নয়াদিল্লি: প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে দিল্লির লালকেল্লার প্রাচীরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় এবং প্রজাতন্ত্র দিবসে কর্তব্যপথে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠানে শোনা যায় একের পর এক তোপের শব্দ। এই ২১ বার তোপধ্বনি (21 Gun Salute) ভারতের দুই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানের অন্যতম পরিচিত সামরিক ঐতিহ্য।
এই তোপধ্বনি শুধুমাত্র সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সম্মান, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্র ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীকী বার্তা। কিন্তু কেন ঠিক ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয়? কোথা থেকেই বা এল এই প্রথা? আর কেন স্বাধীনতা দিবস এবং প্রজাতন্ত্র দিবস, দুই অনুষ্ঠানেই এই সামরিক সম্মান দেওয়া হয়?
এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে কয়েক শতাব্দী আগের ইউরোপের নৌযুদ্ধের ইতিহাসে। সেই সময়ে নৌবাহিনীর কামান শুধুমাত্র যুদ্ধের অস্ত্র ছিল না, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে কোনও বন্দরে প্রবেশের সংকেত হিসেবেও ব্যবহার করা হত।
২১ বার তোপধ্বনির প্রথার শুরু কোথায়?
তোপধ্বনি দিয়ে সম্মান জানানোর ঐতিহ্য কয়েক শতাব্দী পুরনো। এর অন্যতম প্রাচীন ব্যাখ্যা ইউরোপের নৌযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। কোনও যুদ্ধজাহাজ বন্ধুত্বপূর্ণ বন্দরে প্রবেশ করার সময় সমুদ্রের দিকে কামান ছুড়ত। এর উদ্দেশ্য ছিল বোঝানো যে, জাহাজটি শত্রুতামূলক উদ্দেশ্য নিয়ে বন্দরে আসেনি।
কামান থেকে গোলা ছোড়ার পর জাহাজের অস্ত্র সাময়িকভাবে খালি হয়ে যেত। ফলে জাহাজটি সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করতে পারবে না, এমন একটি বার্তাও দেওয়া হত। ধীরে ধীরে এই প্রথা সামরিক সৌজন্যের আনুষ্ঠানিক রূপ নেয়। মার্কিন নৌ-ইতিহাস ও ঐতিহ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, নৌবাহিনীর ক্ষেত্রে সাতটি কামানের সঙ্গে তোপধ্বনির প্রথা যুক্ত হয়েছিল। স্থলভাগের ব্যাটারি একটি জাহাজের প্রতিটি গোলার বিপরীতে তিনটি করে গোলা ছুড়তে পারত। এর একটি কারণ ছিল, স্থলভাগে বারুদ তুলনামূলক বেশি পরিমাণে সংরক্ষণ করা সম্ভব হত।
Also Read | চাঁদে ঘাঁটি তৈরির মার্কিন পরিকল্পনায় ভারত! ISRO-কে NASA-র আমন্ত্রণ
নৌ-সংকেত থেকে জাতীয় সম্মানের প্রতীক
শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য প্রকাশের একটি ব্যবহারিক পদ্ধতি থেকে ধীরে ধীরে তোপধ্বনি পরিণত হয় সামরিক সম্মানের আনুষ্ঠানিক প্রতীকে। পরবর্তীকালে ২১ বার তোপধ্বনি রাষ্ট্রপ্রধান, সম্রাট এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বিভিন্ন দেশে এই প্রথার আলাদা নিয়ম তৈরি হলেও ২১ বার তোপধ্বনি আন্তর্জাতিকভাবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সামরিক সম্মানের অন্যতম স্বীকৃত রূপ হয়ে ওঠে। ভারত ব্রিটিশ শাসনামল থেকে বেশ কিছু সামরিক আনুষ্ঠানিকতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ আধিকারিক এবং দেশীয় রাজ্যগুলির জন্য নির্দিষ্ট মর্যাদার ভিত্তিতে তোপধ্বনির বিভিন্ন স্তর ছিল।
কিন্তু স্বাধীনতার পর এর অর্থ বদলে যায়। স্বাধীন ভারত এই সামরিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখলেও ঔপনিবেশিক মর্যাদাক্রমের পরিবর্তে তাকে একটি সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।
স্বাধীনতা দিবসে কেন ২১ বার তোপধ্বনি?
১৫ আগস্ট ১৯৪৭ ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই স্বাধীনতার স্মরণেই প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। দিল্লির লালকেল্লায় কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত এবং ২১ বার তোপধ্বনিও যুক্ত থাকে। তোপধ্বনি এখানে স্বাধীন ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় পতাকার প্রতি সামরিক সম্মানের প্রতীক। অর্থাৎ, লালকেল্লায় তেরঙ্গা উত্তোলনের সঙ্গে ২১ বার তোপধ্বনি শুধু একটি পুরনো সামরিক রীতি নয়, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের মর্যাদার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও।
Also Read | সামনেই ৮০তম স্বাধীনতা দিবস, দেশবাসীকে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’র ডাক মোদীর!
প্রজাতন্ত্র দিবসেও কেন ২১ বার?
স্বাধীনতা দিবস এবং প্রজাতন্ত্র দিবস, দুটিই ভারতের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত হলেও তাদের ঐতিহাসিক তাৎপর্য আলাদা। ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার দিনকে স্মরণ করে।
অন্যদিকে ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান কার্যকর হওয়ার এবং দেশ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হওয়ার দিন। প্রজাতন্ত্র দিবসে কর্তব্যপথে রাষ্ট্রপতি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সঙ্গে ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয়। দুই অনুষ্ঠানেই এই তোপধ্বনি রাষ্ট্রীয় সম্মানের একটি সাধারণ সামরিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সত্যিই কি ২১টি কামান ব্যবহার করা হয়?
এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘২১ বার তোপধ্বনি’ বললেই যে ২১টি আলাদা কামান থেকে একটি করে গোলা ছোড়া হয়, তা নয়। ভারতের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম সংখ্যক ফিল্ড গান ব্যবহার করে মোট ২১টি রাউন্ড ছোড়া হতে পারে। অর্থাৎ একই কামান একাধিকবার তোপধ্বনি দিতে পারে।
এখানে মূল বিষয় হল ২১টি রাউন্ড, ২১টি আলাদা কামান নয়। অনুষ্ঠানের সময় ব্যবহৃত কামানের সংখ্যা এবং আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় সময়ের সঙ্গে কিছু পরিবর্তনও হয়েছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় সাত থেকে আটটি আর্টিলারি কামান রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে তিনটি করে রাউন্ড ছোড়ে। জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রায় ৫২ সেকেন্ডের মধ্যে এই তোপধ্বনি সম্পন্ন করা হয়।
দেশীয় কামানে বদল
২১ বার তোপধ্বনির ঐতিহ্য বহু পুরনো হলেও এই অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত কামানেরও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই সামরিক সম্মানের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ২৫-পাউন্ডার কামানের নাম জড়িয়ে ছিল। তবে ২০২৩ সালে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রথমবার দেশীয়ভাবে তৈরি ১০৫ মিলিমিটার ইন্ডিয়ান ফিল্ড গান দিয়ে ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয়। এর ফলে পুরনো সামরিক ঐতিহ্যের সঙ্গে ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদনের নতুন অধ্যায়ের একটি প্রতীকী সংযোগ তৈরি হয়।
অর্থাৎ, যে সামরিক রীতি একসময় ঔপনিবেশিক শাসনের অংশ ছিল, স্বাধীন ভারতের অনুষ্ঠানে সেটিই এখন দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।
তোপধ্বনির সময় ঠিক কী হয়?
২১ বার তোপধ্বনি কোনও স্বতঃস্ফূর্ত কামান প্রদর্শন নয়। এটি অত্যন্ত নির্দিষ্ট সামরিক প্রোটোকল মেনে পরিচালিত হয়। প্রজাতন্ত্র দিবসের ক্ষেত্রে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সঙ্গীত এবং তোপধ্বনির মধ্যে নির্দিষ্ট সমন্বয় থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় ব্ল্যাঙ্ক সেরিমোনিয়াল রাউন্ড, অর্থাৎ এমন আনুষ্ঠানিক গোলা যাতে কোনও লক্ষ্যবস্তুর দিকে বিস্ফোরক গোলা ছোড়া হয় না। মূল উদ্দেশ্য হল ঐতিহ্যবাহী তোপধ্বনির মাধ্যমে সামরিক সম্মান জানানো। তোপের শব্দ এবং ধোঁয়া সেই সামরিক সম্মানের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ।
জাতীয় পতাকা ও ২১ বার তোপধ্বনি
ভারতের প্রধান রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলিতে জাতীয় পতাকার সঙ্গে ২১ বার তোপধ্বনির বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। জাতীয় পতাকা দেশের প্রতীক। জাতীয় সঙ্গীত দেশের সম্মিলিত পরিচয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। আর তোপধ্বনি প্রকাশ করে সামরিক সম্মান ও রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা। এই তিনটি একসঙ্গে ভারতের জাতীয় অনুষ্ঠানগুলির অন্যতম পরিচিত দৃশ্য তৈরি করে।
এখনও কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহ্য?
পুরনো ইউরোপীয় যুদ্ধজাহাজের ডেক থেকে শুরু হওয়া ২১ বার তোপধ্বনির ঐতিহ্য বহু পথ পেরিয়ে আজ জাতীয় সম্মানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একসময় কোনও যুদ্ধজাহাজ তার অস্ত্র খালি করে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের সংকেত দিত। পরে সেই রীতি সামরিক সৌজন্যে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধান ও জাতীয় অনুষ্ঠানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সম্মানের রূপ নেয়। ভারতে স্বাধীনতার পর এই ঐতিহ্য নতুন অর্থ পেয়েছে।
এখন এই তোপধ্বনি ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব বা দেশীয় রাজ্যগুলির মর্যাদাক্রমের প্রতীক নয়। এটি স্বাধীন, সার্বভৌম এবং সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মানের ভাষা।
প্রতি ১৫ আগস্ট, যখন প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লায় তেরঙ্গা উত্তোলন করেন, এবং প্রতি ২৬ জানুয়ারি, যখন রাষ্ট্রপতি কর্তব্যপথে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, তখন সেই ২১ বার তোপধ্বনি ভারতের বর্তমানকে কয়েক শতাব্দী পুরনো এক সামরিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে।
