাপে ধাপে এর দেশীয়করণের হার বাড়াচ্ছে। বর্তমানে তেজস মার্ক-১এ-তে ৬৪ শতাংশেরও বেশি দেশীয় সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে।
সুখোই-৩০ এমকেআই এবং টি-৯০ ট্যাঙ্ক: ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে রুশ প্রযুক্তির সুখোই যুদ্ধবিমান। একইভাবে সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত হয় টি-৯০ ট্যাঙ্ক। এই যানগুলির দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। নতুন এই উদ্যোগের ফলে এই যন্ত্রাংশগুলি এবার ভারতীয় সংস্থাগুলিই তৈরি করতে পারবে।
বেসরকারি সংস্থা ও এমএসএমই (MSME)-র ভূমিকা
এই দেশীয়করণের উদ্যোগে সরকারের ‘সৃজন’ (SRIJAN) পোর্টাল এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই পোর্টালের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া যন্ত্রাংশগুলি চিহ্নিত করে দেশীয় শিল্প সংস্থা, স্টার্টআপ এবং এমএসএমই-দের সেগুলি তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বড় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই নয়, বরং ছোট ও মাঝারি দেশীয় সংস্থাগুলিও যেন সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে অংশ নিতে পারে এবং দেশে একটি মজবুত ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠে।
স্কুল সংযুক্তিকরণ মানি না! ভোপালে পথে ‘জেন আলফা’ পড়ুয়ারা
বাংলার ফুসফুস বাঁচাতে ২০২৭ র মধ্যে লাগানো হবে ২০ কোটি গাছ
