নয়াদিল্লি: নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা SIR নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) পদত্যাগের দাবি তুলল ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ঘোষণা করেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু করবে তাঁদের দল।
এই ঘোষণার আগে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি নথিভুক্ত করেছিলেন। ভোটার তালিকায় নাম যোগ করা, নাম বাদ দেওয়া, ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন এবং ভোটার ডেটাবেস ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁদের আপত্তি ছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ CJP-এর?
সাংবাদিক বৈঠকে অভিজিৎ দীপকে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, SIR-এর মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দীপকে দাবি করেন, SIR-এর আওতায় ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এটি CJP-র উত্থাপিত দাবি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়ার কথা বলা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, এর মধ্যে কতগুলি নাম প্রকৃতপক্ষে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল এবং কতগুলি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
আরও পড়ুন: কোথাও কেউ নিরাপদ নয়: আধুনিক যুদ্ধ নিয়ে চরম সতর্কবার্তা সিডিএস সুব্রামণির
দীপকে আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের বর্তমান ব্যবস্থাপনায় কে ভোট দিতে পারবেন এবং কে পারবেন না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, SIR প্রক্রিয়া বন্ধ করা এবং ভোটার তালিকা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য কী?
CJP-র অভিযোগের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত এক বছরে নেওয়া সব সিদ্ধান্ত, SIR-সহ, তিন নির্বাচন কমিশনারের অনুমোদনেই সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে।
কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশির উত্থাপিত প্রশ্ন বা মতামতগুলি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার অংশ ছিল। কমিশন জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য বা প্রশাসনিক প্রশ্ন তোলা একটি বহু-সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক বিষয় এবং তার অর্থ এই নয় যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া হয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্তে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনার গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। চারটি আপত্তি একই দিনে নথিভুক্ত হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইতিহাস গড়েও সোনা অধরা! এশিয়ান গেমসে রূপোতেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো রোশাবিনাকে
CJP-এর তিনটি প্রধান দাবি
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পাশাপাশি CJP তিনটি মূল দাবি জানিয়েছে।
প্রথমত, জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করার পাশাপাশি তিনি কার নির্দেশে কাজ করেছেন, তা তদন্ত করার দাবি জানিয়েছে দলটি।
দ্বিতীয়ত, আসন্ন নির্বাচনগুলির প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে SIR বন্ধ করার দাবি করা হয়েছে। CJP জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারির ভোটার তালিকায় ফিরে গিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা উচিত। SIR সংক্রান্ত সমস্ত নথি সুপ্রিম কোর্টের হেফাজতে রাখার দাবিও জানিয়েছে দলটি।
তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইন বাতিল করে নতুন আইন তৈরির দাবি জানিয়েছে CJP। সেই প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।
৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা, তারপর দেশজুড়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
CJP জানিয়েছে, জ্ঞানেশ কুমার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু করা হবে। এরপর দিল্লিতে আন্দোলন আরও জোরদার করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে নির্বাচন কমিশনের ভিতরে SIR এবং ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি সংক্রান্ত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনের পর। এর পরেই বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সংগঠনের তরফে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, SIR-সহ কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ছিল। ফলে এখন মূল বিতর্ক দুটি জায়গায়, একদিকে দুই নির্বাচন কমিশনারের নথিভুক্ত আপত্তি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন, অন্যদিকে সেই আপত্তিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা।
CJP-এর ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামের পর এই বিতর্ক কোন দিকে যায় এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ঘোষিত আন্দোলন বাস্তবে কীভাবে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
