বেঙ্গাালুরু: ভারতের প্রতিরক্ষা ও বিমান নির্মাণ (India Aerospace) ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি হল। বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড বা এইচএএল ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে তেজস এফওসি টুইন-সিটার ট্রেনার এবং এইচটিটি-৪০ বেসিক ট্রেনার বিমান তুলে দিয়েছে। একই অনুষ্ঠানে পবন হংস লিমিটেডের হাতে দেওয়া হয়েছে ধ্রুব নেক্সট জেনারেশন হেলিকপ্টার।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মতে, এই অনুষ্ঠান ভারতের আত্মনির্ভরতার যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। দেশীয় শিল্প সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করে সামরিক এবং বেসামরিক, দুই ক্ষেত্রের জন্যই আধুনিক বিমান ও হেলিকপ্টার নকশা, উন্নয়ন এবং উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ছে বলে মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে।
পাইলট প্রশিক্ষণে নতুন ভূমিকা এইচটিটি-৪০-এর
তেজস টুইন-সিটারের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে এইচটিটি-৪০-এর উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ভারতীয় বায়ুসেনার পাইলট প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় দুটি বিমানের ভূমিকা আলাদা হলেও পরস্পরের পরিপূরক। এইচটিটি-৪০ মূলত পাইলটদের প্রাথমিক বা বেসিক ফ্লাইং প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হবে। এটি সুইস প্রযুক্তির পিলাটাস পিসি-৭ এমকে-২ বিমানের পাশাপাশি কাজ করবে।
অন্যদিকে তেজস টুইন-সিটার ব্যবহার করা হবে আরও উন্নত পর্যায়ের টাইপ-কনভার্সন প্রশিক্ষণে। অর্থাৎ প্রশিক্ষণের প্রাথমিক পর্যায় থেকে উন্নত যুদ্ধবিমান পরিচালনার পর্যায় পর্যন্ত ভারতীয় বায়ুসেনার পাইলট প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় দেশীয় বিমানের ভূমিকা আরও বাড়তে চলেছে।
Read More: নীতিশের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ আকাশ, হার্দিকের পর নতুন অলরাউন্ডার?
সম্পূর্ণ অ্যারোবেটিক, আধুনিক বৈশিষ্ট্যে তৈরি এইচটিটি-৪০
এইচটিটি-৪০ হল ট্যান্ডেম-সিটের একটি সম্পূর্ণ অ্যারোবেটিক টার্বোপ্রপ প্রশিক্ষণ বিমান। এতে রয়েছে গ্লাস ককপিট, আধুনিক অ্যাভিওনিক্স, হট-রিফুয়েলিংয়ের সুবিধা এবং ‘জিরো-জিরো’ ইজেকশন সিট। জিরো-জিরো ইজেকশন সিট এমনভাবে তৈরি, যাতে বিমান মাটিতে থাকা অবস্থাতেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পাইলটকে নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণে নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণে এই বৈশিষ্ট্যগুলি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এইচটিটি-৪০ বিমানে ব্যবহৃত হয়েছে হানিওয়েলের টিপিই৩৩১-১২বি টার্বোপ্রপ ইঞ্জিন।
Read More: Jio রিচার্জে বিনামূল্যে এই পরিষেবা! ৪০০০ টাকার সাবস্ক্রিপশন সুবিধা
৬,৮০০ কোটি টাকার চুক্তি, ৭০টি বিমান
ভারতীয় বায়ুসেনা মোট ৭০টি এইচটিটি-৪০ বিমানের জন্য প্রায় ৬,৮০০ কোটি টাকা-র চুক্তি করেছে। বিমানটির প্রাথমিক দেশীয় উপাদানের হার ৫৬ শতাংশ। ভবিষ্যতে সেটি ৬০ শতাংশের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। ফলে দেশীয় প্রশিক্ষণ বিমান তৈরির মাধ্যমে বিদেশি প্ল্যাটফর্মের উপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও এইচটিটি-৪০ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে প্রকল্পটির সরবরাহে ইতিমধ্যেই দেরি হয়েছে। প্রথম বিমান ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা ছিল এবং ৭০টি বিমান ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সেই সময়সীমা অনুযায়ী সরবরাহ প্রায় এক বছর পিছিয়ে রয়েছে।
তেজস এমকে-১এ প্রকল্পেও সরবরাহের চাপ
এই হস্তান্তরের সময় তেজস এমকে-১এ প্রকল্পের সরবরাহ সংক্রান্ত সমস্যাও সামনে এসেছে। ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য তেজস এমকে-১এ সরবরাহে দেরির অন্যতম কারণ হিসেবে জিই অ্যারোস্পেসের এফ৪০৪-আইএন২০ ইঞ্জিন সরবরাহে বিলম্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বায়ুসেনা প্রথম পর্যায়ে ৮৩টি এমকে-১এ বিমানের অর্ডার দিয়েছিল। এর মধ্যে ৭৩টি সিঙ্গল-সিটার যুদ্ধবিমান এবং ১০টি টুইন-সিটার প্রশিক্ষণ বিমান ছিল। প্রথমে ২০২৪ সালে সরবরাহ শুরু করে ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে পুরো অর্ডার শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। সেই সময়সীমা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে গিয়েছে।
Read More: ভারতে প্রোটিনের চাহিদা তিনগুণ! দুধ-ডালের সঙ্গে বাড়বে কার্বন নিঃসরণও
এইচএএলকে মোট ১৮০টি তেজস এমকে-১এ সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত ২৭টি এয়ারফ্রেম তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জিই অ্যারোস্পেস ১০টি ইঞ্জিন সরবরাহ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। ফলে ইঞ্জিন সরবরাহের গতি তেজস উৎপাদন ও হস্তান্তরের উপর প্রভাব ফেলছে। এছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিমান ব্যবস্থা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংযুক্ত করতে এইচএএলের সমস্যার কথাও সরবরাহ বিলম্বের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
ধ্রুব এনজি-র মাধ্যমে বেসামরিক ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ
অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পবন হংসের হাতে ধ্রুব নেক্সট জেনারেশন হেলিকপ্টার তুলে দেওয়া। এর ফলে এই উদ্যোগ শুধুমাত্র সামরিক বিমান নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে তেজস ও এইচটিটি-৪০ এবং বেসামরিক ক্ষেত্রে ধ্রুব এনজি, একই অনুষ্ঠানে এই তিন প্ল্যাটফর্মের উপস্থিতি ভারতের দেশীয় অ্যারোস্পেস উৎপাদন পরিকাঠামোকে আরও বিস্তৃত করার প্রচেষ্টার দিকটি তুলে ধরেছে।
দেশীয় নকশা, উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিল্প সহযোগীদের আরও বেশি যুক্ত করে সামরিক ও বেসামরিক, দুই ক্ষেত্রেই ভারতের বিমান নির্মাণ সক্ষমতা বাড়ানোই এই উদ্যোগের বড় লক্ষ্য।
