ইসলামাবাদ: পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির (Zardari)একটি মন্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের প্রসঙ্গে ‘সহ্য’ বা ‘tolerate’ শব্দটি ব্যবহার করে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিয়ে ভারত-পাকিস্তান দুই দেশেই আলোচনা শুরু হয়েছে। একই বক্তব্যে জারদারি ভারতের ‘অখণ্ড ভারত’ ভাবনার প্রসঙ্গও টেনে আনেন। ফলে স্বাধীনতা দিবসের মঞ্চে তাঁর মন্তব্য নতুন করে দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত (Zardari)একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন জারদারি। সেখানেই ভারতের প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে তিনি বলেন, ভারতীয়দের নিজেদের একটি এজেন্ডা রয়েছে এবং তারা ‘অখণ্ড ভারত’-এ বিশ্বাস করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তান সেই ধারণার সঙ্গে একমত নয়, কারণ পাকিস্তান নিজেদের একটি মুসলিম দেশ হিসেবে দেখে। এরপর দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গে এসে তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের মুসলিমরা সেখানে থাকা হিন্দু জনসংখ্যাকে ‘সহ্য’ করে এবং তাঁদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে।
আরও দেখুনঃ আফগানিস্তানে তালিবান শাসনের ৫ বছর! গভীর উদ্বেগে রাষ্ট্রসঙ্ঘ
জারদারির (Zardari)বক্তব্যের সবচেয়ে বেশি আলোচিত অংশ অবশ্যই ‘৩ থেকে ৪ শতাংশ হিন্দু’ প্রসঙ্গ। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি দাবি করেন, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩ থেকে ৪ শতাংশ হিন্দুকে মুসলিমরা সহ্য করে। কিন্তু এখানেই সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের বড় অমিল সামনে এসেছে।
পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্সের ২০২৩ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ‘Hindu Jati’ জনসংখ্যা ৩৮.৬৭ লক্ষ এবং ‘Scheduled Castes’ জনসংখ্যা প্রায় ১৩.৪৯ লক্ষ। দুই শ্রেণি মিলিয়ে সংখ্যা প্রায় ৫২.১৭ লক্ষ। মোট ২৪.০৫ কোটির জনসংখ্যার হিসাবে এই দুই শ্রেণির সম্মিলিত অংশ প্রায় ২.১৭ শতাংশ।
আরও দেখুনঃ বেলুচিস্তানের কেচ জেলায় দিনেদুপুরে পাক সেনার কনভয় ওড়াল বেলুচ বাহিনী
অর্থাৎ, জারদারির (Zardari)বলা ৩-৪ শতাংশের হিসাবটি পাকিস্তানের সর্বশেষ সরকারি আদমশুমারির সঙ্গে মেলে না। পাকিস্তানের নিজস্ব ২০২৩ সালের Census রিপোর্টেও ‘Hindu’ হিসাবে ১.৬১ শতাংশের হিসাব দেওয়া হয়েছে; পাশাপাশি Scheduled Castes-এর জন্য আলাদা শ্রেণি রয়েছে। ফলে কোন শ্রেণিকে কীভাবে গণনা করা হচ্ছে, তার ওপর শতাংশের হিসাব কিছুটা বদলাতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে ব্যবহৃত ৩-৪ শতাংশের সংখ্যা সরকারি Census-এর সরাসরি প্রতিফলন নয়।
জারদারির বক্তব্যের পর ভারতের বিশিষ্ট গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতারও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির ‘tolerate’ শব্দ ব্যবহারের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও দেশের নাগরিকদের নিয়ে ‘সহ্য করা’ ধরনের ভাষা ব্যবহার করাই প্রশ্ন তৈরি করে। তাঁর প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে বিতর্কের জায়গাটি শুধু একটি শব্দের ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থান নিয়ে বহু বছর ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক ধর্মান্তর, সংখ্যালঘু নারীদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ব্লাসফেমি আইনের অপব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতির মুখে সংখ্যালঘুদের ‘সহ্য’ করার দাবি স্বাভাবিকভাবেই সেই পুরনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
আরও দেখুনঃ শুল্ক এড়াতে চিনা পণ্য আমেরিকার বাজারে ঢুকিয়ে দিচ্ছে ভারত! মারাত্মক অভিযোগ হোয়াইট হাউসের
অন্যদিকে জারদারির (Zardari)বক্তব্যে ‘অখণ্ড ভারত’-এর প্রসঙ্গও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয়দের একটি অংশ ‘অখণ্ড ভারত’-এর ধারণায় বিশ্বাস করে এমন দাবি তুলে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে তার বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। স্বাধীনতা দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে এমন বক্তব্যের ফলে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে
