নয়াদিল্লি: দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিবাদের মধ্যে ভারত ও চিনের সেনাবাহিনী অরুণাচল প্রদেশের পূর্ব সেক্টরে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি-র পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করল (India China meeting) । রবিবার অরুণাচল প্রদেশের কিবিথু অঞ্চলের ওয়াচা-দামাই সীমান্ত বৈঠক কেন্দ্রে দুই দেশের কর্পস কমান্ডার স্তরের এই বৈঠক হয়।
সম্প্রতি বেজিংয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত প্রশ্ন নিয়ে বিশেষ প্রতিনিধি বা এসআর বৈঠক হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই এই সামরিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবহিত ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা।
ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল গিরিশ কালিয়া, যিনি ডিমাপুর-ভিত্তিক ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩ কর্পস-এর কমান্ডার। তবে বৈঠক নিয়ে এখনও ভারতীয় সেনাবাহিনী বা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
পূর্ব সেক্টরে প্রথম কর্পস কমান্ডার স্তরের বৈঠক
ওয়াচা-দামাই সীমান্ত বৈঠক কেন্দ্রে এই প্রথম ভারত ও চিনের মধ্যে কর্পস কমান্ডার স্তরের সামরিক আলোচনা হল। এতদিন এই ধরনের বৈঠক মূলত লাদাখের চুশুল-মোল্ডো সীমান্ত বৈঠক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে। ফলে অরুণাচল প্রদেশে এই বৈঠক পূর্ব সেক্টরের সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সরাসরি সামরিক যোগাযোগের একটি নতুন ব্যবস্থা তৈরি করল।
অরুণাচল প্রদেশে এলএসি-র দায়িত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দুটি কর্পস রয়েছে। এগুলি হল তেজপুর-ভিত্তিক ৪ কর্পস এবং রাঙ্গাপাহার-ভিত্তিক ৩ কর্পস। এর মধ্যে অরুণাচল প্রদেশে এলএসি বরাবর গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল এলাকার দায়িত্বে রয়েছে ৩ কর্পস।
আরও পড়ুন: জিও-এয়ারটেলকে পিছনে ফেলে হরিয়ানা সার্কেলে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক যোগ করল BSNL
Upper Subansiri নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই বৈঠক
অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি অঞ্চলে চিনা সেনার আগ্রাসী সামরিক তৎপরতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রিপোর্ট সামনে এসেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দুই দেশের সেনাবাহিনীর এই বৈঠক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত ও চিনের মধ্যে এলএসি-র অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মতপার্থক্য রয়েছে। এই ভিন্ন ধারণার কারণে মাঝেমধ্যেই সীমান্তে দুই দেশের সেনার মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে। সেই কারণে স্থানীয় পর্যায়ে সামরিক যোগাযোগ এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
Doval-Wang বৈঠকের পরেই সামরিক আলোচনা
কর্পস কমান্ডার স্তরের বৈঠকটি হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই-র বৈঠকের কয়েক দিনের মধ্যে। ২৫ আগস্ট বেজিংয়ে দুই দেশের মনোনীত বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে ডোভাল ও ওয়াং সীমান্ত প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে সীমান্তের সীমারেখা নির্ধারণ এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। ভারতীয় পক্ষ স্পষ্ট করে যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডোভাল জানিয়েছিলেন, ভারত-চিন সম্পর্কের স্বাভাবিকতার পেছনে সীমান্ত এলাকায় দুই দেশের শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার ভূমিকা সরাসরি রয়েছে।
আরও পড়ুন: দেশের প্রতিরক্ষায় অগ্রগতি! ১.১০ লক্ষ কোটির অস্ত্র প্রস্তাবে সই রাজনাথের
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ৮ দফা ঐকমত্য
বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করার জন্য ৮ দফা ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। দুই পক্ষ সীমান্তের সীমারেখা নির্ধারণের বিষয়ে দ্রুত এবং বাস্তবসম্মত অগ্রগতির জন্য আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য সীমারেখা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপকে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
এছাড়াও সামরিক আলোচনার জন্য আরও দুটি সীমান্ত বৈঠক কেন্দ্র এবং পূর্ব ও মধ্য সেক্টরে আরও দুটি সামরিক হটলাইন ব্যবস্থা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। মাঠপর্যায়ে কোনও পরিস্থিতি তৈরি হলে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত তা মোকাবিলা করার বিষয়েও দুই দেশ সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত-চিন সীমান্ত বিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয় ব্যবস্থা, স্থানীয় কমান্ডার স্তরের বৈঠক এবং অন্যান্য সম্মত প্রক্রিয়া।
এলএসি বোঝাপড়া বাড়ানোর উদ্যোগ
দুই পক্ষ এলএসি-র নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা করেছে। এর লক্ষ্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা। একই সঙ্গে ভারত ও চিন সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এর মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। সীমান্ত বাণিজ্য, তীর্থযাত্রা এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ সহযোগিতা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নদী নিয়ে সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায়
দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদী সংক্রান্ত সহযোগিতাও বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনায় উঠে এসেছে। সেপ্টেম্বরেই আন্তঃসীমান্ত নদী সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের মেকানিজমের পরবর্তী বৈঠক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি নদী, বাণিজ্য এবং মানুষের যোগাযোগের মতো বিষয়েও ভারত-চিন সম্পর্ককে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
২০২০ সালের পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা
২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলিতে দুই দেশ একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিক এবং সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই অরুণাচল প্রদেশে প্রথমবার কর্পস কমান্ডার স্তরের বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশ আগামী ২০২৭ সালে ভারতে ২৬তম বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক করার বিষয়েও সম্মত হয়েছে। ফলে সীমান্ত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সামরিক যোগাযোগ বজায় রাখার প্রক্রিয়াটিও আগামী দিনগুলিতে অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
