নয়াদিল্লি: ভারতে গাড়ি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে লোকালাইজেশন বা স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অটোমোবাইল সংস্থাগুলিকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিলেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল (Piyush Goyal)। বৃহস্পতিবার SIAM-এর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি কিছু গাড়ি নির্মাতাকে ‘ব্ল্যাক শিপ’ হিসেবে উল্লেখ করে নিজেদের ইন্ডিজেনাইজেশন বা স্থানীয়করণ কর্মসূচি নতুন করে পর্যালোচনা করার আহ্বান জানান।
মন্ত্রী অভিযোগ করেন, কিছু সংস্থা ভারতে নতুন কোম্পানি তৈরি করে সেটিকে স্থানীয় উৎপাদন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই সংস্থাগুলি নামমাত্র মূল্যে পণ্য আমদানি করে দেশে গাড়ি বিক্রি করছে বলে দাবি করেন তিনি।
আমদানি-রফতানির তথ্য নজরে রাখছে সরকার
পীযূষ গোয়াল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কোনও সংস্থা কতটা স্থানীয়করণ করেছে তা যাচাই করতে সরকার আমদানি ও রফতানির তথ্য খতিয়ে দেখছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি সংস্থার Import Export Code বা IEC নম্বরের তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এই তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনও সংস্থার আমদানি, রফতানি এবং স্থানীয় সরবরাহকারী ব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্কও যাচাই করা সম্ভব। কোনও সংস্থা নিজেদের উচ্চ মাত্রার লোকালাইজেশন দাবি করলেও সরকার সেই সংস্থা এবং তার সরবরাহকারী বা সাপ্লায়ার ইকোসিস্টেমের তথ্য মিলিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করতে পারে বলে জানান মন্ত্রী।
স্থানীয় উৎপাদন সম্ভব না হলে রফতানি বাড়ানোর পরামর্শ
যেসব ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট যন্ত্রাংশ বা উপাদান এখনও ভারতে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে বাড়তি রফতানির মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের পরামর্শ দিয়েছেন গোয়াল। তিনি বলেন, কোনও উপাদান স্থানীয়ভাবে তৈরি করা সম্ভব না হলে সংস্থাগুলিকে নিজেদের রফতানি আরও বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে সরকার প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
জাপানি সংস্থাগুলির উদাহরণ
ভারতে লোকালাইজেশনের ক্ষেত্রে জাপানি অটোমোবাইল সংস্থাগুলির উদাহরণ তুলে ধরেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, জাপানের গাড়ি সংস্থাগুলি ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব তৈরি করছে, স্থানীয় সাপ্লাই চেন বা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে এবং ধাপে ধাপে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াচ্ছে। এর ফলে ভারতে বিশ্বের অন্যতম দক্ষ এবং প্রতিযোগিতামূলক দামের গাড়ি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
মারুতি সুজুকির রফতানির প্রশংসা
ভারত থেকে যাত্রীবাহী গাড়ি রফতানির ক্ষেত্রে মারুতি সুজুকি ইন্ডিয়া-র প্রশংসা করেন পীযূষ গোয়াল। তিনি জানান, গত বছর ভারত থেকে যে বিপুল সংখ্যক যাত্রীবাহী গাড়ি রফতানি হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই মারুতি সুজুকির অবদান। মারুতি সুজুকি টানা পাঁচ বছর ধরে ভারতের যাত্রীবাহী গাড়ির শীর্ষ রফতানিকারক। সংস্থার গাড়ি বর্তমানে ইউরোপ ও জাপান-সহ ১২০টিরও বেশি দেশে যাচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে মারুতি সুজুকি ভারত থেকে ৪.৪৭ লাখ গাড়ি রফতানি করেছে। চলতি অর্থবর্ষের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে ভারতের মোট যাত্রীবাহী গাড়ি রফতানিতে সংস্থাটির অংশ ছিল ৫৫ শতাংশ। এই সময়ে ভারত থেকে রফতানি হওয়া শীর্ষ আটটি গাড়ির মধ্যে ছয়টিই ছিল মারুতি সুজুকির।
শুধু ভারতের বাজার নয়, নজর দিতে হবে বিশ্বে
ভারতের বাড়তে থাকা বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার এবং বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য অটোমোবাইল শিল্পকে আহ্বান জানিয়েছেন গোয়াল। তাঁর মতে, ভারতীয় গাড়ি সংস্থাগুলিকে শুধু দেশের বাজারের জন্য উৎপাদন করলে চলবে না। তাদের ‘থিঙ্ক গ্লোবালি’ করতে হবে। ভারতে আরও বেশি আন্তর্জাতিক গাড়ি সংস্থা আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তাই ভারতের বৃহৎ উৎপাদন ক্ষমতা এবং অর্থনীতির পরিসরকে কাজে লাগিয়ে গোটা বিশ্বের বাজারে সরবরাহ করার মতো সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
বিশ্বমানের গাড়ি তৈরি করার বার্তা
ভারতে তৈরি পণ্যের গুণমান আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম হওয়া উচিত নয় বলেও সতর্ক করেছেন মন্ত্রী। কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় ডিজাইন আন্তর্জাতিক মডেলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় গাড়ি রফতানি করা হয়নি বলে যে রিপোর্ট রয়েছে, তার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতে তৈরি পণ্যকে বিশ্বমানের মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
অর্থাৎ, ভারতের বাজারের জন্য এক ধরনের এবং আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য অন্য মানের গাড়ি তৈরি না করে দেশীয় উৎপাদন থেকেই বিশ্ববাজারের উপযোগী পণ্য তৈরি করার উপর জোর দিয়েছেন তিনি।
আগামী দিনে উৎপাদন আরও ভারতে সরতে পারে
বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন গোয়াল। উন্নত দেশগুলিতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক চাপ, তরুণ কর্মীর ঘাটতি, দক্ষ প্রতিভার অভাব এবং পর্যাপ্ত শিল্প পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে ভবিষ্যতে উৎপাদনের একটি বড় অংশ উন্নত দেশ থেকে অন্য দেশে সরে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। যেসব সংস্থা এই পরিবর্তন আগে থেকে বুঝে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেবে, তারা লাভবান হবে। আর যারা বর্তমান ব্যবসা ও বাজারের স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে থেকে যাবে, তারা পিছিয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন মন্ত্রী।
অটোমোবাইল শিল্পই হবে ভারতের বৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি
পীযূষ গোয়ালের মতে, আগামী বছরগুলিতে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হবে অটোমোবাইল শিল্প। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন এবং রফতানি বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছেন তিনি। তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম পাঁচ মাসে ভারতের মাসিক রফতানি প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার হারে এগোচ্ছে। বহু বছর পর পণ্য রফতানির বৃদ্ধির হার পরিষেবা রফতানির তুলনায় দ্রুত হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ১ ট্রিলিয়ন ডলার রফতানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে আগামী সাত মাসে আরও প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের রফতানি প্রয়োজন। সেই লক্ষ্য পূরণে মাসিক রফতানির গতি প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
AI-তে বদলাবে কাজের ধরন, বাড়বে কর্মসংস্থান
অটোমোবাইল শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষেও সওয়াল করেছেন গোয়াল। তাঁর মতে, AI শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে, উৎপাদন দক্ষতা উন্নত করতে এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে গ্রাহক পরিষেবাতেও পরিবর্তন আনবে। AI-এর কারণে কিছু কাজের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্য, চাকরির ভূমিকা বদলাবে, কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়বে। তিনি গাড়ি সংস্থাগুলিকে আরও সক্রিয়ভাবে বিদেশি বাজারে প্রবেশের পরামর্শ দিয়েছেন এবং সম্ভাবনা রয়েছে যে রফতানি প্রতি দুই বছরে দ্বিগুণ হতে পারে।
‘চার M’-এর উপর জোর
পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিবেশে বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারতের ‘চার M’ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন গোয়াল। এই চারটি হল:
- Molecules
- Modules
- Megawatts
- Markets
Molecules
এখানে তিনি বিরল মাটি বা Rare Earths, ম্যাগনেট এবং Critical Mineral Mission-এর কথা উল্লেখ করেন। বিভিন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে বা FTA-তে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান। বিশেষ খনিজের জন্য সমুদ্র অনুসন্ধান এবং আমেরিকার সঙ্গে Pax Silica উদ্যোগে ভারতের অংশগ্রহণের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
Modules
যেসব যন্ত্রাংশ এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, সেগুলি ভারতে তৈরি করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে অটোমোবাইল সংস্থাগুলিকে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমেও এই স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
Megawatts
ভারতকে শক্তির ক্ষেত্রে আরও আত্মনির্ভর হতে হবে বলে জানান মন্ত্রী। দেশীয় শক্তির উৎস বাড়ানোর পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল, LPG এবং LNG-এর ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। ব্যাটারি-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি দেশে তৈরি করা অথবা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ভারতে নিয়ে আসার উপরও জোর দিয়েছেন।
অটো ও যন্ত্রাংশ শিল্পে বড় প্রকল্পে সরকারি সহায়তা
বড় অটোমোবাইল ও অটো-কম্পোনেন্ট প্রকল্পকে জমি এবং প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে অবকাঠামোর মাধ্যমে সহায়তা করার প্রস্তাবও দিয়েছেন পীযূষ গোয়াল। তিনি শিল্প সংস্থাগুলিকে এই ধরনের উৎপাদন ইকোসিস্টেম তৈরির জন্য উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করতে আহ্বান জানান। শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দেশভিত্তিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরিতেও সরকার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তিনি।
কেন্দ্রের বার্তা স্পষ্ট: ভারতের অটোমোবাইল শিল্পকে শুধু দেশীয় বাজারের জন্য উৎপাদনকারী হিসেবে নয়, বিশ্বের জন্য গাড়ি ও অটো-কম্পোনেন্ট তৈরি করা একটি প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, রফতানি বৃদ্ধি এবং বিশ্বমানের পণ্য তৈরিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
