শ্রীহরিকোটা: জোড়া ব্যর্থতার ধাক্কা সামলে ফের মহাকাশে সাফল্যের জয়পতাকা ওড়াল ভারত। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাত ২টো ৫৫ মিনিটে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে সফল ভাবে উৎক্ষেপণ করা হলো জিএসএলভি-এফ১৭ (GSLV-F17) রকেটের। এই রকেটের পিঠে চেপেই মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে ২,৩৭৬ কেজি ওজনের অত্যাধুনিক ভূ-পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহ (Earth Observation Satellite) ইওএস-০৫ (EOS-05)। মাটি ছাড়ার ঠিক ১৯ মিনিট পর, রাত ৩টে ১৪ মিনিটে উপগ্রহটিকে তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে সফল ভাবে স্থাপন করে ইসরো। শ্রীহরিকোটা থেকে এটি ছিল লার্জ রকেটের ১০৭ তম উৎক্ষেপণ।
কেন এই উৎক্ষেপণ এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইসরোর কাছে এই উৎক্ষেপণটি ছিল কার্যত অগ্নিপরীক্ষা। কারণ, ভারতের মহাকাশ গবেষণার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ‘ওয়ার্কহর্স’ বলে পরিচিত পিএসএলভি (PSLV) রকেট পর পর দু’বার (২০২৫ সালে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে) ব্যর্থ হয়েছিল। সেই ব্যর্থতার পর থেকে পিএসএলভি-র উড়ান আপাতত বন্ধ রেখে ত্রুটি সংশোধনের কাজ চালাচ্ছে ইসরো। এই আবহে ভারতের উৎক্ষেপণ সক্ষমতা নিয়ে যখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই জিএসএলভি-র এই সাফল্য ইসরো বিজ্ঞানীদের বিরাট স্বস্তি দিল।
কেন্দ্রীয় বিজ্ঞানমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এক্স (X) হ্যান্ডেলে ইসরোকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন, ‘‘মহাকাশে ভারতের আরও একটি বড় লাফ! জিএসএলভি-এফ১৭/ইওএস-০৫-এর সফল উৎক্ষেপণের জন্য ইসরো টিমকে কুর্নিশ। এটি একটি অত্যাধুনিক ভূ-পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহ এবং জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথ থেকে ভারতের প্রথম ইমেজিং স্যাটেলাইট।’’
ইসরোর ‘নটি বয়’ ও নিজস্ব প্রযুক্তির লড়াই
জিএসএলভি মার্ক-২ (GSLV Mk II) রকেটটিকে ইসরোর অন্দরে ‘নটি বয়’ বা দুষ্টু ছেলে বলা হয়। কারণ, এর আগের ১৯টি উৎক্ষেপণের মধ্যে ৬টিতেই ব্যর্থতার মুখ দেখতে হয়েছিল বিজ্ঞানীদের। তবে এই রকেটের গুরুত্ব লুকিয়ে রয়েছে এর প্রযুক্তিতে। নব্বইয়ের দশকে ভারী উপগ্রহ পাঠানোর জন্য ভারতের ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনের প্রয়োজন ছিল। আমেরিকা এবং তাদের নেতৃত্বাধীন প্রযুক্তি-নিষেধাজ্ঞার জেরে ভারত তখন চরম চাপে পড়ে। রাশিয়া সীমিত কিছু ইঞ্জিন দিলেও সম্পূর্ণ প্রযুক্তি হস্তান্তর করেনি। এরপর দীর্ঘ প্রায় দু’দশক ধরে ব্যর্থতা ও প্রবল লড়াইয়ের পর ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে এই ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন তৈরি করতে সক্ষম হয়। এই জিএসএলভি রকেট ভারতের সেই স্বনির্ভরতারই প্রতীক।
কী করবে ইওএস-০৫ উপগ্রহ?
২০২১ সালের অগস্টে জিএসএলভি-এফ১০ রকেটে করে জিএসএটি-১ (GISAT-1) উপগ্রহ পাঠানোর চেষ্টা করেছিল ইসরো। কিন্তু নিজস্ব প্রযুক্তির ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন ঠিকমতো কাজ না করায় সেই মিশন ব্যর্থ হয়। সেই অসম্পূর্ণ লক্ষ্যই এবার পূরণ করবে ইওএস-০৫।
সাধারণত অন্যান্য উপগ্রহ পৃথিবীর অনেকটা কাছাকাছি থেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ছবি পাঠায়। কিন্তু ইওএস-০৫ পৃথিবী থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার উপরে জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথে অবস্থান করবে। ফলে সেখান থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ, পার্শ্ববর্তী মহাসাগর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলির উপর এটি ‘একটানা’ (Continuous) নজরদারি চালাতে পারবে। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ, বন্যা, দাবানল, পরিবেশগত পরিবর্তন থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। বেঙ্গালুরুর ইউ আর রাও স্যাটেলাইট সেন্টারের ডিরেক্টর ডি কে সিং একে মহাকাশে ভারতের ‘আরেকটি চোখ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আগামীর লক্ষ্য
এই সাফল্যের পর আত্মতুষ্টিতে ভুগতে নারাজ ইসরো। সংস্থার চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘‘কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কার হলো আরও বেশি কাজ।’’ চলতি আর্থিক বছরে ইসরোর হাতে এখনও ছ’টি উৎক্ষেপণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বছরের শেষে ভারতের প্রথম মানবহীন ‘গগনযান’ মিশন।
‘মৃত্যুভয় নেই, বিচার এড়াতে দেশ ছাড়িনি’! ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা হাসিনার
ভোটার তালিকা থেকে বাদ রাঘব চাড্ডা! আপ-এর বিরুদ্ধে ‘প্রতিহিংসা’র তোপ বিজেপি সাংসদের
