দেশজুড়ে ব্যাংকিং পরিষেবা ফের ব্যাহত হতে পারে। পাঁচ দিনের ব্যাংকিং সপ্তাহ চালু করা-সহ একাধিক দাবিতে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের (Bank Strike) ডাক দিয়েছে ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাংক ইউনিয়ন্স (UFBU)। কর্মীদের আরও কয়েকটি দাবি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মতবিরোধের জেরেই এই কর্মসূচি বলে জানিয়েছে ব্যাংক ইউনিয়নগুলির যৌথ মঞ্চ।
UFBU-র আওতায় রয়েছে দেশের প্রধান ব্যাংক কর্মী ও অফিসার সংগঠনগুলি। এর মধ্যে রয়েছে অল ইন্ডিয়া ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন (AIBEA), অল ইন্ডিয়া ব্যাংক অফিসার্স কনফেডারেশন (AIBOC), ন্যাশনাল কনফেডারেশন অব ব্যাংক এমপ্লয়িজ (NCBE), অল ইন্ডিয়া ব্যাংক অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (AIBOA), ব্যাংক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (BEFI), ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ব্যাংক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন (INBEF) এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ব্যাংক অফিসার্স কংগ্রেস (INBOC)।
পাঁচ দিনের ব্যাংকিং সপ্তাহের দাবি
ব্যাংক ইউনিয়নগুলির অন্যতম প্রধান দাবি হল সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যাংক খোলা রাখা। অর্থাৎ শনিবার ও রবিবার ছুটি দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানানো হয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে UFBU জানিয়েছে, ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের তরফে সপ্তাহের অন্যান্য কর্মদিবসে অতিরিক্ত কাজের সময় সামঞ্জস্য করার একটি প্রস্তাব ২০২৪ সালে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাব এখনও সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে অভিযোগ ইউনিয়নের। UFBU-র বক্তব্য, পাঁচ দিনের ব্যাংকিং সপ্তাহ চালুর বিষয়টি ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এবং ইন্ডিয়ান ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশন (IBA)-এর আলোচনার মাধ্যমে এগোলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
PLI নিয়েও ক্ষোভ
পাঁচ দিনের সপ্তাহের পাশাপাশি পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেনটিভ বা PLI ব্যবস্থা নিয়েও ব্যাংক ইউনিয়নগুলির আপত্তি রয়েছে। UFBU-র দাবি, ২০২০ সালে এমন একটি চুক্তি হয়েছিল যেখানে ব্যাংকের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে কর্মীদের জন্য অভিন্ন ইনসেনটিভ দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা ছিল। ব্যাংকের লাভের উপর নির্ভর করে এই ইনসেনটিভ পাঁচ দিনের বেতন থেকে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের বেতন পর্যন্ত হতে পারত।
কিন্তু ইউনিয়নের অভিযোগ, সেই ব্যবস্থার পরিবর্তে সরকার এমন একটি সংশোধিত PLI কাঠামো এনেছে, যেখানে ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কর্মীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হতে পারে বলে দাবি করেছে UFBU। ইউনিয়নগুলি চাইছে, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বদলে ব্যাংকের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের সঙ্গে PLI যুক্ত করা হোক। পাশাপাশি Scale VII পর্যন্ত কর্মী ও অফিসারদের জন্য PLI-র দিনসংখ্যা অভিন্ন রাখার দাবিও রয়েছে।
১১ সেপ্টেম্বরের পর আরও বড় ধর্মঘট
UFBU জানিয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বরের ধর্মঘট একক কর্মসূচি নয়, বরং ধারাবাহিক দেশব্যাপী ধর্মঘটের প্রথম ধাপ। দাবিগুলি সমাধান না হলে পরবর্তী সময়ে ২৮, ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর তিন দিনের দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। এরপরও সমস্যার সমাধান না হলে ২৬ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশব্যাপী ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ব্যাংক ইউনিয়নগুলি। ফলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর জুড়ে ব্যাংক পরিষেবায় একাধিকবার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
PLI নিয়ে কেন্দ্রের নতুন সিদ্ধান্ত
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ আধিকারিকদের PLI নিয়ে কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য সরকারি ব্যাংকের Scale IV থেকে VIII স্তরের আধিকারিকদের পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেনটিভের অর্থপ্রদান আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
ডিপার্টমেন্ট অব ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস (DFS) একটি চিঠিতে জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই স্তরের আধিকারিকদের PLI প্রদান করা হবে না। বিষয়টি বর্তমানে চলা ১৩তম বাইপার্টাইট সেটেলমেন্ট এবং ১০ম জয়েন্ট নোটের আলোচনায় তোলা হবে। এই আলোচনায় সরকারি ব্যাংকের কর্মী ও অফিসারদের ভবিষ্যৎ বেতন সংশোধন এবং চাকরির বিভিন্ন শর্ত নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত পাঁচ দিনের ব্যাংকিং সপ্তাহের দাবির কোনও সমাধান করছে না বলে জানিয়েছে UFBU।
ধর্মঘটে কী হতে পারে?
১১ সেপ্টেম্বর ধর্মঘট সফল হলে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের শাখায় স্বাভাবিক পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শাখা খোলা, কাউন্টার পরিষেবা, নগদ লেনদেন এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যাংকিং কাজে প্রভাব পড়তে পারে। তবে অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ইউপিআই এবং এটিএম পরিষেবা ধর্মঘটের কারণে সরাসরি বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। পরিষেবার উপর বাস্তব প্রভাব ব্যাংকভেদে নির্ভর করতে পারে।
পাঁচ দিনের ব্যাংকিং সপ্তাহ এবং PLI কাঠামো নিয়ে ব্যাংক ইউনিয়ন ও কেন্দ্রের মধ্যে টানাপোড়েন এখন আরও বাড়ছে। ১১ সেপ্টেম্বরের ধর্মঘটের পর আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়, নাকি সেপ্টেম্বরের শেষের তিন দিনের ধর্মঘট এবং অক্টোবরের অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি বাস্তবে গড়ায়, সেটাই এখন নজরে।
