নাসার রহস্যময় এক্স-প্লেন, নতুন এসআর-৭১ কি আরও দ্রুত উড়বে?

নাসা (NASA) কি আবারও অত্যন্ত উচ্চ গতি ও উচ্চতায় উড়তে সক্ষম পরীক্ষামূলক বিমানের যুগে ফিরতে চলেছে? সম্প্রতি নাসার একটি উপস্থাপনায় দেখা যাওয়া রহস্যময় একটি বিমানের…

nasa-mystery-x-plane-sr-71-blackbird-higher-faster-aircraft

নাসা (NASA) কি আবারও অত্যন্ত উচ্চ গতি ও উচ্চতায় উড়তে সক্ষম পরীক্ষামূলক বিমানের যুগে ফিরতে চলেছে? সম্প্রতি নাসার একটি উপস্থাপনায় দেখা যাওয়া রহস্যময় একটি বিমানের ছবি ঘিরে এমনই জল্পনা তৈরি হয়েছে। দেখতে অনেকটাই কিংবদন্তি এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ডের মতো এই বিমানের পরিচয় এখনও প্রকাশ করেনি নাসা।

Advertisements

লস অ্যাঞ্জেলেসে আয়োজিত অল-ইন সামিটে নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানের উপস্থাপনায় একটি স্লাইডে এই বিমানের ছবি দেখা যায়। স্লাইডটির শিরোনাম ছিল, “রিবিল্ডিং আওয়ার এক্স-প্লেন পোর্টফোলিও”। সেখানে নাসার পরীক্ষামূলক বিমান কর্মসূচিকে নতুন করে জোরদার করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।

   

এসআর-৭১ বলতেই রহস্য আরও বাড়ে

উপস্থাপনার পর অল-ইন-এর সঞ্চালক চামাথ পালিহাপিটিয়া ছবিটিকে এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু আইজ্যাকম্যান সরাসরি সেই পরিচয় নিশ্চিত করেননি। তাঁর জবাব ছিল, “আপনি নিশ্চিত এটা ব্ল্যাকবার্ড?”

এরপর তিনি বলেন, নাসা আবার “উঁচুতে এবং দ্রুত উড়ার ব্যবসায়” ফিরছে। আইজ্যাকম্যান আরও জানান, নাসা ফ্লাইট টেস্টিংয়ে নতুন করে জোর দিচ্ছে এবং শিল্প সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করে এয়ারফ্রেম ও প্রপালশন প্রযুক্তির সীমা আরও এগিয়ে নিতে চাইছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নাসা এখনও বলেনি যে ছবিতে দেখা বিমানটি সত্যিই তৈরি হচ্ছে। এমনকি সেটি কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্পের বাস্তব নকশা কি না, তাও নিশ্চিত করা হয়নি। তাই এটিকে এখনই “নতুন এসআর-৭১” বলা ঠিক হবে না।

Advertisements

এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড ছিল উচ্চ গতি ও উচ্চ উচ্চতায় উড়তে সক্ষম একটি বিশেষ রিকনেসাঁস বিমান। লকহিডের স্কাঙ্ক ওয়ার্কস এটি তৈরি করেছিল। বিমানটি প্রথম উড়েছিল ১৯৬৪ সালের ২২ ডিসেম্বর। নাসার তথ্য অনুযায়ী, এসআর-৭১ প্রায় ম্যাক ৩.২ গতিতে ক্রুজ করতে পারত এবং ৮৫,০০০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় উড়তে সক্ষম ছিল। অর্থাৎ শব্দের গতির তিন গুণেরও বেশি গতিতে দীর্ঘ সময় উড়তে পারাই ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এসআর-৭১-এর মূল শক্তি ছিল গতি, উচ্চতা এবং দীর্ঘ-পাল্লার নজরদারি প্রযুক্তির সমন্বয়। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় প্রতিকূল আকাশসীমার উপর দিয়ে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে সামরিক কাজের পাশাপাশি নাসাও ব্ল্যাকবার্ডকে গবেষণার কাজে ব্যবহার করেছিল। এর মাধ্যমে বায়ুগতিবিদ্যা, প্রপালশন, কাঠামো, তাপ-সহনশীল উপাদান, উচ্চ গতির যন্ত্রপাতি এবং সনিক বুম নিয়ে গবেষণা করা হয়েছিল।

১৯৯৯ সালে শেষ উড়ান

এসআর-৭১-এর শেষ উড়ান হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর এডওয়ার্ডস এয়ার ফোর্স বেসে। নাসার রেকর্ড অনুযায়ী, সেই উড়ানে বিমানটি প্রায় ৮০,১০০ ফুট উচ্চতায় উঠে ম্যাক ৩.২১ গতিতে উড়েছিল। সেটিই ছিল কোনও ব্ল্যাকবার্ড বিমানের শেষ উড়ান। নাসা ১৯৯০-এর দশকে এসআর-৭১-কে পরীক্ষামূলক গবেষণার প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ব্যবহার করেছিল। একটি বিমান লিনিয়ার অ্যারোস্পাইক রকেট ইঞ্জিন সংক্রান্ত পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্য পরীক্ষায় উচ্চ গতিতে বায়ুমণ্ডল, অতিবেগুনি আলো এবং সনিক বুম নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

নতুন এক্স-প্লেন কী করতে পারে?

বর্তমানে নাসার সবচেয়ে আলোচিত পরীক্ষামূলক বিমান হল এক্স-৫৯। এটি মূলত সুপারসনিক উড়ানের সময় তৈরি হওয়া প্রচণ্ড সনিক বুমকে অনেকটা কমানোর প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে। কিন্তু আইজ্যাকম্যানের বক্তব্যে যে নতুন দিকটির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, সেটি আরও বেশি গতি এবং উচ্চতার দিকে। নাসার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও এক্স-প্লেন তৈরি করে এমন প্রযুক্তি পরীক্ষা করার লক্ষ্য রয়েছে, যা বিমানকে আগের কয়েক দশকের তুলনায় আরও উঁচু, আরও দূরে এবং আরও দ্রুত উড়তে সাহায্য করতে পারে।

এখানে সম্ভাব্য গবেষণার ক্ষেত্র হতে পারে নতুন এয়ারফ্রেম, উন্নত ইঞ্জিন, তাপ-সহনশীল উপাদান, উচ্চ গতির বায়ুগতিবিদ্যা এবং নতুন ধরনের প্রপালশন প্রযুক্তি। তবে রহস্যময় বিমানটির গতি, ইঞ্জিন, পরিসর বা সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে নাসা এখনও কোনও নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি।

কেন এখনও উচ্চ গতি ও উচ্চতা গুরুত্বপূর্ণ?

আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘ-পাল্লার রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং একাধিক সেন্সরের সমন্বিত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়। ফলে কোনও বিমানকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে হলে শুধু গতি যথেষ্ট নয়। উচ্চ গতি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার সময় কমিয়ে দিতে পারে। হাইপারসনিক প্রযুক্তি নিয়ে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিজের গবেষণাতেও উচ্চ গতি ও উচ্চতার সম্ভাব্য সামরিক সুবিধার পাশাপাশি তাপ, প্রপালশন, নিয়ন্ত্রণ এবং উপাদান প্রযুক্তির মতো বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই ভবিষ্যতের কোনও উচ্চগতির পরীক্ষামূলক বিমান তৈরি হলে সেখানে শুধু এসআর-৭১-এর মতো গতি নয়, বরং উন্নত সেন্সর, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, কম দৃশ্যমানতা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নতুন ব্ল্যাকবার্ড, নাকি শুধুই ধারণার ছবি?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর হল, নাসা নতুন এসআর-৭১ তৈরি করছে বলে কোনও নিশ্চিত ঘোষণা দেয়নি। রহস্যময় ছবিটি কোনও বাস্তব প্রকল্পের প্রাথমিক ধারণা, ভবিষ্যৎ এক্স-প্লেনের সম্ভাব্য নকশা অথবা শুধুই ধারণাগত ছবি হতে পারে।

তবে আইজ্যাকম্যানের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট। নাসা পরীক্ষামূলক বিমান গবেষণায় আবারও বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে চাইছে। এক সময় এসআর-৭১ ও এক্স-১৫-এর মতো গবেষণা বিমান অত্যন্ত উচ্চ গতি ও উচ্চতার সীমা পরীক্ষা করেছিল। এখন নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি সেই সীমাকে আরও এগিয়ে নিতে পারে কি না, সেটিই ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন। নাসা পরবর্তী সময়ে বিমানটির পরিচয় বা প্রকল্পের বিস্তারিত প্রকাশ করলে তবেই জানা যাবে, রহস্যময় এই কালো সিলুয়েট সত্যিই নতুন কোনও উচ্চগতির এক্স-প্লেনের ইঙ্গিত ছিল, নাকি উপস্থাপনার জন্য ব্যবহৃত একটি ধারণাগত ছবি।

Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট।  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।

Advertisements