বিশ্বায়িত বাজারে চাহিদা ও জোগানের উপরই চিনির দাম (Sugar Price) নির্ভর করে। তাই সরকার চাইলেও কৃষিপণ্যের দাম সরাসরি নির্ধারণ করতে পারে না। মঙ্গলবার এমনই মন্তব্য করলেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গডকরি। ন্যাশনাল ফেডারেশন অব কো-অপারেটিভ সুগার ফ্যাক্টরিজ বা এনএফসিএসএফ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে রাজ্যের মন্ত্রী এবং চিনি শিল্পের প্রতিনিধিদের তরফে চিনির ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা এমএসপি বাড়ানোর দাবি ওঠার পর এই মন্তব্য করেন তিনি।
গডকরির এই মন্তব্য এমন সময়ে সামনে এল, যখন সাম্প্রতিক সময়ে দেশে খুচরো চিনির দাম প্রতি কেজিতে ৭০ টাকারও বেশি হয়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। সরবরাহ কমে যাওয়াকে সেই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বাজারের তথ্য অনুযায়ী, চিনির দাম কিছুটা কমার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে এবং মিল পর্যায়ের দামে পতন হয়েছে।
‘বিশ্ববাজারের চাহিদা-জোগানেই দাম ঠিক হয়’
গডকরি বলেন, বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কোনও একটি দেশের সরকার নিজের মতো করে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করলেই তা বাজারে কার্যকর হবে না। তিনি উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিল, আমেরিকা এবং মালয়েশিয়ার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রাজিলের চিনি উৎপাদনের পরিস্থিতি ভারতের বাজারেও প্রভাব ফেলে। একইভাবে আমেরিকার ভুট্টা এবং মালয়েশিয়ার পাম অয়েলের বাজারের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক দামের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। গডকরির বক্তব্য, বিশ্ববাজারে কোথাও কোনও পণ্যের অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হলে তার প্রভাব অন্য দেশগুলির বাজারেও পড়তে পারে। ফলে ভারতের ক্ষেত্রেও চিনির দাম শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে না।
ব্রাজিলের উৎপাদন খরচের উদাহরণ
চিনির বাজারে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি বোঝাতে ব্রাজিলের উদাহরণ দেন গডকরি। তাঁর দাবি, ব্রাজিলে একটি কৃষিজমির আয়তন অনেক বড় এবং সেখানে কৃষিকাজ অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়। গডকরির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ব্রাজিলে চিনি উৎপাদনের খরচ প্রায় প্রতি কেজিতে ২৩ টাকা। অন্যদিকে ভারতে উৎপাদন খরচ অন্তত প্রতি কেজিতে ৩৩ থেকে ৩৪ টাকা।
তিনি বলেন, ব্রাজিলে যদি অতিরিক্ত চিনি উৎপাদন হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তার সরবরাহ বেড়ে যায়, তাহলে দামের উপর চাপ তৈরি হতে পারে। সেই প্রভাব ভারতের বাজারেও পড়তে পারে। এই উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝাতে চান, ভারতের কৃষকদের উৎপাদন খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। ফলে শুধু সরকারি দামে হস্তক্ষেপ করে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা কঠিন।
‘কৃষি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়া দরকার’
গডকরি কৃষকদের আয় এবং কৃষির অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, তিনি এমন একটি অঞ্চল থেকে এসেছেন যেখানে কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। গত ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এই সমস্যার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর মতে, সমস্যার মূল জায়গা হল কৃষিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলা। তিনি শুধু চিনির উপর নির্ভর না করে চিনি শিল্পকে আরও বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
বিশেষ করে আখের খড়, বায়োমাস এবং অন্যান্য উপজাতকে ব্যবহার করে অতিরিক্ত মূল্য তৈরি করার উপর জোর দেন তিনি। জৈব সার তৈরির পাশাপাশি শিল্পের উপজাতকে শক্তি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে কৃষক এবং চিনি কারখানাগুলির আয় বাড়ানো সম্ভব বলে তাঁর বক্তব্য। সাম্প্রতিক সময়ে চিনি শিল্পেও চিনির পাশাপাশি ইথানল, কমপ্রেসড বায়োগ্যাস বা সিবিজি এবং অন্যান্য বায়ো-এনার্জি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
নতুন আখের জাত তৈরিতে উদ্যোগ
এনএফসিএসএফ, ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো-এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বা আইএসএমএ এবং কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রক মিলে কোয়েম্বাটোরে একটি ‘গ্লোবাল সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর অ্যাক্সেলারেটেড সুগারকেন ব্রিডিং’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এই কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য হল দেশের জন্য নতুন এবং উন্নত আখের জাত তৈরি করা। বেশি ফলন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং রোগ-পোকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলিতে গবেষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর আখ চাষ, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে চিনি শিল্পের খরচ কমানোর দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
২৬০টি চিনি মিলের প্রতিনিধিত্ব করে এনএফসিএসএফ
ন্যাশনাল ফেডারেশন অব কো-অপারেটিভ সুগার ফ্যাক্টরিজ দেশের সমবায় চিনি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। এটি প্রায় ২৬০টি চিনি মিল এবং ৯টি রাজ্য সমবায় চিনি ফেডারেশনকে প্রতিনিধিত্ব করে। অনুষ্ঠানে সমবায় চিনি কারখানাগুলিকে জাতীয় দক্ষতা পুরস্কারও দেওয়া হয়।
গডকরির বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, শুধু চিনির উৎপাদন এবং তার দামের উপর নির্ভর করলে ভারতীয় চিনি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা, উৎপাদন খরচ, কৃষকের আয় এবং শিল্পের উপজাত থেকে অতিরিক্ত মূল্য তৈরির বিষয়গুলিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষিকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করে তুলতে প্রযুক্তি, বৈচিত্র্য এবং মূল্য সংযোজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories — On Kolkata24x7 Business.
