নয়াদিল্লি: দীর্ঘ দিন ধরে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘ব্রহ্মস’ (BrahMos) মিসাইল। ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও বিশ্ববাজারে বিক্রির এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছিল এই সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। কিন্তু আগামী দিনে ভারতের রফতানির বাজার শুধু একটি বড় অস্ত্রের উপর নির্ভর করে থাকবে না। বরং নতুন প্রজন্মের ড্রোন, প্রিসিশন মিউনিশন (নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্র), অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাই হতে চলেছে আগামী দিনের তুরুপের তাস।
রেকর্ড রফতানি
পরিসংখ্যান বলছে, এই বদল ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে (FY26) ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি একলাফে ৬২.৬৬ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৮,৪২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ২৩,৬২২ কোটি টাকা। বর্তমানে ভারত ৮০টিরও বেশি দেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি করছে। সেই সঙ্গে রফতানিকারী সংস্থার সংখ্যাও ১২৮ থেকে বেড়ে ১৪৫-এ দাঁড়িয়েছে।
বদলাচ্ছে যুদ্ধের ধরন, বদলাচ্ছে বাজার
যুদ্ধক্ষেত্র এখন আর শুধু যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক বা দামি মিসাইলের দখলে নেই। সাম্প্রতিক সময়ের যুদ্ধগুলি প্রমাণ করেছে যে, ড্রোন, লয়টারিং মিউনিশন, প্রিসিশন অস্ত্র এবং এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেমই এখন সামরিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন এমন অস্ত্র চাইছে যা বহু দূর পর্যন্ত যেতে পারে, নির্ভুল আঘাত হানতে পারে, স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করতে পারে এবং প্রথাগত অস্ত্রের চেয়ে অনেক সস্তা হয়।
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পও সেই পথেই হাঁটছে। উদাহরণস্বরূপ নয়ডা-ভিত্তিক ‘আইজি ডিফেন্স’ (IG Defence)-এর তৈরি দূরপাল্লার ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন ‘কাল’ (KAL)-এর কথা বলা যেতে পারে। সংস্থার দাবি, এই ড্রোনটি ১,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাড়ি দিতে পারে, ৭-৮ ঘণ্টা আকাশে উড়তে পারে এবং ৫০ কেজি বিস্ফোরক বা পে-লোড বহন করতে সক্ষম। সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে আইজি ডিফেন্স এখন ‘কাল’-কে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রস্তুত করছে।
আইজি ডিফেন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বোধিসত্ত্ব সংঘপ্রিয় বলেন, “ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমশ স্বয়ংক্রিয় এবং দূরপাল্লার নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হবে।” তাঁর সংস্থা আশাবাদী যে, বন্ধু রাষ্ট্রগুলি নিজেদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকীকরণের জন্য এমন অস্ত্রই খুঁজবে, যা দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি, সস্তা এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য।
আরও ‘স্মার্ট’ হচ্ছে অস্ত্র
অস্ত্রের বাইরের কাঠামোর চেয়েও এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তার ভিতরের প্রযুক্তি। একটি মিসাইল বা গোলার লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা নির্ভর করে তার ফিউজ, সেন্সর, গাইডেন্স সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক্সের উপর।
‘অ্যামিউনিক সিস্টেমস’-এর সিইও প্রিয়াঙ্কা সিঙ্ঘল মনে করেন, ভারতের রফতানি সম্ভাবনাকে শুধু সম্পূর্ণ প্ল্যাটফর্ম বা অস্ত্রের দিক থেকে দেখলে চলবে না। তাঁর কথায়, “ব্রহ্মস হয়তো শিরোনামে থাকে, কিন্তু ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির একটি বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে সেই ইলেকট্রনিক্সের মধ্যে, যা এই অস্ত্রগুলিকে ‘স্মার্ট’ করে তোলে।” ভারত ইতিমধ্যেই অস্ত্রের ভৌত কাঠামোর ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করেছে। পরবর্তী ধাপ হল সেই অস্ত্রের ‘মস্তিষ্ক’ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা।
রফতানির নয়া লক্ষ্যমাত্রা
২০২৯-৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা রফতানি ৫০,০০০ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে ভারত। প্রতিরক্ষা সচিব সম্প্রতি জানিয়েছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা সহজেই অর্জন করা সম্ভব। তবে এর জন্য শুধু কয়েকটি বড় অস্ত্র বিক্রি করলেই হবে না, বরং মিসাইল, রকেট, বন্দুক, ড্রোন, সেন্সর এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহ করতে সক্ষম সংস্থাগুলির একটি বৃহত্তর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে শুধুমাত্র বেসরকারি সংস্থাগুলিই ১৭,৩৫৩ কোটি টাকার সরঞ্জাম রফতানি করেছে। সেখানে সরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির (PSU) অবদান ২১,০৭১ কোটি টাকা।
ইতিমধ্যেই আর্মেনিয়া ভারতের কাছ থেকে ‘পিনাকা’ রকেট লঞ্চার এবং আর্টিলারি সিস্টেম কিনেছে। ফিলিপিন্স কিনেছে ব্রহ্মস। পাশাপাশি আকাশ এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম, স্বাতী ওয়েপন-লোকেটিং রাডার, ডর্নিয়ার বিমান, কপ্টার, ফাস্ট ইন্টারসেপ্টর বোট, টর্পেডো এবং বিমানের যন্ত্রাংশও ভারতের রফতানির বৃহত্তর ঝুলিতে রয়েছে। ভারত প্রমাণ করে দিচ্ছে, তারা এখন আর শুধু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম জোড়া লাগাচ্ছে না, বরং তার ভিতরের ‘মস্তিষ্ক’ বা ইনটেলিজেন্স স্তরটিও দেশেই তৈরি করছে।
E ২০ র ইথানল সম্পূর্ণ ভারতীয়-আমেরিকার নয়! স্পষ্ট করল মোদীসরকার
ভারত থেকে ১১৪ টি রাফাল কেনার প্রস্তাব জমা দিল ফ্রান্স
