বিনিয়োগে বড় লক্ষ্য! ২০০ ব্যবসায়ীকে নিয়ে উদীয়মান সূর্যের দেশে পীযূষ

নয়াদিল্লি: ভারত ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চার দিনের জাপান সফরে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল (Piyush Goyal…

piyush-goyal-japan-visit-200-member-business-delegation-investment

নয়াদিল্লি: ভারত ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চার দিনের জাপান সফরে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল (Piyush Goyal )। আগামী ২৪ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই সফরে তাঁর সঙ্গে থাকছে প্রায় ২০০ সদস্যের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল।

Advertisements

টোকিও, নাগোয়া এবং ওসাকা সফরে ভারতীয় প্রতিনিধি দল জাপানের শিল্পগোষ্ঠী, বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করবে। উৎপাদন, সেমিকন্ডাক্টর, পরিচ্ছন্ন শক্তি, ইস্পাত, গাড়ি, আর্থিক পরিষেবা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং স্টার্ট-আপের মতো ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই সফরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ গত বছর জাপান আগামী এক দশকে ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল।

   

Also Read | দেশে বিদেশে বিপুল চাহিদা! ব্রাহ্মোস অ্যারোস্পেসের অর্ডার বই ছাড়াল ছয় বিলিয়ন ডলার

তিন শহরে একাধিক বৈঠক

পীযূষ গোয়েলের সফর শুরু হবে টোকিও থেকে। সেখানে তিনি জাপানের বড় শিল্পগোষ্ঠী এবং দীর্ঘদিন ধরে ভারতের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে কাজ করা সংস্থাগুলির শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। জাপান বিজনেস ফেডারেশন বা কেইদানরেন-এর সঙ্গেও একটি গোলটেবিল বৈঠক হবে। এই সংগঠনের অধীনে জাপানের ১,৫০০-র বেশি শীর্ষস্থানীয় সংস্থা রয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্টার্ট-আপ এবং বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিয়ে আলাদা আলোচনারও আয়োজন করা হয়েছে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের মতে, এর মাধ্যমে উৎপাদন এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে জাপানি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তুলে ধরা হবে।

Advertisements

Also Read | এলপিজি ভুলে পিএনজি গ্রহণে গতি বাড়ানোর তাগাদা মোদী সরকারের

জাপানের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক

টোকিওতে পীযূষ গোয়েল জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আকাজাওয়া রিয়োসেই-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এর পাশাপাশি জাপান সরকারের শীর্ষ আধিকারিক এবং সংসদের সদস্যদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। জাপানে বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গেও তিনি কথা বলবেন। আলোচনায় জাপানি সংস্থাগুলির ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

নাগোয়ায় গাড়ি ও ইস্পাত শিল্পে নজর

জাপানের শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত নাগোয়ায় পীযূষ গোয়েল চুকেইরেন এবং নাগোয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একটি রোডশোতে অংশ নেবেন। আইচি প্রিফেকচারের নেতৃত্ব এবং গাড়ি ও ইস্পাত শিল্পের বড় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তিনি। ভারতের উৎপাদন ক্ষেত্রকে জাপানি সংস্থাগুলির কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি প্রযুক্তি এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হবে।

Also Read | ৩৪০০ কোটির প্রকল্পে রাজ্যেই তৈরী হবে যুদ্ধজাহাজ! শুভেন্দু-রাজনাথের নজরে খিদিরপুর-গার্ডেনরিচ, ইছাপুর

ওসাকায় বিনিয়োগকারীদের সামনে ভারতের সুযোগ

সফরের শেষ পর্ব হবে ওসাকায়। সেখানে বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ীদের নিয়ে রোডশোর পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, শিল্প এবং ভোক্তা পণ্য ক্ষেত্রের জাপানি সংস্থাগুলির সঙ্গে বৈঠক হবে। ভারতের উৎপাদন, পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং ভোক্তা বাজারের সুযোগগুলি জাপানি বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হবে।

ফিকি বা ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-র ডিরেক্টর জেনারেল জ্যোতি বিজ জানান, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন বা জেট্রো, জাপানি ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনায় ভারতে জাপানি সংস্থার জন্য নতুন সুযোগ এবং দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।

সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

দুই দেশের আলোচনায় ডিজিটাল উদ্ভাবন, শিল্পক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং ইলেকট্রনিক্স বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এছাড়াও মূলধনী পণ্য, যন্ত্রপাতি, গাড়ি এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হবে। ভারতীয় প্রতিনিধি দল দেশের উৎপাদন, প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি, স্টার্ট-আপ এবং অন্যান্য দ্রুত বাড়তে থাকা ক্ষেত্রের সম্ভাবনা তুলে ধরবে।

ভারতে জাপানের বিনিয়োগ কত?

ভারতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপান বর্তমানে পঞ্চম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ। এপ্রিল ২০০০ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ভারত জাপান থেকে মোট ৪৮.১৪ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই পেয়েছে। এই সময়ে ভারতে আসা মোট এফডিআইয়ের প্রায় ৬ শতাংশ এসেছে জাপান থেকে। আগামী এক দশকে জাপানের ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বড় আকার নিতে পারে।

দুই দেশের বাণিজ্য বেড়েছে, তবে ঘাটতিও বাড়ছে

২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারত ও জাপানের মধ্যে মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৯.১৮ শতাংশ বেড়ে ২৭.৪৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি ছিল ৬.০৩ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ২১.৪৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে গত অর্থবর্ষে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১৫.৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই ঘাটতি ছিল ১২.৬৬ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ঘাটতি ছিল ১২.৫৩ বিলিয়ন ডলার, আর ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ছিল ১১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়লেও ভারতের তুলনায় জাপান থেকে আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি।

ভারত-জাপান বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনার পথে

দুই দেশ কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট বা সিইপিএ পর্যালোচনা করার বিষয়টিও দেখছে। এই চুক্তি ১ আগস্ট ২০১১ থেকে কার্যকর হয়েছিল। ভারত-জাপান সিইপিএ-র সপ্তম যৌথ কমিটির বৈঠক চলতি বছরের ২ মার্চ টোকিওতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির কারণে ভারত দীর্ঘমেয়াদে আরও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছে। সেই কারণেই চুক্তিটি পর্যালোচনার দাবি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইস্পাত আমদানি নিয়েও সমস্যা

সিইপিএ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ইস্পাত আমদানির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের দেশীয় ইস্পাত উৎপাদকরা জাপান থেকে হট-রোলড স্টিলসহ বিভিন্ন ধরনের ইস্পাত পণ্যের আমদানি বাড়ার বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে জাপানি সংস্থাগুলিও ভারতে চালু থাকা কোয়ালিটি কন্ট্রোল অর্ডার বা কিউসিও নিয়ে নিজেদের সমস্যার কথা আগেও জানিয়েছে। ফলে নতুন সফরে শুধু বিনিয়োগ বাড়ানো নয়, দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য, বাজারে প্রবেশের বাধা এবং শিল্পক্ষেত্রের নিয়মকানুন নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পীযূষ গোয়েলের জাপান সফরের লক্ষ্য শুধু নতুন বিনিয়োগ আনা নয়। উৎপাদন, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির মতো ভবিষ্যৎ শিল্পে ভারত-জাপান সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করাই এই সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

Advertisements