মস্কো: ইউক্রেন যুদ্ধ (Ukraine War) শুধু দুই দেশের সংঘাত নয়, আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিরও একটি বড় পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে। ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি যে অস্ত্রটি সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, সেটি হল গ্লাইড বোমা (Glide Bomb)। তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি এই অস্ত্র রাশিয়াকে যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন সুবিধা এনে দিয়েছে বলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
প্রচলিত বোমার সঙ্গে গ্লাইড বোমার মূল পার্থক্য হল এর উড়ে যাওয়ার ক্ষমতা। সাধারণ বোমা বিমান থেকে ফেলার পর সরাসরি নিচে পড়ে যায়। কিন্তু গ্লাইড বোমায় বিশেষ ধরনের ভাঁজ করা ডানা বা অ্যারোডাইনামিক সারফেস থাকে। বোমাটি বিমান থেকে ছাড়ার পর এই ডানাগুলি খুলে যায় এবং সেটি অনেক দূর পর্যন্ত গ্লাইড করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
এই বোমাগুলিতে সাধারণত স্যাটেলাইট নেভিগেশন এবং ইনর্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। ফলে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের নির্ভুলতা বাড়ে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিমানকে শত্রুপক্ষের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অনেক বাইরে থেকেই বোমা নিক্ষেপ করার সুযোগ দেয়।
এই স্ট্যান্ড-অফ আক্রমণ ক্ষমতাই বর্তমানে রাশিয়ার অন্যতম বড় সুবিধা। বিশেষ করে রাশিয়ার Su-34 এবং Su-35 যুদ্ধবিমান নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার ভেতর থেকেই ভারী বোমা ছুড়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারছে। এর ফলে ইউক্রেনের শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাচ্ছে এবং পাইলটদের নিরাপত্তাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে গ্লাইড বোমা মূলত দুই ধরনের। প্রথমটি হল এমন কনভার্সন কিট, যা পুরনো সাধারণ বোমাকে আধুনিক গ্লাইড বোমায় রূপান্তর করে। দ্বিতীয়টি হল সম্পূর্ণ নতুনভাবে তৈরি পারপাস-বিল্ট গ্লাইড মিউনিশন।
রাশিয়ার Unified Gliding and Correction Module (UMPK) এই ধরনের একটি কনভার্সন কিট। এর দাম প্রায় ২০,০০০ মার্কিন ডলার। এই কিট ব্যবহার করে পুরনো FAB-500 এবং FAB-1500 সিরিজের সোভিয়েত আমলের সাধারণ বোমাকে নির্ভুল গ্লাইড বোমায় রূপান্তর করা যায়। ফলে বিপুল সংখ্যক পুরনো অস্ত্রভাণ্ডারকে কম খরচেই আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে মস্কো।
পরবর্তীতে রাশিয়া Universal Interspecific Glide Munition (UMPB) নামে আরও উন্নত একটি গ্লাইড বোমা তৈরি করেছে। এতে উন্নত অ্যারোডাইনামিক নকশা ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর পাল্লা প্রায় ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। অনেক ক্ষেত্রে এই বোমাগুলির বিস্ফোরক শক্তি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সমতুল্য হলেও খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। একই সঙ্গে এগুলির নির্ভুলতাও ব্যয়বহুল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের কাছাকাছি বলে মনে করা হয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কম খরচে বিপুল সংখ্যায় এই ধরনের স্ট্যান্ড-অফ অস্ত্র ব্যবহার করলে অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই শুধু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি ছদ্মবেশ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, কম খরচের প্রতিরোধী অস্ত্র এবং কার্যকর বিমান শক্তির সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন।
এই প্রযুক্তি থেকে ভারতও দূরে নেই। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ওজনের গ্লাইড বোমা তৈরির কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হল Smart Anti-Airfield Weapon (SAAW)। নির্মাতা সংস্থা ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড (BDL)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই অস্ত্রের পাল্লা ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ভবিষ্যতে এতে একটি ছোট টার্বোজেট ইঞ্জিন যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যার ফলে এর পাল্লা প্রায় ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
এছাড়া DRDO Gaurav সিরিজের ৫০০ কেজি এবং ১,০০০ কেজি ওজনের গ্লাইড বোমাও তৈরি করছে। এই দুই সংস্করণেরই পাল্লা প্রায় ১০০ কিলোমিটার। এই অস্ত্রগুলি ভারতীয় বায়ুসেনাকে শত্রুপক্ষের গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেবে, একই সঙ্গে যুদ্ধবিমান ও বিমানচালকদের ঝুঁকিও কমাবে।
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু উন্নত ও ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, তুলনামূলকভাবে কম খরচের কিন্তু দীর্ঘ পাল্লার গ্লাইড বোমাও যুদ্ধের ফলাফল প্রভাবিত করতে পারে। সেই কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন এই প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং প্রতিরোধ, দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
