বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি! মিসাইল-ড্রোনের জন্য নতুন Jet Engine বানাচ্ছে ভারত

নয়াদিল্লি: ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে জেট ইঞ্জিন (Jet Engine) নিয়ে কাজ এখন শুধু যুদ্ধবিমানেই সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে ফাইটার জেটের জন্য নিজস্ব ইঞ্জিন তৈরির চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে…

india-new-generation-jet-engine-missiles-drones-rde

নয়াদিল্লি: ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে জেট ইঞ্জিন (Jet Engine) নিয়ে কাজ এখন শুধু যুদ্ধবিমানেই সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে ফাইটার জেটের জন্য নিজস্ব ইঞ্জিন তৈরির চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ক্রুজ মিসাইল, ড্রোন এবং জেটচালিত লয়টারিং মিউনিশনের জন্য ছোট আকারের জেট ইঞ্জিনের একটি নতুন পরিবার তৈরির দিকে এগোচ্ছে দেশ। এই ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হয়েছে।

Advertisements

প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার বা ডিআরডিও-র গ্যাস টারবাইন রিসার্চ এস্টাবলিশমেন্ট বা জিটিআরই সম্প্রতি ৩৫০ কেজি-শ্রেণির এক্সপেন্ডেবল টার্বোজেট ইঞ্জিন তৈরির কথা জানিয়েছে। এই ধরনের ছোট পাওয়ারপ্ল্যান্ট সাধারণত ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোনের মতো প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার করা হয়। জেটচালিত লয়টারিং মিউনিশনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গেও এই প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে।

   

ক্রুজ মিসাইল থেকে লয়টারিং মিউনিশন

ছোট জেট ইঞ্জিন দীর্ঘদিন ধরেই ক্রুজ মিসাইলে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উদাহরণ হিসেবে, মার্কিন টমাহক ক্রুজ মিসাইলে প্রায় ৪০০ কেজি বা ৪ কিলোনিউটন শ্রেণির জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। ভারতের লং রেঞ্জ ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল বা এলআর-এলএซีএম-এও ৪৫০ কেজি শ্রেণির স্মল টার্বোফ্যান ইঞ্জিন বা এসটিএফই ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই ধরনের ইঞ্জিনের ব্যবহার শুধু ক্রুজ মিসাইলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। জেটচালিত লয়টারিং মিউনিশনও এই শ্রেণির পাওয়ারপ্ল্যান্ট ব্যবহার করতে পারে।

Advertisements

ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্প্রতি ১০৬টি অগ্নিবেগ জেটচালিত লয়টারিং মিউনিশন অর্ডার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলি শত্রুপক্ষের গভীর এলাকায় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য তৈরি এবং এর সার্কুলার এরর প্রোবাবিলিটি বা সিইপি ৫ মিটারের কম বলে দাবি করা হয়েছে। জেটচালিত হওয়ায় এই ধরনের লয়টারিং মিউনিশন শাহেদ বা গেরান সিরিজের তুলনায় বেশি গতিতে উড়তে পারে। ফলে দ্রুতগতির আক্রমণ এবং গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে এগুলির ব্যবহারিক গুরুত্ব বাড়তে পারে।

এবার ভারতের নজর ৫ কিলোনিউটন রোটেটিং ডিটোনেশন ইঞ্জিনে

ভারতের প্রপালশন রিসার্চ ইকোসিস্টেমে আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে রোটেটিং ডিটোনেশন ইঞ্জিন বা আরডিই প্রযুক্তিতে। বেসরকারি সংস্থা ডি-প্রপালস সম্প্রতি ৫ কিলোনিউটন থ্রাস্ট শ্রেণির একটি আরডিই প্রদর্শন করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এই পরীক্ষা একটি সার্টিফায়েড টেস্ট ফ্যাসিলিটিতে করা হয়েছে। আরডিই-র অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর তুলনামূলক সরল নকশা এবং কম মুভিং পার্টস। প্রচলিত ইঞ্জিনের তুলনায় এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে প্রপালশন সিস্টেমের নকশা ও উৎপাদন খরচে পরিবর্তন আনতে পারে।

বিশ্বজুড়ে আরডিই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হলেও অনেক পরীক্ষা ১-২ কিলোনিউটন থ্রাস্টের ছোট এয়ার-ব্রিদিং ডেমনস্ট্রেটরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সেই জায়গা থেকে ৫ কিলোনিউটন শ্রেণিতে স্থিতিশীল ডিটোনেশন ওয়েভ প্রদর্শনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেন আরডিই এত গুরুত্বপূর্ণ?

রোটেটিং ডিটোনেশন ইঞ্জিনে প্রেশার-গেন কমবাসশন ব্যবহার করা হয়। এর ফলে প্রচলিত কমবাসশন সাইকেলের তুলনায় জ্বালানি দক্ষতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ১৫-২৫ শতাংশ ফুয়েল-এফিশিয়েন্সি গেন পাওয়া গেলে একই লঞ্চ ওয়েট বা ক্রস-সেকশন বজায় রেখেও মিসাইলের পাল্লা বাড়ানো অথবা লয়টার টাইম বৃদ্ধি করা সম্ভব হতে পারে।

ডি-প্রপালসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সৌরভ ঝা-র মতে, এয়ার-ব্রিদিং আরডিই-র সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োগ হতে পারে সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইলে। ৫-১০ কিলোনিউটন থ্রাস্টের ইঞ্জিন ১০০-২০০ কেজি ওয়ারহেড বহনকারী ট্যাকটিক্যাল মিসাইলের জন্য উপযুক্ত হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এ ধরনের প্রপালশন সিস্টেম ভবিষ্যতে মিসাইলকে আরও ছোট, দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।

শুধু মিসাইল নয়, ভবিষ্যতের ড্রোনেও ব্যবহার হতে পারে

আরডিই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার আরও বিস্তৃত। ভবিষ্যতে উচ্চ-উচ্চতার ড্রোনে এই প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব হতে পারে। আরও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস টারবাইন এবং ডিটোনেশন স্টেজ মিলিয়ে কম্বাইন্ড-সাইকেল ড্রোন তৈরির সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, রোটেটিং ডিটোনেশন রকেট ইঞ্জিন ভবিষ্যতে লঞ্চ ভেহিকলের কনভেনশনাল আপার স্টেজের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এতে পেলোড এফিশিয়েন্সি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, একটি প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে ভারতের সামনে মিসাইল, ড্রোন এবং মহাকাশ উৎক্ষেপণ প্রযুক্তির একাধিক সম্ভাব্য পথ খুলতে পারে। তবে ৫ কিলোনিউটন পরীক্ষা মানেই যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত ইঞ্জিন নয়

এই অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রযুক্তিটি এখনও অপারেশনাল ডিপ্লয়মেন্ট থেকে অনেক দূরে। বর্তমান পরীক্ষাটি স্ট্যাটিক ওপেন-এয়ার রিগে নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির মধ্যে করা হয়েছে। বাস্তব উড়ানের ক্ষেত্রে অ্যাঙ্গেল-অফ-অ্যাটাক ডিস্টরশন, ফ্লাকচুয়েটিং প্রেসার এবং অ্যাকুস্টিক লোডের মতো অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ থাকবে।

আরডিই-র ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের দেয়ালে বারবার প্রেসার শক এবং অত্যন্ত বেশি হিট ফ্লাক্স তৈরি হয়। তাই অ্যারোস্পেস-গ্রেড ম্যাটেরিয়াল এবং উন্নত কুলিং প্রযুক্তি প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিটোনেশন ওয়েভ যাতে ফুয়েল ও এয়ার ম্যানিফোল্ডের দিকে আপস্ট্রিমে ফিরে না যায়, সেটিও বড় ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ।

এয়ার-ব্রিদিং আরডিই-র ক্ষেত্রে ইনলেট আনস্টার্টও অন্যতম বড় সমস্যা। অতিরিক্ত ব্যাকপ্রেশারের কারণে প্রপালশন সিস্টেম অস্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি ডিটোনেশনের ভাইব্রো-অ্যাকুস্টিক প্রোফাইল সামলানোর জন্য অ্যাডভান্সড ড্যাম্পিং প্রযুক্তি প্রয়োজন।

টিআরএল-৫-এ পৌঁছনোর তাৎপর্য

ডি-প্রপালসের কর্মসূচি টেকনোলজি রেডিনেস লেভেল বা টিআরএল-৫ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ, প্রযুক্তিটির অ্যাডভান্সড ডিজাইন একটি রিলেভ্যান্ট অপারেশনাল এনভায়রনমেন্টে ভ্যালিডেশনের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তবে এখান থেকে ফ্লাইট-রেডি ইঞ্জিন তৈরি করতে এখনও দীর্ঘ টেস্টিং প্রোগ্রাম প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে এনডিউরেন্স টেস্টিং, ম্যাটেরিয়ালস ভ্যালিডেশন, থার্মাল ম্যানেজমেন্ট এবং স্ট্রাকচারাল ফ্যাটিগ পরীক্ষা করতে হবে।

মিসাইল বা ড্রোনে ইঞ্জিন বসানোর ক্ষেত্রে শুধু প্রপালশন প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়। অ্যাভিওনিক্স, গাইডেন্স এবং সম্পূর্ণ সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গেও ইঞ্জিনকে একীভূত করতে হবে।

সামনে কী?

পরবর্তী পর্যায়ে থ্রাস্ট, ফুয়েল এফিশিয়েন্সি এবং থার্মাল লোড সংক্রান্ত আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য বিস্তৃত পরীক্ষা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি ডিউরেবিলিটি টেস্টিংয়ের মাধ্যমে ডিটোনেশন কমবাসশনের কারণে তৈরি হওয়া ফ্যাটিগ এবং স্ট্রাকচারাল স্ট্রেস বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যাটেরিয়ালস রিসার্চ, বিশেষ করে উন্নত কোটিং এবং কুলিং প্রযুক্তি, এই ইঞ্জিনের ভবিষ্যৎ সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হতে পারে। পাশাপাশি সিমুলেশন, হার্ডওয়্যার-ইন-দ্য-লুপ টেস্টিং এবং সিস্টেম-লেভেল ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে টেস্ট রিগ থেকে বাস্তব ফ্লাইট এনভায়রনমেন্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।

ভারতের প্রপালশন প্রযুক্তির এই অগ্রগতি শুধু একটি নতুন ইঞ্জিন তৈরির বিষয় নয়। ছোট টার্বোজেট থেকে শুরু করে ৫ কিলোনিউটন শ্রেণির রোটেটিং ডিটোনেশন ইঞ্জিন পর্যন্ত একাধিক স্তরে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে ক্রুজ মিসাইল, জেটচালিত লয়টারিং মিউনিশন, উচ্চ-উচ্চতার ড্রোন এবং অন্যান্য অ্যাডভান্সড প্ল্যাটফর্মের নকশায় তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে পরীক্ষাগার ও টেস্ট রিগের সাফল্যকে অপারেশনাল সক্ষমতায় রূপ দিতে এখনও উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত পরীক্ষা ও উন্নয়ন প্রয়োজন।

Advertisements