RBI Loan Rules: দিনের মধ্যে বারবার ফোন করে হেনস্থা করা, ঋণের বকেয়া নিয়ে হুমকি দেওয়া, পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীদের কাছে ঋণের তথ্য প্রকাশ করা, এমনকি বিয়ে বা চিকিৎসার মতো ব্যক্তিগত জরুরি পরিস্থিতিতেও বাড়িতে হাজির হয়ে যাওয়া, ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ঋণদাতা সংস্থা এবং তাদের নিয়োগ করা রিকভারি এজেন্টদের জন্য আরও বিস্তারিত নিয়ম কার্যকর হবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা আরবিআই ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশিকা চূড়ান্ত করেছে। সেখানে হুমকি, অপমানজনক আচরণ, গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে ঋণের বকেয়া প্রকাশের মতো একাধিক পদ্ধতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নতুন নিয়মের আওতায় পড়বে আরবিআই নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ও স্মল ফাইন্যান্স ব্যাংক, আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক, সমবায় ব্যাংক, নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানি বা এনবিএফসি এবং হাউজিং ফাইন্যান্স কোম্পানি।
ঋণগ্রহীতা ঋণের কিস্তি বা বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর সাধারণত ব্যাংক বা আর্থিক সংস্থা রিকভারি এজেন্টের মাধ্যমে টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু করে। নতুন নিয়মে শুধু এজেন্টের আচরণ নয়, তাদের কাজের জন্য ঋণদাতা সংস্থাকেও সরাসরি দায়বদ্ধ করা হয়েছে।
কখন রিকভারি এজেন্ট ফোন করতে পারবেন?
নতুন নিয়মে রিকভারি এজেন্টদের যোগাযোগের সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতার সঙ্গে ফোনে কথা বলা অথবা সরাসরি দেখা করতে যাওয়া যাবে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে। তবে গ্রাহক নিজে নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে যোগাযোগের অনুমতি দিলে সেই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকতে পারে।
রিকভারি এজেন্টকে সব সময় ভদ্র ও সভ্য আচরণ করতে হবে। গালিগালাজ, ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়া যাবে না। এমনকি গ্রাহকের পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের কাছেও তাঁর বকেয়া ঋণের তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। বিয়ে, পরিবারের কারও মৃত্যু বা চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থার মতো সংবেদনশীল ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতেও রিকভারি এজেন্টকে গ্রাহককে বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
বাড়িতে এলে কী কী পরিচয় দিতে হবে?
কোনও রিকভারি এজেন্ট গ্রাহকের বাড়ি বা কর্মস্থলে গেলে তাঁকে নিজের পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। সঙ্গে থাকতে হবে:
- অনুমোদনপত্র
- ঋণদাতা সংস্থার জারি করা নোটিশের কপি
- নিজের পরিচয়পত্র
অর্থাৎ, পরিচয় গোপন রেখে বা হঠাৎ করে এসে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা যাবে না।
প্রতিটি ফোন কল রেকর্ড করতে হবে
ব্যাংক ও অন্যান্য ঋণদাতাকে গ্রাহকের সঙ্গে করা প্রতিটি রিকভারি কল নথিভুক্ত করতে হবে। কথোপকথন রেকর্ড করা হচ্ছে, সে বিষয়েও গ্রাহককে জানাতে হবে। রিকভারি সংক্রান্ত ফোন কলের রেকর্ডিং অন্তত ছয় মাস সংরক্ষণ করতে হবে। এ ছাড়া গালিগালাজ, বেনামি বা হুমকিমূলক ফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের মতো ‘কঠোর পদ্ধতি’ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মোবাইল বা স্মার্ট ডিভাইসের ক্ষেত্রেও নতুন সুরক্ষা
মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপের মতো ডিভাইস ঋণের মাধ্যমে কেনা হলে বকেয়া আদায়ের জন্য দূর থেকে ডিভাইস লক করার বিষয়েও নতুন নিয়ম রয়েছে। ঋণ ৩০ দিন বকেয়া না হওয়া পর্যন্ত কোনও ধরনের রিমোট রেস্ট্রিকশন দেওয়া যাবে না। সম্পূর্ণ ধরনের বিধিনিষেধ, যার মধ্যে আউটগোয়িং কল বন্ধ করার মতো ব্যবস্থা রয়েছে, তা শুরু করা যাবে ৬০ দিন বকেয়া হওয়ার পর।
তবে ঋণদাতা চাইলেও ডিভাইসের সমস্ত জরুরি পরিষেবা বন্ধ করে দিতে পারবে না। গ্রাহকের কাছে ইনকামিং কল, এসএমএস এবং জরুরি এসওএস পরিষেবা চালু রাখতে হবে। এমন কোনও অ্যাপ বা পরিষেবাও বন্ধ করা যাবে না, যা গ্রাহকের সক্রিয় কাজ বা চাকরির জন্য প্রয়োজনীয়।
ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করতে পারবে না ঋণদাতা
ডিভাইস লক বা রিমোট রেস্ট্রিকশনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঋণদাতা বা তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার পরিষেবা প্রদানকারী গ্রাহকের ছবি, কনট্যাক্ট, লোকেশন হিস্ট্রি বা কল লগ-এর মতো ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার বা সংগ্রহ করতে পারবে না। ঋণগ্রহীতা বকেয়া টাকা পরিশোধ করে দিলে ঋণদাতাকে এক ঘণ্টার মধ্যে ডিভাইস আনলক করতে হবে।
ভুলভাবে ডিভাইস লক করা হলে বা টাকা পরিশোধের পর আনলক করতে দেরি হলে ঋণদাতাকে প্রতি ঘণ্টায় ২৫০ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা ঋণ হিসেবে দেওয়া মোট অর্থের সমান।
রিকভারি এজেন্টদের পেশাগত সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক
নতুন নিয়মে ঋণ আদায়ের কাজে নিযুক্ত এজেন্টদের জন্য পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশনের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। ঋণদাতাদের এমন রিকভারি এজেন্সি নিয়োগ করতে হবে, যাদের এজেন্টদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স বা আইআইবিএফ-এর পেশাগত সার্টিফিকেশন রয়েছে। বর্তমানে যেসব এজেন্টের এই সার্টিফিকেশন নেই, তাদের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রিত সংস্থার ক্ষেত্রে ১ জানুয়ারি ২০২৮ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ করার সুযোগ আরও স্পষ্ট
রিকভারি এজেন্ট নিয়ম ভাঙলে গ্রাহকের অভিযোগ জানানোর জন্য ঋণদাতাকে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখতে হবে। রিকভারি সংক্রান্ত যোগাযোগ এবং মূল ঋণচুক্তিতে গ্রিভিয়েন্স রিড্রেসাল অফিসারের নাম, ইমেল, ফোন নম্বর এবং অফিসের ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কোনও ব্যাংক বা আর্থিক সংস্থা রিকভারি প্রক্রিয়া তৃতীয় পক্ষের এজেন্সির হাতে তুলে দিয়ে দায় এড়াতে পারবে না। রিকভারি এজেন্টের আচরণের জন্য ঋণদাতাকেই সরাসরি দায়ী করা হবে।
এ ছাড়া প্রতিটি ঋণদাতার পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত নীতিতে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে নিয়মবহির্ভূত ঋণ আদায়ের কারণে ঋণগ্রহীতা বা জামিনদারের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়।
ফলে ২০২৭ সাল থেকে ঋণখেলাপি হলেও গ্রাহককে হেনস্থা, হুমকি বা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো পদ্ধতির মুখে পড়তে হলে তাঁর কাছে অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ চাওয়ারও নির্দিষ্ট ভিত্তি থাকবে।
