চিনের নৌবাহিনীর সাবমেরিন (Nuclear Submarine) শক্তিতে আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল। হুলুদাওয়ের বোহাই শিপইয়ার্ডে নির্মীয়মাণ একটি নতুন সাবমেরিনের স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। ছবিতে এমন কিছু প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য দেখা গিয়েছে, যা এটিকে চিনের পরবর্তী প্রজন্মের পরমাণু শক্তিচালিত আক্রমণাত্মক সাবমেরিন হিসেবে চিহ্নিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
১৮ সেপ্টেম্বর ভ্যান্টর-এর তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে সাবমেরিনটির নির্মাণকাজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে এটিকে সম্ভাব্য টাইপ ০৯৫ সাবমেরিন বলা হচ্ছে। তবে এই নাম বা শ্রেণিবিন্যাস এখনও সরকারি ভাবে নিশ্চিত হয়নি। সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে সাবমেরিনটির পাম্পজেট প্রপালশন ব্যবস্থা এবং পিছনের এক্স-আকৃতির কন্ট্রোল সারফেস। এই দুটি বৈশিষ্ট্যই নতুন নকশার প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাম্পজেট প্রপালশন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রচলিত সাবমেরিনে সাধারণত বাইরে দৃশ্যমান প্রপেলার ব্যবহার করা হয়। পাম্পজেট ব্যবস্থায় প্রপালশন সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ একটি শ্যাড বা আবরণের মধ্যে থাকে। জেনসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাম্পজেট উচ্চ গতিতে পানির নিচে চলার সময় দক্ষতা বাড়াতে পারে এবং শব্দের মাত্রা কমাতেও সাহায্য করতে পারে। পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিনের ক্ষেত্রে এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার সময় শত্রুর সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ বা সামুদ্রিক টহল বিমান যাতে সহজে সেটিকে শনাক্ত করতে না পারে, সেজন্য শব্দ কম রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিনের আগের কিছু উন্নত সাবমেরিনেও পাম্পজেট প্রযুক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। ফলে নতুন নকশায় এই প্রযুক্তির আরও উন্নত সংস্করণ ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
এক্স-আকৃতির পিছনের অংশও নজরে
নতুন সাবমেরিনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল পিছনের এক্স-আকৃতির কন্ট্রোল ব্যবস্থা। চিনের আগের কয়েকটি পরমাণু সাবমেরিনে তুলনামূলক প্রচলিত ক্রুসিফর্ম বিন্যাস দেখা গেলেও নতুন নকশায় এক্স-টেল ব্যবহার করা হয়েছে বলে স্যাটেলাইট ছবিতে বোঝা যাচ্ছে। এই ধরনের বিন্যাস সাবমেরিনের নিয়ন্ত্রণ ও ম্যানুভারেবিলিটি উন্নত করতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জলপ্রবাহ ও শব্দের স্বাক্ষর কমানোর সুবিধাও পাওয়া যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, চিনের একাধিক নতুন সাবমেরিন নকশায় একই ধরনের প্রযুক্তি দেখা যাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, বেজিং বিভিন্ন শ্রেণির সাবমেরিনে কিছু সাধারণ প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে।
অস্ত্র ব্যবস্থার বিষয়ে এখনও ধোঁয়াশা
স্যাটেলাইট ছবিতে সাবমেরিনটির পিছনের অংশের পাশাপাশি মাঝামাঝি অংশেও একটি বড় কাঠামো দেখা যাচ্ছে। এটিকে সম্ভাব্য ভার্টিক্যাল লঞ্চ সিস্টেম বা ভিএলএস-এর সঙ্গে যুক্ত করা হলেও বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়।
দ্য ওয়ার জোনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, টাইপ ০৯৫-এ বিভিন্ন ধরনের ক্রুজ মিসাইল রাখার জন্য ভিএলএস ব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। তবে প্রকাশ্য স্যাটেলাইট ছবি দেখে ঠিক কতগুলি লঞ্চ সেল থাকবে বা কোন জায়গায় থাকবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। নৌ-সাবমেরিন বিশ্লেষক অ্যালেক্স লাকও সতর্ক করেছেন যে ছবিতে দেখা আয়তাকার অংশটিকে সরাসরি ভিএলএস হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। সেটি রিঅ্যাক্টর কম্পার্টমেন্ট বা সাবমেরিনের অন্য কোনও নির্মাণ অংশের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ সাবমেরিনটির অস্ত্র বিন্যাস নিয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।
পাকিস্তানের সাবমেরিন বহরেও পরিবর্তন
চিনের নতুন পরমাণু সাবমেরিনের পাশাপাশি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের সাবমেরিন বহরেও পরিবর্তন হচ্ছে। পাকিস্তান চিনের সহযোগিতায় আটটি হ্যাংগর শ্রেণির প্রচলিত সাবমেরিন তৈরি করছে। এর মধ্যে চারটি চিনে এবং বাকি চারটি করাচিতে তৈরি হচ্ছে। পাকিস্তানের সরকারি সূত্রও আটটি সাবমেরিনের এই নির্মাণ পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে। এই সাবমেরিনগুলিতে এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন বা এআইপি ব্যবস্থার ব্যবহার রয়েছে। এআইপি ব্যবস্থার ফলে ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকতে পারে এবং বারবার উপরে উঠে বা স্নরকেল ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করার প্রয়োজন কমে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে পাকিস্তানের চতুর্থ হ্যাংগর শ্রেণির সাবমেরিন চিনে জলে নামানো হয়েছিল। পাকিস্তানের সরকারি সূত্র জানিয়েছিল, চিনে তৈরি চারটি সাবমেরিনই তখন সমুদ্র পরীক্ষার পর্যায়ে ছিল।
ভারতের সাবমেরিন প্রকল্প কোথায়?
ভারতও নিজেদের প্রচলিত সাবমেরিন বহর আধুনিকীকরণের জন্য একাধিক প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে প্রজেক্ট ৭৫আই। এই প্রকল্পে ছয়টি এআইপি-সক্ষম ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স এবং জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস বা টিকেএমএস এই প্রকল্পে কাজ করছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই দুই সংস্থা আনুষ্ঠানিক চুক্তি আলোচনায় প্রবেশের কথা জানিয়েছিল।
২০২৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মূল্য প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকা থেকে ৯০,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট মূল্য নিশ্চিত নয়।
প্রথম সাবমেরিনের ডেলিভারি চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক বছর পর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের সাবমেরিন বহরে নতুন সংখ্যা যোগ হবে না।
আরও বড় পরমাণু সাবমেরিন প্রকল্প
ভারতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দেশীয় প্রযুক্তিতে পরমাণু শক্তিচালিত আক্রমণাত্মক সাবমেরিন তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সাবমেরিন প্রযুক্তি ও দেশীয় নির্মাণ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে।
অন্যদিকে চিন ইতিমধ্যেই একাধিক নতুন সাবমেরিন নকশা নিয়ে এগোচ্ছে। মার্কিন নৌ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও ২০২৬ সালে জানিয়েছিলেন, টাইপ ০৯৫ এবং পরবর্তী প্রজন্মের টাইপ ০৯৬-এর মতো সাবমেরিন ২০২০-এর শেষ দিক থেকে ২০৩০-এর দশকে পরিষেবায় আসতে পারে এবং এগুলিতে রিঅ্যাক্টর, সেন্সর, অস্ত্র সংযুক্তি ও শব্দ কমানোর প্রযুক্তিতে উন্নতি থাকতে পারে।
ফলে হুলুদাওয়ের এই নতুন সাবমেরিন শুধু একটি নতুন যুদ্ধজাহাজের নির্মাণ নয়, চিনের দীর্ঘমেয়াদি সাবমেরিন আধুনিকীকরণ কর্মসূচির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে স্যাটেলাইট ছবি থেকে সাবমেরিনটির প্রকৃত শ্রেণি, অস্ত্রের সম্পূর্ণ বিন্যাস, রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বা পরিষেবায় প্রবেশের সময় নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে আরও ছবি এবং সরকারি তথ্য প্রকাশের পরই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।
