একসময় হাতে ছিল অস্ত্র, জীবন কাটত সংঘাতের আবহে। আজ সেই মহিলারাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাঁটছেন মডেলিং র্যাম্পে। ছত্তীসগঢ়ের বস্তারের প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীদের (Maoist Rehabilitation) জীবনে এই পরিবর্তনের ছবি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
জাতীয় হ্যান্ডলুম দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রায়পুরে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীরা ঐতিহ্যবাহী ছত্তীসগঢ়ি হ্যান্ডলুমের পোশাক পরে র্যাম্পে হাঁটেন। তাঁদের পরনে ছিল সুন্দর কোসা সিল্ক এবং হাতে বোনা বিভিন্ন পোশাক। পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় অডিটোরিয়ামে তাঁদের উপস্থিতি দর্শকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পায়।
এই অনুষ্ঠানকে শুধুমাত্র ফ্যাশন শো হিসেবে দেখছেন না আয়োজকেরা। বরং সংঘাতের জীবন পিছনে ফেলে মূলস্রোতের সমাজে ফিরে আসা মহিলাদের পুনর্বাসন, ক্ষমতায়ন এবং নতুন জীবনের প্রতীক হিসেবেই এই আয়োজন সামনে এসেছে।
মাওবাদী জীবন থেকে নতুন পরিচয়
মাওবাদী শব্দটি শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে গভীর জঙ্গলে বসবাসকারী সশস্ত্র বিদ্রোহীদের ছবি। মূলস্রোত থেকে দূরে, সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে তাঁদের জীবন কাটে।
কিন্তু আত্মসমর্পণের পর অনেক প্রাক্তন মাওবাদীর জীবন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। তাঁদের কেউ নতুন পেশায় যুক্ত হয়েছেন, কেউ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছেন, আবার কেউ সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করেছেন। বস্তারের এই প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীদের র্যাম্পে হাঁটার ঘটনাও সেই পরিবর্তনেরই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
কোসা সিল্কে আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ
জাতীয় হ্যান্ডলুম দিবসের অনুষ্ঠানে মহিলারা ছত্তীসগঢ়ের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পকে সামনে তুলে ধরেন। তাঁদের পরনে ছিল কোসা সিল্ক এবং বিভিন্ন হাতে বোনা পোশাক। র্যাম্পে তাঁদের আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি দর্শকদের নজর কেড়ে নেয়। অনুষ্ঠানটি একইসঙ্গে ছত্তীসগঢ়ের সমৃদ্ধ বস্ত্র ঐতিহ্যকেও তুলে ধরেছে। ছত্তীসগঢ়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই-ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের নতুন জীবনের জন্য শুভেচ্ছা জানান।
শুধু ফ্যাশন শো নয়, নতুন শুরুর বার্তা
এই র্যাম্প ওয়াকের তাৎপর্য ফ্যাশনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বড়। সংঘাত ও বিদ্রোহের জীবন থেকে বেরিয়ে এসে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসা মহিলাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে, সেই বার্তাই সামনে এসেছে অনুষ্ঠানে।
প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীদের আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি দেখিয়েছে, পুনর্বাসনের পর একজন মানুষ চাইলে সম্পূর্ণ নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারেন। তাঁদের অনেকেই বর্তমানে নতুন পেশা তৈরি করছেন এবং সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। একসময় যে সুযোগগুলি তাঁদের জীবনের নাগালের বাইরে ছিল, এখন সেগুলিই তাঁদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
একসময় সংঘাতের জীবন, আজ র্যাম্পে আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ! বস্তারের এই বদলের গল্পটি দেখুন।https://t.co/bI2R9NYmpO#Bastar #MaoistRehabilitation #NationalHandloomDay #Chhattisgarh pic.twitter.com/xtpZiDkOxk
— Kolkata24x7 (@kolkata24x7live) August 13, 2026
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিও
অনুষ্ঠানের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীদের পরিবর্তনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
এক্স-এ এক ব্যবহারকারী ঘটনাটিকে ‘অবিশ্বাস্য দৃশ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, কয়েক বছর আগে এমন দৃশ্য কল্পনা করাও কঠিন ছিল এবং এটিই ক্ষমতায়নের প্রকৃত উদাহরণ।
অন্য এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ঘটনা সত্যি হলে এর সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। একইসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই ধরনের গল্প আরও বেশি মানুষের সামনে কেন আসে না।
আরেকজন এই পরিবর্তনকে ‘অসাধারণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কাছে মাওবাদী বিদ্রোহের জীবন থেকে র্যাম্পে হাঁটার এই যাত্রা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মূলস্রোতে ফেরার নতুন ছবি
সোশ্যাল মিডিয়ার আরও কয়েকজন ব্যবহারকারী মনে করিয়ে দিয়েছেন, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেক মহিলা এমন এলাকা থেকে এসেছেন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী চরমপন্থার প্রভাব ছিল।
সেই প্রেক্ষাপটে তাঁদের আজকের এই উপস্থিতিকে শুধু ব্যক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না অনেকে। বরং এটি মূলস্রোতের সমাজে ফিরে আসার পর তৈরি হওয়া নতুন সুযোগের একটি প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বস্তারের প্রাক্তন মহিলা মাওবাদীদের র্যাম্পে হাঁটার সেই মুহূর্ত তাই একটি সাধারণ ফ্যাশন অনুষ্ঠানের ছবি হয়ে থাকেনি। সংঘাতের অতীত থেকে বেরিয়ে নতুন জীবন, নতুন পরিচয় এবং নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি গল্প হিসেবেই তা মানুষের নজর কেড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলি সেই পরিবর্তনের কথাই আরও একবার সামনে এনেছে।
