কলকাতা: ভারতে উচ্চশিক্ষায় পড়ুয়ার সংখ্যা গত কয়েক দশকে দ্রুত বেড়েছে। লক্ষ লক্ষ পরিবার বিশ্বাস করেছে, ভালো ডিগ্রি মানেই ভালো চাকরি এবং আর্থিক নিরাপত্তা (Employment Crisis)। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখন অনেকটাই ভিন্ন। পড়াশোনা শেষ করেও বহু তরুণ-তরুণী উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। এই হতাশা থেকেই সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে শুরু হওয়া ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) আন্দোলন বড় আকার নিয়েছে। প্রথমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দিয়ে শুরু হলেও পরে তা বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, মূল্যবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে যুব আন্দোলনের রূপ নেয়।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) প্রাক্তন অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ অরুণ কুমার মনে করেন, বর্তমান বেকারত্বের সংকট তরুণদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি করেছে। তাঁর মতে, বহু শিক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন এই আশায় যে একদিন সংগঠিত ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী চাকরি পাবেন। কিন্তু সেই সুযোগ সীমিত হওয়ায় একই পরীক্ষা চার, পাঁচ বা ছয়বার পর্যন্ত দিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই।
Azim Premji University-র State of Working India 2026 রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে তরুণ স্নাতকের সংখ্যা ১৯৮৩ সালের প্রায় ৫০ লক্ষ থেকে ২০২৩ সালে ৬ কোটি ৩০ লক্ষে পৌঁছেছে। কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান বাড়েনি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২৫ বছরের কম বয়সি স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে দেশের মোট বেকারদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিলেন স্নাতক। একই সময়ে বেকার স্নাতকের সংখ্যা ১০ লক্ষেরও কম থেকে বেড়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষে পৌঁছেছে।
Also Read | আগামী ৫ই আগস্ট দিল্লি থেকে প্রথম প্রকাশ্য ভাষণ দেবেন হাসিনা
সরকারের Periodic Labour Force Survey (PLFS)-এর তথ্যও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের বেকারত্বের হার ১৬.২ শতাংশে পৌঁছায়, যা ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে প্রকাশিত মাসিক তথ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে যুবকদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২.৭ শতাংশ থেকে ৪০.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, অনেক তরুণ চাকরির খোঁজ করাও ছেড়ে দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি শুধু বেকারত্ব নয়, চাকরির মানও বড় উদ্বেগের বিষয়। অরুণ কুমারের বক্তব্য, ভারতের প্রায় ৯৪ শতাংশ কর্মী অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন, যেখানে সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মাত্র ৬ শতাংশ। এই দুই ক্ষেত্রের বেতন ও চাকরির নিরাপত্তার পার্থক্য বিশাল। তাই সরকারি বা সংগঠিত ক্ষেত্রের চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।
PLFS-এর বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি প্রতি ১০০ জন স্নাতকের মধ্যে মাত্র ৫০ জন কর্মরত, ১৫ জন সক্রিয়ভাবে চাকরি খুঁজলেও কাজ পাচ্ছেন না এবং বাকি ৩৫ জন শ্রমবাজারের বাইরেই রয়েছেন। আরও উদ্বেগের বিষয়, প্রতি ১০০ জন স্নাতকের মধ্যে মাত্র ২৬ জন নিয়মিত বেতনের চাকরি পান এবং মাত্র ৪ জন লিখিত চুক্তি, বেতনসহ ছুটি ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ আনুষ্ঠানিক চাকরিতে কর্মরত।
শিক্ষার খরচও বাড়ছে। সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে পরিবারের শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখন কোচিংয়ের পিছনে খরচ হচ্ছে, যেখানে ২০১৮ সালে এই হার ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ। ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা অত্যন্ত বেশি। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে দেশে প্রায় ৪৪ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া থাকলেও শীর্ষ ১০০ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে মাত্র প্রায় ৫ লক্ষ।
Also Read | NEET নিয়ে আন্দোলন-ঝাড়খণ্ডের JPSC দুর্নীতিতে মুখে কুলুপ কেন? প্রশ্ন হেমন্ত-রাহুলকে
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও সেই হারে গুণগত মানের চাকরি তৈরি হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিকে অনেকেই “Jobless Growth” বলে বর্ণনা করছেন। প্রতি বছর প্রায় ৮০ লক্ষ স্নাতক শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত স্থায়ী ও ভালো বেতনের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, আগে অসংগঠিত ক্ষেত্র অনেকের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করত। কিন্তু সেখানেও কর্মসংস্থানের গতি কমেছে। Annual Survey of Unincorporated Sector Enterprises (ASUSE) অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অসংগঠিত ক্ষেত্রে প্রায় ৭৪.৫ লক্ষ নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে, যা আগের সমীক্ষা পর্বের ১.১ কোটির তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এই প্রেক্ষাপটে NEET-UG ২০২৬ প্রশ্নপত্র ফাঁস কেবল একটি পরীক্ষার বিতর্ক হয়ে থাকেনি। বহু শিক্ষার্থীর কাছে এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে ওঠে। পরীক্ষার অনিয়মের প্রতিবাদ থেকেই ধীরে ধীরে আন্দোলনের পরিধি বাড়ে এবং Cockroach Janta Party-র মতো যুব আন্দোলন ব্যাপক সমর্থন পায়। এই আন্দোলনের মূল বার্তা ছিল, শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই আর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনসংখ্যা। কিন্তু এই জনশক্তির জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মসংস্থান তৈরি করা না গেলে ভবিষ্যতে এই জনমিতিক সুবিধাই বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
