চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন আমেরিকা সফরকে (US China Summit)ল ঘিরে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে পৌঁছবেন শি। আর এবার একটি বিরল কূটনৈতিক পদক্ষেপ করতে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে গিয়ে চিনের প্রেসিডেন্টকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানাবেন তিনি। সাধারণত বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের বিমানবন্দরে গিয়ে স্বাগত জানান না মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফলে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শি জিনপিংয়ের ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের রাষ্ট্রীয় সফরটি এক দশকেরও বেশি সময় পর কোনও চিনা প্রেসিডেন্টের আমেরিকায় প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে দুই নেতার মূল বৈঠক হওয়ার কথা। সফরে বাণিজ্য, শুল্ক, বিরল খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তাইওয়ানসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
বিমানবন্দরে বিরল অভ্যর্থনা ট্রাম্পের
২৩ সেপ্টেম্বর শি জিনপিংয়ের বিমান জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে পৌঁছনোর পর ট্রাম্প নিজে সেখানে উপস্থিত থাকবেন। মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ধরনের বিমানবন্দর অভ্যর্থনা মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য বিরল। এরপর বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে শি ও তাঁর স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাবেন ট্রাম্প ও মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। সেখানে সামরিক অভ্যর্থনা, গার্ড অব অনার এবং রোজ গার্ডেনে সামরিক বাহিনীর পর্যালোচনার মতো একাধিক অনুষ্ঠান রয়েছে। সন্ধ্যায় রয়েছে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ। এই সফরের আগে হোয়াইট হাউসে সামরিক অভ্যর্থনার মহড়াও হয়েছে।
মে মাসের সফরের সঙ্গে এবার পার্থক্য
চলতি বছরের মে মাসে ট্রাম্প চিন সফরে গেলে বেজিং বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে শি নিজে উপস্থিত ছিলেন না। চিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং এবং অন্যান্য আধিকারিকরা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এবার শি আমেরিকায় আসার সময় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত উপস্থিতি সেই প্রোটোকলের তুলনায় আলাদা ছবি তৈরি করছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক বিশ্লেষণে এই প্রতীকী পার্থক্যকে দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কের পরিবর্তিত সমীকরণের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর অর্থ যে কোনও নির্দিষ্ট নীতিগত ছাড়, তা এখনও বলা যাচ্ছে না।
শুল্ক যুদ্ধের পর নতুন আলোচনার চেষ্টা
ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদ থেকেই আমেরিকা ও চিনের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে তীব্র সংঘাত তৈরি হয়েছিল। শুল্ক আরোপ এবং পাল্টা শুল্কের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের উপর চাপ বেড়েছিল। এবারের আলোচনায় সেই বাণিজ্য সংঘাত কমানোর সম্ভাবনা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুই দেশের মধ্যে চলতি শুল্ক-সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানো, নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে পারস্পরিক শুল্ক কমানো এবং চিনের পক্ষ থেকে মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার মতো বিষয় আলোচনায় থাকতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৌশলগত নয় এমন কিছু পণ্যের উপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বিরল খনিজের ক্ষেত্রে মার্কিন রফতানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার সম্ভাবনা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিরল খনিজ থেকে এআই, আলোচনায় প্রযুক্তিও
বাণিজ্যের পাশাপাশি বিরল খনিজ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহও আলোচনার অন্যতম বিষয় হতে পারে। আধুনিক বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন শিল্পে এই খনিজগুলির গুরুত্ব রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, প্রযুক্তি রফতানি নিয়ন্ত্রণ এবং এআই চিপের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দুই দেশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতা করছে। ফলে এই ক্ষেত্রে কোনও সমঝোতার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাও বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে প্রযুক্তি জগতের বড় নাম
শি জিনপিংয়ের সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে আমেরিকার প্রযুক্তি ও ব্যবসা জগতের একাধিক পরিচিত মুখ উপস্থিত থাকবেন। তালিকায় রয়েছেন অ্যামাজনের জেফ বেজোস, গুগলের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান, অ্যাপলের টিম কুক, টেসলার ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং ডেল টেকনোলজিসের মাইকেল ডেল। এই উপস্থিতি বিশেষ করে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরছে।
তাইওয়ান ও ইরানও আলোচনায়
বৈঠকের আলোচনায় শুধু অর্থনীতি থাকবে না। তাইওয়ানও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে চলেছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, শি জিনপিং আমেরিকার তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি তুলতে পারেন। বেজিং দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করে আসছে। ইরানের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। আমেরিকা ও চিনের ইরান-সংক্রান্ত অবস্থান এক নয় এবং এই বিষয়টি দুই দেশের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর মতো আন্তর্জাতিক বিষয়ও দুই নেতার আলোচনায় উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
আমেরিকা ও চিনের সম্পর্কের যেকোনও বড় পরিবর্তন ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আমেরিকা চিনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর ফলে ভারতও উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের মধ্যে যদি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সমঝোতা তৈরি হয়, তাহলে চিনের বাইরে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন সংস্থাগুলির কৌশল কিছুটা বদলাতে পারে। এই কারণেই ভারত আমেরিকা-চিন সম্পর্কের উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতা, দুই দিকই সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ভারতের জন্য বিষয়টি শুধু আমেরিকা বনাম চিন হিসেবে দেখার নয়। দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বাড়লে বিশ্ব বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হতে পারে। আবার সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলে এশিয়ায় দুই পরাশক্তির প্রভাবের ভারসাম্য নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বড় চুক্তির চেয়ে স্থিতিশীলতার দিকে নজর
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বৈঠকে বড় কোনও চূড়ান্ত চুক্তির বদলে দুই দেশের সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার দিকে বেশি গুরুত্ব থাকতে পারে। শুল্ক-সমঝোতা বাড়ানো, নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্ক কমানো এবং বাণিজ্য নিয়ে নতুন ব্যবস্থা তৈরির মতো সীমিত পদক্ষেপ আলোচনার ফল হতে পারে।
অর্থাৎ ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের এই সফর শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়। বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, বিরল খনিজ, তাইওয়ান এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির একাধিক জটিল প্রশ্নে আমেরিকা ও চিন কীভাবে নিজেদের সম্পর্ক পরিচালনা করে, তার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে এই বৈঠক।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories — On Kolkata24x7 Business.
