কলকাতা: ভারতীয় বায়ুসেনার যুদ্ধবিমান ঘাটতি মেটাতে আরও ১১৪টি রাফায়েল (Rafale) যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া এক ধাপ এগিয়েছে। ফরাসি বিমান নির্মাতা সংস্থা দাসো অ্যাভিয়েশন প্রস্তাবিত প্রায় ৩.২৫ লক্ষ কোটি টাকার চুক্তির জন্য প্রযুক্তিগত এবং বাণিজ্যিক প্রস্তাব নয়াদিল্লির কাছে জমা দিয়েছে। ভারতের মে মাসে জারি করা লেটার অব রিকোয়েস্টের জবাবেই এই প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তিতে শুধু ফ্রান্স থেকে তৈরি যুদ্ধবিমান কিনে আনার পরিকল্পনা নেই। বরং ভারতে বড় অংশের উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশীয় সংস্থাগুলিকে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ কাউন্সিল ফেব্রুয়ারিতেই এই সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার অনুমোদন দিয়েছিল। বাকি প্রক্রিয়া শেষ হলে চুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটির অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
কেন আরও ১১৪টি রাফায়েল চাইছে ভারত?
ভারতীয় বায়ুসেনা দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনের ঘাটতির মুখে রয়েছে। অন্যদিকে পুরনো যুদ্ধবিমান ধাপে ধাপে অবসর নিচ্ছে। দেশীয় তেজস এমকে-২ এবং অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট বা এএমসিএ ভবিষ্যতে বায়ুসেনার গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই প্রকল্পগুলির উন্নয়ন, পরীক্ষা, উৎপাদন এবং বায়ুসেনায় অন্তর্ভুক্ত হতে সময় লাগবে।
Also Read | প্রথম বারের জন্য ভারত থেকে গ্যাসোলিন আমদানি করতে চলেছে রাশিয়া
এই পরিস্থিতিতে ১১৪টিরাফায়েলকে একটি ‘ব্রিজ’ বা মধ্যবর্তী সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ, পুরনো যুদ্ধবিমান অবসর নেওয়া এবং দেশীয় নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান পরিষেবায় আসার মধ্যবর্তী সময়ে বায়ুসেনার যুদ্ধক্ষমতা ধরে রাখতে রাফায়েলের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে ৩৬টি রাফায়েল রয়েছে। এগুলি আম্বালার ১৭ স্কোয়াড্রন এবং হাসিমারার ১০১ স্কোয়াড্রনে মোতায়েন রয়েছে।
১১৪টি রাফায়েলের মধ্যে ৯৬টি তৈরি হবে ভারতে
প্রস্তাবিত চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দেশীয় উৎপাদন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮টি রাফায়েল সরাসরি তৈরি অবস্থায় ভারতে আসবে। বাকি ৯৬টি যুদ্ধবিমান ভারতে সংযোজন করা হবে। অর্থাৎ, মোট বিমানের ৮০ শতাংশেরও বেশি ভারতে সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভারতীয় বায়ুসেনা মোট ১১৪টি বিমানের মধ্যে ৮৮টি সিঙ্গল-সিট এবং ২৬টি টুইন-সিট রাফায়েল চেয়েছে। দাসো অ্যাভিয়েশন ভারতীয় বেসরকারি সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করে বিমান সংযোজন এবং বিভিন্ন সিস্টেম একীভূত করার কাজ করতে পারে।
প্রস্তাবিত প্রযুক্তি হস্তান্তরের মধ্যে বিমানের এয়ারফ্রেম, ইঞ্জিন এবং অ্যাভিয়নিক্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও রয়েছে। দাসো, সাফরান এবং থ্যালেসের মতো ফরাসি সংস্থাগুলি এই উৎপাদন পরিকাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
Also Read | ফের বাড়ল অস্থিরতার আশঙ্কা! ‘যন্তরমন্তর সিজন ২’ আসছে, বললেন দিপকে
রাফায়েলের সবচেয়ে বড় শক্তি কোথায়?
রাফায়েল একটি টুইন-ইঞ্জিন, মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। অর্থাৎ একই বিমান দিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষা, শত্রু বিমানের বিরুদ্ধে লড়াই, স্থল আক্রমণ, নজরদারি এবং সমুদ্রভিত্তিক হামলার মতো একাধিক ধরনের অভিযান চালানো যায়। ভারতের পশ্চিম এবং উত্তর সীমান্তের পাশাপাশি সমুদ্রসীমাতেও একসঙ্গে যুদ্ধপ্রস্তুতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই বহুমুখী ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
বিমানটির ডেল্টা-উইং নকশার সঙ্গে ক্লোজ-কাপলড ক্যানার্ড এবং ডিজিটাল ফ্লাই-বাই-ওয়্যার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। এর ফলে উচ্চমাত্রার ম্যানুভারেবিলিটি বা দ্রুত দিক পরিবর্তনের ক্ষমতা পাওয়া যায়।
রাফায়েলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হল থ্যালেস আরবিই২-এইএসএ রাডার। এটি একসঙ্গে একাধিক আকাশ লক্ষ্য শনাক্ত এবং ট্র্যাক করতে পারে। খারাপ আবহাওয়া এবং তীব্র ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মধ্যেও কাজ করার জন্য এই রাডার তৈরি করা হয়েছে। স্থলভাগের মানচিত্র তৈরি এবং সমুদ্রের একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত করার ক্ষমতাও রয়েছে।
শত্রুর রাডার এড়িয়ে কীভাবে লড়বে রাফায়েল?
রাফায়েলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হল স্পেকট্রা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার স্যুট। থ্যালেস এবং এমবিডিএ তৈরি এই ব্যবস্থা শত্রুর রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র এবং লেজারভিত্তিক হুমকি শনাক্ত করতে পারে।
হুমকি শনাক্ত হওয়ার পর ইলেকট্রনিক জ্যামিং, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক এবং ইনফ্রারেড ডিকয় এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিমানকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে স্পেকট্রা। এর ফলে শত্রুর শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও রাফায়েলের টিকে থাকার ক্ষমতা বাড়ে।
মেটিওর থেকে স্ক্যাল্প, কী কী অস্ত্র বহন করতে পারে?
রাফায়েলের যুদ্ধক্ষমতার বড় অংশ নির্ভর করে তার অস্ত্রভাণ্ডারের উপর। আকাশ থেকে আকাশে আক্রমণের জন্য এটি মেটিওর এবং মিকা ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে।
দূরপাল্লার স্থল আক্রমণের জন্য রয়েছে স্ক্যাল্প ক্রুজ মিসাইল। এছাড়া এএএসএম হ্যামার নির্ভুলভাবে স্থল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যবহার করা যায়। সমুদ্রের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে রাফায়েল এএম৩৯ এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করতে পারে। বিমানে একটি ৩০ মিলিমিটার অভ্যন্তরীণ কামান রয়েছে।
ভারতের জন্য আপগ্রেডের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ
রাফায়েলের নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে এর সেন্সর, অস্ত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সফটওয়্যার আপগ্রেড করা যায়। ভারত প্রস্তাবিত বিমানগুলির জন্য সর্বশেষ এফ৪ স্ট্যান্ডার্ড চাইছে এবং ভবিষ্যতের এফ৫ স্ট্যান্ডার্ড-এর সঙ্গে যুক্ত কিছু সক্ষমতাও বিবেচনা করছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক পরিষেবায় থাকার কথা মাথায় রাখলে এই আপগ্রেড ক্ষমতা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রযুক্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিমান বদলে না ফেলেও সেন্সর, অস্ত্র এবং সফটওয়্যার উন্নত করা সম্ভব হবে।
১১৪টি এলে ভারতে মোট কত রাফায়েল থাকবে?
প্রস্তাবিত ১১৪টি রাফায়েল কেনা হলে ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে মোট ১৫০টি রাফায়েল থাকবে। বর্তমানে থাকা ৩৬টির সঙ্গে নতুন ১১৪টি যোগ হবে।
এর পাশাপাশি ভারতীয় নৌবাহিনী আলাদাভাবে ২৬টি রাফায়েল-এম কেনার চুক্তি করেছে। ফলে বায়ুসেনা এবং নৌবাহিনী মিলিয়ে ভারতের মোট রাফায়েল সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ১৭৬টি হতে পারে।
নৌবাহিনীর জন্যও রাফায়েল
ভারতীয় নৌবাহিনী ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ফ্রান্সের সঙ্গে ২৬টি রাফায়েল-এম কেনার জন্য প্রায় ৬৩,০০০ কোটি টাকার চুক্তি করে। এর মধ্যে ২২টি সিঙ্গল-সিট এবং চারটি টুইন-সিট বিমান রয়েছে। রাফায়েল-এম বিশেষভাবে বিমানবাহী রণতরীতে ব্যবহারের জন্য তৈরি। এর শক্তিশালী ল্যান্ডিং গিয়ার এবং অ্যারেস্টর হুক রয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনী এই যুদ্ধবিমানগুলিকে আইএনএস বিক্রান্ত এবং আইএনএস বিক্রমাদিত্য থেকে পরিচালনা করার পরিকল্পনা করেছে।
শুধু যুদ্ধবিমান কেনা নয়, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-তেও জোর
নতুন রাফায়েল চুক্তিটি ২০১৬ সালের ৩৬টি রাফায়েল কেনার চুক্তির তুলনায় আলাদা। এবার ভারতের লক্ষ্য শুধু তৈরি বিমান কেনা নয়, বরং দেশেই বড় আকারের উৎপাদন পরিকাঠামো তৈরি করা। প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশীয় উৎপাদনে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ দেশীয় উপাদান থাকার কথা। উৎপাদন ব্যবস্থা পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে।
হায়দরাবাদে সাফরানের এম৮৮ ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং ওভারহল বা এমআরও কেন্দ্র তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে রাফায়েলের ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।
১১৪টি রাফায়েল কেনার প্রস্তাবকে শুধু ভারতের যুদ্ধবিমান সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। পুরনো যুদ্ধবিমান অবসর নেওয়ার সময় তৈরি হওয়া ঘাটতি সামলানোর পাশাপাশি তেজস এমকে-২ এবং এএমসিএ-র মতো দেশীয় প্রকল্প পরিণত হওয়ার সময় পর্যন্ত আধুনিক যুদ্ধক্ষমতা ধরে রাখাই এই প্রস্তাবের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে ভারতে উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
