কলকাতা: দুটি ফুল, একটি ডাঁটা, একই শিকড়। ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ১৯৯৮ সালে নিজের হাতে ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক ‘এঁকেছিলেন’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তিনি যে দল তৈরি করেছিলেন, সেই সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচয়ের সঙ্গে গত ২৮ বছর ধরে এই প্রতীকটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে।
কিন্তু এখন সেই পরিচয়ই সাময়িকভাবে স্থগিত। তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দল ও প্রতীক নিয়ে বিরোধের জেরে নির্বাচন কমিশন ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক আপাতত ফ্রিজ করেছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনও গোষ্ঠীই পুরনো নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।
৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের আগে কমিশনের এই অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। শুক্রবার কমিশন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠীকে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘ফুটবল প্লেয়ার’ প্রতীক এবং অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করা গোষ্ঠীকে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘এনভেলপ’ প্রতীক দিয়েছে।
কেন পুরনো নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করল কমিশন?
নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন মূল প্রশ্ন, দুই গোষ্ঠীর মধ্যে কোনটি আসল তৃণমূল কংগ্রেস। এই ধরনের বিরোধের ক্ষেত্রে নির্বাচন প্রতীক সংক্রান্ত ১৯৬৮ সালের আদেশের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সময় যথেষ্ট নয় বলে কমিশন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিয়েছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষকে সমান অবস্থানে রাখার জন্যই পুরনো নাম ও প্রতীক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস বিভাজনের নজির
এই ধরনের পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজিরগুলির একটি হল ১৯৬৯ সালের কংগ্রেস বিভাজন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কংগ্রেসের পুরনো নেতৃত্বের বিরোধ চরমে পৌঁছেছিল। দল দুটি গোষ্ঠীতে ভাগ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনকে ঠিক করতে হয়েছিল, কোন পক্ষকে আসল কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। সেই সময় কমিশন তিনটি বিষয় বিবেচনা করেছিল, দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, দলের সংবিধান এবং সাংগঠনিক ও আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন।
প্রথম দুটি পরীক্ষায় স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি। শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধীর গোষ্ঠীর পক্ষে বেশি সংখ্যক সাংসদ ও বিধায়ক এবং অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সদস্যদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে ইন্দিরা গোষ্ঠীকে আসল কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টও নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেয়।
প্রতীক হারিয়েও নতুন প্রতীক বেছে নিয়েছিলেন ইন্দিরা
কংগ্রেসের পুরনো ‘দুই বলদ’ প্রতীক পাওয়ার সুযোগ থাকলেও ইন্দিরা গান্ধীর গোষ্ঠী অন্তর্বর্তী সময়ে পাওয়া ‘গরু ও বাছুর’ প্রতীক ব্যবহার করেছিল। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলায়। ১৯৭৮ সালে ফের কংগ্রেসে বিভাজন হলে ইন্দিরা গান্ধীর নতুন গোষ্ঠী ‘গরু ও বাছুর’ প্রতীকও হারায়।
তখন পুরনো ‘দুই বলদ’ প্রতীক চাওয়া হলেও সেটি ফ্রিজ করা ছিল। শেষ পর্যন্ত নতুন প্রতীক বেছে নেওয়ার সময় ‘হাত’ বা খোলা তালুর প্রতীক সামনে আসে। সেই প্রতীকই গ্রহণ করেন ইন্দিরা গান্ধী। পরে ১৯৮০ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সেই প্রতীক নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং হাত প্রতীকটি পরবর্তীতে কংগ্রেসের স্থায়ী নির্বাচনী পরিচয়ে পরিণত হয়।
শিবসেনা ও এনসিপির ক্ষেত্রেও বদলেছে হিসাব
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শিবসেনা ও এনসিপির বিভাজনের ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। ২০২৩ সালের শিবসেনা মামলায় কমিশন একনাথ শিন্দের গোষ্ঠীকে দলের নাম ও ‘ধনুক-বাণ’ প্রতীক দেয়। কমিশনের সিদ্ধান্তে শিন্দে গোষ্ঠীর সাংসদ ও বিধায়কদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ২০২৪ সালের এনসিপি বিরোধেও কমিশন সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে অজিত পাওয়ারের গোষ্ঠীকে আসল এনসিপি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলায় সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তৃণমূলের ক্ষেত্রে ২২ জুনের বৈঠক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমান তৃণমূল বিরোধে ২২ জুনের একটি বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ওই দিন অরূপ রায়কে দলের ‘ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটি’র চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয় বলে বিরোধী গোষ্ঠীর দাবি। অরূপ রায়ের গোষ্ঠীর বক্তব্য, আগের ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটির মেয়াদ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠীর বক্তব্য, কমিটির মেয়াদ পাঁচ বছর এবং সেই হিসাবে পরবর্তী সাংগঠনিক নির্বাচন ২০২৭ সালে হওয়ার কথা। ফলে ২২ জুনের বৈঠকের বৈধতা এবং আগের কমিটির মেয়াদ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। এই প্রশ্নগুলিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এখন নজর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে
এই মুহূর্তে ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক কোনও গোষ্ঠীর হাতেই নেই। ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে দুই পক্ষকে পৃথক নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়তে হবে। নির্বাচন কমিশনের শুক্রবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মমতা গোষ্ঠীর পরিচয় হবে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং প্রতীক ‘ফুটবল প্লেয়ার’। অরূপ রায়-ঋতব্রত গোষ্ঠীর পরিচয় হবে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং প্রতীক ‘এনভেলপ’।
তবে এগুলি আপাতত উপনির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। আসল তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক শেষ পর্যন্ত কোন গোষ্ঠী পাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর। এই সিদ্ধান্তে সাংগঠনিক কাঠামো, দলের অভ্যন্তরীণ বৈধতা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমর্থন, একাধিক বিষয়ই বিবেচনায় আসতে পারে।
Read More: নীতিশের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ আকাশ, হার্দিকের পর নতুন অলরাউন্ডার?
Read More: Jio রিচার্জে বিনামূল্যে এই পরিষেবা! ৪০০০ টাকার সাবস্ক্রিপশন সুবিধা
Read More: ভারতে প্রোটিনের চাহিদা তিনগুণ! দুধ-ডালের সঙ্গে বাড়বে কার্বন নিঃসরণও
