কলকাতা: নবীন, সদা পরিবর্তনশীল এবং ভয়ঙ্কর। হিমালয় পর্বতমালা সম্পর্কে এই তিনটি শব্দই যেন চরম সত্য। বিশ্বের অন্যতম ভূকম্পনপ্রবণ এই পর্বতমালা মাঝে মাঝেই তার রুদ্ররূপ দেখায়। সম্প্রতি তিব্বত-নেপাল সীমান্তে ভূমিকম্প ও তুষারধসের জেরে সৃষ্ট ভয়াবহ হড়পা বানে ইতিমধ্যেই ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ শতাধিক ভারতীয়-সহ বহু মানুষ। জলের সেই অদম্য দেওয়াল নিমেষে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে আস্ত গ্রাম, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। কিন্তু নেপালের এই মহাপ্রলয় ভারতের জন্য এক বৃহত্তর অশনি সংকেত বহন করে আনছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অরুণাচল প্রদেশের ঠিক ওপারে তিব্বতে চিন যে দৈত্যাকার বাঁধ তৈরি করছে, তা আসলে ভারতের মাথার ওপর ঝুলতে থাকা একটি আস্ত ‘জলবোমা’ (Water Bomb)!
চিনের দানবাকৃতি মেদগ বাঁধ
তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদী ভারতে প্রবেশ করে পরিচিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নামে। এই নদীর ওপর চিনের স্বশাসিত তিব্বত অঞ্চলের (TAR) মেদগ (Medog) এলাকায় একটি ৬০ হাজার মেগাওয়াটের দানবাকৃতি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করছে বেজিং। ২০৩৩ সালের মধ্যে এটি চালু করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ব্যয়ের এই মেদগ ড্যাম (Medog Dam) সম্পূর্ণ হলে তা চিনেরই থ্রি গর্জেস ড্যামকে ছাপিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পরিণত হবে।
কেন প্রমাদ গুনছেন বিশেষজ্ঞরা?
আশঙ্কার মূল কারণ হলো এই বাঁধের ভৌগোলিক অবস্থান। হিমালয় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভূকম্পনপ্রবণ এলাকা, যেখানে ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের অবিরাম সংঘর্ষ চলছে। গত জুলাই মাসে খোদ চিনের সরকারি ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষাতেই ধরা পড়েছে যে, নির্মীয়মাণ এই মেদগ বাঁধটি একটি সক্রিয় চ্যুতি বা ‘অ্যাক্টিভ ফল্ট লাইন’ (Paizhen Fault)-এর ঠিক ওপরে অবস্থিত!
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে, মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বা তুষারধস কীভাবে শত শত কিলোমিটার দূরে প্রলয় ঘটাতে পারে। স্ট্র্যাটেজিক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানি এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে লিখেছেন, “নেপালের এই বিপর্যয় বিশ্বের বৃহত্তম ড্যাম তৈরির পিছনে চিনের নির্বুদ্ধিতাকেই ফের সামনে আনল। ভারত-তিব্বত সীমান্তের কাছে তৈরি হওয়া এই প্রকল্পটি একটি জলবোমা, যা ফেটে গেলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ভাটির দিকে থাকা বাংলাদেশ কার্যত জলের তলায় তলিয়ে যাবে।”
প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ও বিদেশনীতি বিশ্লেষক রাজীব ডোগরাও সতর্ক করে জানিয়েছেন, ভূকম্পনপ্রবণ এলাকায় চিনের এই ৬০ হাজার মেগাওয়াটের ‘মনস্টার ড্যাম’ ভারতের উত্তর-পূর্বের জন্য এর চেয়েও কয়েকগুণ বড় ধ্বংসলীলা ডেকে আনতে পারে। নিউজউইক-এর প্রাক্তন সম্পাদক টুঙ্কু বরদারাজন চিনা প্রকল্পের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, “আক্ষরিক এবং রূপক, উভয় অর্থেই চিন তার ভাটির দিকে থাকা সকলের মৃত্যুর কারণ হতে চলেছে।”
জল-অস্ত্র ও ভারতের পালটা প্রস্তুতি
ভারতের অন্যতম প্রধান কৌশলগত উদ্বেগ হলো, নদীর উচ্চ অববাহিকায় এমন বিশাল বাঁধ বেজিংকে একটি শক্তিশালী ‘জল-অস্ত্র’ তুলে দেবে। চিন ইচ্ছা করে ভারতের জল বন্ধ করে দেবে, এমনটা না হলেও নদীর জলের স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে বেজিং কৌশলগত সুবিধা আদায় করতে পারে।
এই বিপদের মোকাবিলায় নয়াদিল্লিও হাত গুটিয়ে বসে নেই। অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নদীর ওপর ১১ হাজার মেগাওয়াটের ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’ তৈরি করছে ভারত। এর মূল লক্ষ্যই হলো, উজানে চিনের বাঁধ থেকে আসা জলের বিশাল ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিজেদের জলসুরক্ষা নিশ্চিত করা।
তথ্য গোপনের চিনা স্বভাব
সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গাটি হলো তথ্যের অভাব। ভারত ও চিনের মধ্যে জল-বণ্টন বা রিয়েল-টাইম হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা বিনিময়ের কোনও পোক্ত চুক্তি নেই। নেপালের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে, তিব্বত থেকে বিপুল জলরাশি ধেয়ে আসার আগে কাঠমাণ্ডুকে বিন্দুমাত্র সতর্ক করেনি বেজিং। কাঠমাণ্ডুর এক সাংবাদিক পরশুরাম কাফলে আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, উত্তরের প্রতিবেশী আগাম সতর্কবার্তা না দেওয়ায় নেপালকে বিপুল প্রাণহানির মুখে পড়তে হল।
চিন নেপালের সঙ্গে যা করেছে, ভারতের ক্ষেত্রেও সেই একই ছকের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূকম্পনপ্রবণ এলাকায় দানবাকৃতি এই ড্যাম তাই শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক নীরব ‘টাইম বোমা’ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মৃতদের ৯ লাখ, ক্ষতিগ্রস্তদের ৩০ হাজার! সবং পরিদর্শনে গিয়ে আর কী ঘোষণা শুভেন্দুর?
জোরকদমে দল গঠন! ইমামির বিদায়ের পর ইস্টবেঙ্গলের ভরসা জুপিটার,
