Operation Safed Sagar: ১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে দেশের নজর ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে সরে গিয়ে আটকে গিয়েছিল কার্গিলের দুর্গম, পাথুরে পাহাড়ে। মে মাসের শুরুতেই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা উপত্যকার বহু হাজার ফুট উপরে থাকা পাহাড়ি এলাকায় অস্বাভাবিক গতিবিধি লক্ষ্য করেছিলেন। প্রথম টহলদল, যার নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট সৌরভ কালিয়া, গুলির লড়াইয়ের পর নিখোঁজ হয়ে যায় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়।
ওই দলের সদস্যদের নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরে প্রথম টহলদলের খোঁজে পাঠানো আরেকটি দলও ১৭ মে-র কাছাকাছি সময়ে প্রবল হামলার মুখে পড়ে। ক্যাপ্টেন অমিত ভরদ্বাজ এবং হাবিলদার রাজবীর সিং শেওরানের আত্মত্যাগী ভূমিকার কারণে ওই দলটি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন অনুপ্রবেশ নয়। পাকিস্তানি সেনা ও অনুপ্রবেশকারীরা কার্গিলের গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি চূড়াগুলিতে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নেয় ভারত সরকার। ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি বায়ুসেনা ব্যবহারের অনুমতি দেয়। কিন্তু ভারতীয় বায়ুসেনার সামনে ছিল এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ। এর আগে কোনও বায়ুসেনা ১৪ হাজার থেকে ১৮ হাজার ফুট উচ্চতায় এভাবে স্থলভাগের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালায়নি।
১৮ হাজার ফুট উচ্চতায় যুদ্ধের কঠিন পরীক্ষা
সাধারণত বড় সাঁজোয়া বাহিনী বা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত লক্ষ্যবস্তুকে আক্রমণের জন্য প্রশিক্ষিত যুদ্ধবিমানগুলিকে এবার আঘাত হানতে হচ্ছিল খাড়া পাহাড়ের গায়ে তৈরি ছোট ছোট বাঙ্কার ও সুরক্ষিত অবস্থানে। সেই ঘাঁটিগুলি দূর থেকে দেখলে আশপাশের পাথরের স্তূপ থেকে আলাদা করে চেনাও কঠিন ছিল।
উচ্চতার কারণে বাতাসের ঘনত্ব কম থাকায় বিমানের ইঞ্জিনের থ্রাস্ট কমে যাচ্ছিল। কম উচ্চতার জন্য নির্ধারিত অস্ত্রের নিশানা ব্যবস্থাতেও সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। কয়েক মিটার দূরে বোমা পড়লেও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সেটি গড়িয়ে বহু দূরের উপত্যকায় চলে যেতে পারত।
এর সঙ্গে ছিল আরও একটি বড় সীমাবদ্ধতা। ভারতীয় পাইলটদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল লাইন অব কন্ট্রোল বা এলওসি পার না করে হামলা চালাতে। ফলে পাকিস্তানি অবস্থানগুলিতে আঘাত হানার জন্য যুদ্ধবিমানগুলিকে অত্যন্ত নির্ভুল কৌশল তৈরি করতে হয়। এই পরিস্থিতিতেই শুরু হয় অপারেশন সাফেদ সাগর।
২৬ মে থেকে আকাশপথে পাল্টা আঘাত
১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর প্রায় তিন দশক পর, ২৬ মে ভারতীয় বায়ুসেনাকে কার্গিল এলাকায় পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি বিমান হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। দ্রাস থেকে বাতালিক পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়ি এলাকায় পাকিস্তানি অবস্থানগুলি তৈরি হয়েছিল। এই অবস্থানগুলি নিয়ন্ত্রণ করলে শ্রীনগর-লেহ জাতীয় সড়কের উপর গুরুতর চাপ তৈরি করা সম্ভব ছিল। ওই রাস্তা লাদাখ এবং পরবর্তী সময়ে সিয়াচেন অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা।
এয়ার কমোডোর অনিল কুমার সিনহা এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন অরবিন্দ্র ওক যথাক্রমে হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। গোপনে প্রস্তুতি চলছিল। এমআই-১৭ পরিবহণ হেলিকপ্টারগুলিকেও আক্রমণাত্মক ভূমিকায় ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়।
২৫ মে এয়ার চিফ মার্শাল এ ওয়াই টিপনিস শ্রীনগরে তাঁর কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরদিন থেকেই টোলোলিং এবং টাইগার হিল এলাকায় ভারতীয় বিমান সক্রিয় হয়ে ওঠে। রকেট হামলা ও বোমাবর্ষণে পাকিস্তানি অবস্থানগুলি কেঁপে ওঠে। রেডিও বার্তায় পাকিস্তানি পক্ষের উদ্বেগও ধরা পড়েছিল। তাদের একটি বার্তায় শোনা যায়, “এবার আমরা বন্দি হতে চলেছি।”
প্রথম ধাক্কায় বড় ক্ষতি
তবে অভিযান একেবারে মসৃণ ছিল না। প্রথম দিকেই ভারতীয় বায়ুসেনা কয়েকটি বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নচিকেতা, যাঁর কলসাইন ছিল হায়েনা-২, তাঁর মিগ-২৭ বিমান থেকে ইজেক্ট করার পর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হন। বিমানটির ইঞ্জিনে বন্দুকের গ্যাস ঢুকে যাওয়ায় উচ্চতার পাতলা বাতাসে ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা আরও কমে গিয়েছিল। তাঁকে খুঁজতে গিয়ে স্কোয়াড্রন লিডার অজয় আহুজার বিমানও গুলিবিদ্ধ হয়ে ভেঙে পড়ে। তিনি নিহত হন।
এর একদিন পর স্কোয়াড্রন লিডার রাজীব পুণ্ডির নেতৃত্বাধীন একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার স্টিংগার ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভেঙে পড়ে। ওই হেলিকপ্টারে আরও ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মুহিলান, সার্জেন্ট রাজকিশোর সাহু এবং সার্জেন্ট পিভিএনআর প্রসাদ। চারজনই নিহত হন।
এই ক্ষয়ক্ষতি ভারতীয় বায়ুসেনাকে কৌশল বদলাতে বাধ্য করে। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে থাকা কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ভূমি থেকে আকাশে আঘাত হানার ক্ষেপণাস্ত্র বা এসএএম অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়েছিল।
জিপিএস ও হাতের ক্যামেরায় নতুন কৌশল
কার্গিল অভিযানে ভারতীয় পাইলটরা তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য প্রযুক্তিকেও কাজে লাগান। জিপিএস এবং হাতের ক্যামেরা ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ ও বোমাবর্ষণের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
পাইলটরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন ধরনের আক্রমণাত্মক জ্যামিতি তৈরি করেন, যাতে অত্যন্ত উঁচু পাহাড়ের গায়ে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আরও নির্ভুলভাবে আঘাত করা যায়।
বোমাবর্ষণের আগে বেশ কিছু পরীক্ষা চালানো হয়েছিল বায়ুসেনার তোশে ময়দান এয়ার-টু-গ্রাউন্ড রেঞ্জে। যদিও সেটি কার্গিলের তুলনায় অনেক নিচু, প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় ছিল, পরীক্ষার তথ্য পরে ১৮ হাজার ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় অভিযানের জন্য পুনরায় হিসাব করা হয়।
মিরাজ-২০০০ বদলে দিল যুদ্ধের গতিপথ
কার্গিল অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে মিরাজ-২০০০ যুদ্ধবিমানকে দ্রুত প্রস্তুত করার মাধ্যমে। বেঙ্গালুরুর এয়ারক্রাফট অ্যান্ড সিস্টেমস টেস্টিং এস্টাবলিশমেন্টে বিমানগুলিকে দ্রুত প্রস্তুত করা হয়। মিরাজ-২০০০-এ লাগানো হয় লেজার-গাইডেড বোমা এবং রাফালের সদ্য অন্তর্ভুক্ত লাইটনিং পড। ৪ জুনের মধ্যে বিমানগুলি অভিযানে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এর প্রভাব দ্রুত দেখা যায়।
১৭ জুন বাতালিকের গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানি রসদ সরবরাহ ঘাঁটি মুন্থো ঢালো-তে মিরাজ-২০০০ হামলা চালায়। হামলায় পাকিস্তানি বাহিনীর ১০০-র বেশি সদস্য নিহত হওয়ার দাবি করা হয় এবং তাদের রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধাক্কা খায়। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর মিরাজ-২০০০ যুদ্ধবিমান টাইগার হিলের পাকিস্তানি অবস্থানগুলিতেও অত্যন্ত নির্ভুল হামলা চালায়।
এই বিমান হামলা ভারতীয় স্থলবাহিনীর জন্য পথ অনেকটাই পরিষ্কার করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সেনা টাইগার হিল পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়।
অপারেশন সাফেদ সাগর তাই শুধু কার্গিল যুদ্ধে ভারতীয় বায়ুসেনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান নয়, উচ্চতাজনিত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কীভাবে বিমান হামলার কৌশল বদলে কার্যকর স্থল আক্রমণ চালানো যায়, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে ওঠে।
