কলকাতা: ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। আকাশে উড়ে নজরদারি বা হামলা চালানোর বদলে এবার ভারী বোমার ড্রোন ব্যবহার করে আনম্যানড গ্রাউন্ড ভেহিকল বা ইউজিভি, অর্থাৎ চালকহীন মাটির রোবটকে রুশ বাহিনীর পিছনের এলাকায় পৌঁছে দিচ্ছে ইউক্রেনীয় সেনা।
ইউক্রেনের তৃতীয় আর্মি কোর জানিয়েছে, ‘অপারেশন ভিভাল্ডি’-র সময় ভারী বোমার ড্রোনের মাধ্যমে কামিকাজে ইউজিভি রুশ বাহিনীর অবস্থানের ১০ কিলোমিটারেরও বেশি পিছনে নামানো হয়েছে। এই রোবটগুলি রুশ বাহিনীর কমান্ড পোস্ট, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং লজিস্টিক বা রসদ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় পক্ষ জানিয়েছে।
আকাশ থেকে নামল মাটির যুদ্ধ রোবট
ইউক্রেনের তৃতীয় আর্মি কোরের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আন্দ্রি বিলেতস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, আক্রমণাত্মক অভিযানে ইউএভি এবং ইউজিভি এখন পদাতিক বাহিনীর আগেই এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন কৌশলে ভারী বোমার ড্রোন প্রথমে একটি চালকহীন গ্রাউন্ড রোবটকে বহন করে রুশ বাহিনীর পিছনের এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে রোবটটি নামানোর পর সেটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনীয় তৃতীয় আর্মি কোর এটিকে বিশ্বের প্রথম এই ধরনের ব্যবহার বলে দাবি করেছে। তবে এই ‘বিশ্বের প্রথম’ দাবিটি মূলত ইউক্রেনীয় সামরিক পক্ষের বক্তব্য হিসেবেই দেখা উচিত।
Read More: টি-৭২ ও টি-৯০ ট্যাঙ্কের জন্য অক্সিলিয়ারি পাওয়ার ইউনিট খাতে ৫৮৬ কোটির চুক্তি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের
লক্ষ্য রুশ বাহিনীর লজিস্টিক ব্যবস্থা
এই কৌশলের মূল লক্ষ্য শুধু সরাসরি রুশ সেনাদের আক্রমণ করা নয়। বরং সামনের সারিতে থাকা রুশ সেনাদের পিছনে থাকা লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা আঘাত করাই অন্যতম উদ্দেশ্য। ইউক্রেনের তৃতীয় আর্মি কোর জানিয়েছে, অপারেশন ভিভাল্ডির সময় রুশ কমান্ড পোস্ট, যোগাযোগ কেন্দ্র, লজিস্টিক সুবিধা, নদী পারাপারের জায়গা এবং রিজার্ভ বাহিনীর অবস্থানেও হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে অপারেশনটির প্রথম পর্যায়েই ইউক্রেনীয় ড্রোন ইউনিটগুলি রুশ রসদ ব্যবস্থার উপর ব্যাপক চাপ তৈরি করেছিল বলে তৃতীয় কোর দাবি করেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কিছু সরঞ্জাম পরিবহনের রুট প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছিল।
রুশ নজরদারি ড্রোন ‘অন্ধ’ করার চেষ্টা
শুধু রোবট পাঠিয়েই ইউক্রেন এই অভিযান চালায়নি। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা বৈদ্যুতিন যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইউক্রেনীয় সামরিক পক্ষের দাবি, এই ব্যবস্থাগুলি ব্যবহার করে রুশ নজরদারি ড্রোনগুলির কার্যক্ষমতা ব্যাহত করা হয়েছিল। এর ফলে রুশ বাহিনী আক্রমণের প্রস্তুতি সম্পর্কে আগেভাগে সম্পূর্ণ তথ্য পায়নি বলে ইউক্রেন দাবি করেছে। অর্থাৎ কৌশলটি একক কোনও প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। আকাশের ড্রোন, মাটির রোবট, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং আকাশ প্রতিরক্ষাকে একসঙ্গে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে।
Read More: তেহরিক ই তালিবানের সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই! স্বীকারোক্তি TTP নেতার
ভিভাল্ডি অভিযানে কতটা এলাকা পুনর্দখল?
অপারেশন ভিভাল্ডি শুরু হয় উত্তর ডনেস্ক অঞ্চলে। ১৫ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনীয় তৃতীয় আর্মি কোর জানিয়েছিল, তারা প্রায় ৭৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা পরিষ্কার করেছে এবং আরও ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্দখল করেছে। এরপর ২০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষে ইউক্রেনীয় পক্ষ আরও ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণে ফেরানোর দাবি করে। একই সঙ্গে শান্দ্রিহোলোভে এবং দেরিলোভে গ্রাম পুনর্দখল এবং দ্রোবিশেভে-তে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা জানানো হয়।
তৃতীয় আর্মি কোরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দুটি পর্যায় মিলিয়ে ১২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ইউক্রেনীয় নিয়ন্ত্রণে ফিরেছে, যার মধ্যে ৫০ বর্গকিলোমিটার রুশ দখল থেকে মুক্ত করা হয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় এই ধরনের আঞ্চলিক দাবিগুলি স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
এর আগেও সমুদ্রপথে ইউজিভি পাঠিয়েছিল ইউক্রেন
আকাশ থেকে ইউজিভি নামানোর ঘটনা নতুন হলেও ইউক্রেন এর আগে অন্য একটি অভিনব পদ্ধতিতেও মাটির রোবট ব্যবহার করেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী একটি চালকহীন সারফেস ভেসেল ব্যবহার করে দখলকৃত কিনবার্ন স্পিট এলাকায় একটি ইউজিভি পৌঁছে দিয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। সেই গ্রাউন্ড রোবটের সঙ্গে একটি দূরনিয়ন্ত্রিত মেশিনগান ব্যবস্থাও ছিল। অর্থাৎ আকাশ, সমুদ্র এবং স্থল, তিন ধরনের মানবহীন প্ল্যাটফর্মকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করার দিকে ইউক্রেনের যুদ্ধপ্রযুক্তি এগোচ্ছে।
শুধু হামলা নয়, রসদ পরিবহণেও ইউজিভি
ইউজিভির ব্যবহার শুধু আক্রমণাত্মক অভিযানে সীমাবদ্ধ নয়। ইউক্রেনীয় বাহিনী এগুলিকে সামনের সারিতে রসদ পৌঁছে দেওয়া, আহত সেনাকে উদ্ধার, মাইন পাতা বা সরানো এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জাম বহনের মতো কাজেও ব্যবহার করছে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের পরিবর্তে মেশিন পাঠানো যায়। ফলে এমন কাজেও মানবসেনার সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন কমানো সম্ভব হয়।
তবে মাটির রোবট পরিচালনাও সহজ নয়। অসমান ভূখণ্ড, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, সীমিত সেন্সিং ক্ষমতা এবং তীব্র ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউজিভির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এই সমস্যা মোকাবিলায় রেডিও নেটওয়ার্ক, ফাইবার-অপটিক কেবল, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং আকাশপথে রিলে ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ কি আরও বেশি রোবটনির্ভর?
ইউক্রেনের সাম্প্রতিক কৌশল যুদ্ধক্ষেত্রে মানবহীন প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা দ্রুত বদলাচ্ছে, তার একটি উদাহরণ। এতদিন ড্রোন বলতে মূলত আকাশপথে নজরদারি এবং হামলার কথাই বোঝানো হত। এখন একই প্রযুক্তিকে অন্য মানবহীন প্ল্যাটফর্ম বহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অপারেশন ভিভাল্ডিতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, আকাশের ড্রোন মাটির রোবটকে শত্রুর পিছনে পৌঁছে দিচ্ছে, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রুশ নজরদারি ব্যাহত করার চেষ্টা করছে এবং আক্রমণের আগে মানবসেনার বদলে রোবোটিক ব্যবস্থা এগিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রবণতা দেখাচ্ছে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশ, স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক মানবহীন ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর এবং কত দ্রুত বড় পরিসরে ব্যবহারযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যাটারি, সেন্সর এবং উৎপাদন ক্ষমতার উপর।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories — On Kolkata24x7 Business.
