লন্ডন: স্বয়ংক্রিয় গাড়ির বাণিজ্যিক পরিষেবার ক্ষেত্রে ইউরোপে বড় পদক্ষেপ করল উবার (Uber)। প্রতিদ্বন্দ্বী Waymo-র আগেই লন্ডনে যাত্রীদের জন্য রোবোট্যাক্সি পরিষেবা চালু করেছে উবার। ব্রিটিশ স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং সংস্থা Wayve-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে এই পরিষেবা শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে পরিষেবাটি সীমিত থাকবে। বর্তমানে প্রায় ১৫টি Ford Mustang Mach-E বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে পরিষেবা শুরু হয়েছে। প্রতিটি গাড়িতেই প্রশিক্ষিত সেফটি ড্রাইভার থাকবেন। প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত বিষয়ে যথেষ্ট আস্থা তৈরি হলে ভবিষ্যতে এই মানবচালকের প্রয়োজন ধীরে ধীরে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কীভাবে রোবোট্যাক্সি বুক করবেন?
লন্ডনের উবার ব্যবহারকারীরা অ্যাপের মাধ্যমে জানাতে পারবেন যে তাঁরা স্বয়ংক্রিয় গাড়িতে যাত্রা করতে আগ্রহী। যোগ্য ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু UberX, Uber Comfort এবং Uber Electric রাইডের জন্য Wayve-এর স্বয়ংক্রিয় গাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করা হতে পারে। তবে আপাতত কোনও নির্দিষ্ট যাত্রার জন্য আলাদা করে রোবোট্যাক্সি রিজার্ভ করার সুযোগ থাকছে না।
প্রাথমিক পর্যায়ে গাড়ির সংখ্যা মাত্র ১৫টি হওয়ায় পরিষেবাটির ব্যবহারও সীমিত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। কোনও যাত্রী Wayve-এর গাড়িতে যেতে না চাইলে যাত্রা শুরুর আগে সেই বিকল্প প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ উবার গাড়ির অনুরোধ করতে পারবেন। এই প্রাথমিক পর্যায়ে Wayve-এর গাড়ি বেছে নিলে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হবে না।

গাড়িতে কি এখনও মানবচালক থাকবেন?
হ্যাঁ। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি গাড়ির সামনের আসনে প্রশিক্ষিত সেফটি ড্রাইভার থাকবেন। প্রয়োজন হলে তিনি গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন। এই চালকদের লন্ডনের পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা TfL-এর অনুমোদন রয়েছে। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় তাঁরা গাড়ি চালাবেন না। উবারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের মূল কাজ হবে স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করা।
প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার উপর পর্যাপ্ত আস্থা তৈরি হলে সেফটি ড্রাইভারকে ধীরে ধীরে সরিয়ে সম্পূর্ণ চালকবিহীন পরিষেবায় যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমান পরিষেবাকে এখনও আমেরিকা বা চিনের কিছু অঞ্চলে চালু থাকা সম্পূর্ণ চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি পরিষেবার সমতুল্য বলা যাবে না।
LiDAR ছাড়াই Wayve-এর স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং
Wayve-এর প্রযুক্তির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হল এটি প্রচলিত রোবোট্যাক্সি সংস্থাগুলির মতো LiDAR ব্যবহার করে না। LiDAR হল আলো-ভিত্তিক একটি সেন্সিং প্রযুক্তি, যা Waymo-সহ অনেক স্বয়ংক্রিয় গাড়ি সংস্থা ব্যবহার করে। তার বদলে Wayve মূলত ক্যামেরা এবং রাডার-ভিত্তিক সেন্সিং ব্যবহার করে AI-এর মাধ্যমে গাড়িকে চারপাশের পরিবেশ বুঝতে সাহায্য করে।
Wayve-এর এই প্রযুক্তির নাম AV2.0। সংস্থার দাবি, এই সিস্টেম রাস্তার পরিস্থিতি বুঝতে, সম্ভাব্য ঝুঁকি অনুমান করতে এবং আগে থেকে ম্যাপ করা হয়নি এমন পরিস্থিতিতেও গাড়ি চালাতে সক্ষম। এর ফলে অত্যন্ত ব্যয়বহুল সেন্সর এবং ঘন HD ম্যাপের উপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে Wayve-এর দাবি। ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি পরিষেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
লন্ডনে কি রোবোট্যাক্সি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ?
এখানেও Wayve-এর পদ্ধতি কিছুটা আলাদা। অনেক রোবোট্যাক্সি পরিষেবা নির্দিষ্ট জিওফেন্সড এলাকায় পরিচালিত হয়। অর্থাৎ আগে থেকে ম্যাপ করা এবং পরীক্ষিত নির্দিষ্ট রাস্তা বা অঞ্চলের বাইরে গাড়িকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে দেওয়া হয় না।
Wayve-এর দাবি, তাদের প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত রাস্তা ও পরিস্থিতিতে কাজ করতে সক্ষম। তাই লন্ডনের অধিকাংশ এলাকায় স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালানোর লক্ষ্য রয়েছে, যদিও বিমানবন্দর এই পরিকল্পনার বাইরে রাখা হয়েছে। লন্ডনের রাস্তার পরিস্থিতি এই প্রযুক্তির জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে। সরু রাস্তা, সাইকেল আরোহী, পথচারী, বাস, মোটরসাইকেল, রাস্তার নকশায় পরিবর্তন এবং প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া ট্রাফিক পরিস্থিতির কারণে শহরটির ড্রাইভিং পরিবেশ বেশ জটিল।
উবারের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ লন্ডন?
উবারের স্বয়ংক্রিয় গাড়ি পরিকল্পনায় লন্ডনের এই পরিষেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গত কয়েক বছর ধরে Wayve-এর সঙ্গে উবারের অংশীদারিত্ব রয়েছে। উবারের কৌশল হল নিজস্ব সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় গাড়ি প্রযুক্তি তৈরি করার পরিবর্তে একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি সংস্থাকে নিজেদের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা। এর ফলে একই উবার প্ল্যাটফর্মে ভবিষ্যতে মানবচালিত এবং স্বয়ংক্রিয়, দুই ধরনের গাড়ি পরিচালনা করার সুযোগ তৈরি হবে।
Wayve-এর জন্যও বড় পরীক্ষা
২০১৭ সালে কেমব্রিজে প্রতিষ্ঠিত Wayve মূলত স্বয়ংক্রিয় গাড়ির জন্য AI প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। সংস্থাটি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন অটোমোবাইল ও প্রযুক্তি সংস্থার কাছ থেকে বড় বিনিয়োগ পেয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে Wayve ১.২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। উবার ও Nvidia-র পাশাপাশি Stellantis, Nissan এবং Mercedes-Benz-সহ নতুন বিনিয়োগকারীরাও এতে অংশ নেয়। লন্ডনে সাধারণ মানুষের সামনে প্রযুক্তিটি চালু হওয়া Wayve-এর জন্য তাই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
Waymo-র সঙ্গে উবারের প্রতিযোগিতা
লন্ডনে উবারের পরিষেবা Waymo-র পরিকল্পিত প্রবেশের ঠিক আগে শুরু হয়েছে। Waymo ইতিমধ্যেই শহরে চালকবিহীন রাইড-হেলিং পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা জানিয়েছে এবং ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চালকবিহীন পরিষেবা চালুর লক্ষ্য রয়েছে। তবে দু’টি সংস্থার মডেলে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উবারের বর্তমান Wayve পরিষেবায় সেফটি ড্রাইভার থাকছেন। Waymo-র পরিকল্পিত পরিষেবা শুরু থেকেই সম্পূর্ণ চালকবিহীন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
আবার অন্যদিকে আমেরিকার কিছু শহরে উবার ও Waymo একসঙ্গে কাজও করছে। ফলে স্বয়ংক্রিয় পরিবহন ব্যবস্থায় তারা একই সঙ্গে অংশীদার এবং প্রতিযোগী। উবার ভবিষ্যতে মানবচালিত ও স্বয়ংক্রিয় গাড়িকে একই প্ল্যাটফর্মে পরিচালনার একটি মিশ্র বা হাইব্রিড মডেলের দিকে এগোচ্ছে।
লন্ডনে আরও সংস্থার নজর
রোবোট্যাক্সির জন্য লন্ডন ক্রমশ ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠছে। Waymo-র পাশাপাশি চিনা রোবোট্যাক্সি সংস্থা Baidu-ও লন্ডনে উপস্থিতি তৈরি করেছে। ২০২১ সালের অক্টোবরে Baidu লন্ডনে তাদের হাব স্থাপন করে এবং সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক Lyft-এর সঙ্গে রোবোট্যাক্সি পরিষেবা তৈরি ও বাণিজ্যিকীকরণের জন্য অংশীদারিত্ব করে। প্রাথমিক পরিষেবা লন্ডনের Brent এলাকা ঘিরে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আগে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ফলে আগামী দিনে লন্ডনের রাস্তায় ভিন্ন প্রযুক্তির একাধিক স্বয়ংক্রিয় পরিবহন পরিষেবা দেখা যেতে পারে।
মাত্র ১৫টি গাড়ি, কিন্তু বড় পরীক্ষা
প্রাথমিক পর্যায়ে উবার ও Wayve-এর পরিষেবা মাত্র প্রায় ১৫টি গাড়ি দিয়ে শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটির গুরুত্ব গাড়ির সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি। লন্ডনের জটিল রাস্তায় গাড়িগুলি কীভাবে কাজ করছে, যাত্রীরা কীভাবে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে AI কতটা নির্ভরযোগ্য, সেই তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে।
উবার ইতিমধ্যেই Zoox, Avride, Nuro, Motional, Waabi এবং Waymo-সহ একাধিক স্বয়ংক্রিয় গাড়ি সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে। ফলে ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় রাইড-হেলিংয়ে উবারের বিনিয়োগ ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা রয়েছে।
লন্ডন একই সঙ্গে Wayve-এর প্রযুক্তিরও বড় পরীক্ষা। LiDAR ও প্রচলিত HD ম্যাপ ছাড়া ক্যামেরা এবং রাডার-নির্ভর AI দিয়ে কতটা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালানো যায়, এবার বাস্তব শহুরে পরিবেশে তারই পরীক্ষা হবে।
রোবোট্যাক্সি পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে লন্ডনের দৈনন্দিন পরিবহনের অংশ হয়ে উঠতে কতটা সময় নেয়, উবার-ওয়েভের এই পরিষেবা সেই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিতে পারে।
