কাঠমান্ডু : নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় মধেশ ও কোশী (Hindu-Muslim)প্রদেশে সম্প্রতি হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। একটি সাধারণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু হয়ে এই ঘটনা এখন দেশজুড়ে উত্তেজনা তৈরি করেছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশ বলছেন, নেপাল হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। কোনো কোনো এলাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের আক্রমণাত্মক আচরণের অভিযোগ তুলে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন।
হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হলে দেশব্যাপী শাটডাউনের ডাক দেওয়া হবে। এর মধ্যেই আবার জোরালো হয়ে উঠেছে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার দাবি।২৬ জুলাই সুনসরি জেলার দেওয়ানগঞ্জ গ্রামীণ এলাকার কাপ্তানগঞ্জে বোল বাম যাত্রার সময় এই সংঘাতের সূত্রপাত। হিন্দু ভক্তরা কোশী ব্যারাজ থেকে পবিত্র জল নিয়ে শিব মন্দিরের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল উচ্চস্বরে সংগীত ও ধর্মীয় পতাকা।
আরও দেখুনঃ আরও সংকটে ডলার! রাশিয়া-বাংলাদেশের বাণিজ্যে ব্যবহার হবে ভারতীয় রুপি
স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ কেউ এই উচ্চস্বর ও পতাকা নিয়ে আপত্তি তোলেন। ছোট্ট ঝগড়া দ্রুত পাথর ছোড়াছুড়িতে রূপ নেয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি চালালে দুজন নিহত হন। পরবর্তী দিনগুলোতে সিরাহা, সপ্তরি, ধনুষা জেলায়ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আরেকটি বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে এক কিশোরের মৃত্যু হয়। মোট তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে, আহত হয়েছেন অনেকে।
বেশ কয়েকটি জেলায় কার্ফিউ জারি করা হয়েছে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।স্থানীয় হিন্দু নেতা ও সংগঠনগুলো বলছেন, এই ঘটনা একা নয়। তারা অভিযোগ করেন যে, কিছু মুসলিম গোষ্ঠী হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বারবার বাধা দেয়। নেপালের জনসংখ্যার প্রায় ৮১-৮২ শতাংশ হিন্দু, মুসলিম প্রায় ৫ শতাংশ। কিন্তু দক্ষিণের সীমান্তবর্তী তরাই-মধেশ অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
আরও দেখুনঃ লিয়ারিতে অজ্ঞাতপরিচয় ‘ধুরন্ধরের’ গুলিতে ঝাঁঝরা উজায়ের বালোচের ভাই জুবায়ের
হিন্দু সংগঠকরা বলেন, “আমরা শান্তিতে ধর্ম পালন করতে চাই। কিন্তু যদি হিন্দুদের টার্গেট করা হয়, তাহলে আমরা সারাদেশে প্রতিবাদে নামব।” কিছু জায়গায় “মুসলিম ভাগাও, দেশ বাঁচাও” স্লোগানও শোনা গেছে।অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, তারা সংখ্যালঘু এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা অভিযোগ করেন যে, হিন্দু প্রসেশনে অতিরিক্ত উচ্চস্বর ও উস্কানিমূলক আচরণ হয়।
সম্প্রতি মসজিদে হামলা ও পবিত্র গ্রন্থের অবমাননার ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন। উভয় পক্ষই সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ (বালেন শাহ) জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে শান্তি ও সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকার নিরপেক্ষ তদন্ত করবে এবং দোষীদের শাস্তি দেবে।
রাজনৈতিক দল ও আন্তর্ধর্মীয় সংগঠনগুলোও শান্তির আবেদন জানিয়েছে। তবে এই ঘটনা নেপালের ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।২০০৭-০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর নেপালকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তারপর থেকেই রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি (আরপিপি)সহ কিছু হিন্দু সংগঠন ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের পর এই দাবি আরও জোরালো হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, সীমান্তের ওপারের প্রভাব এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এই উত্তেজনার অন্যতম কারণ।নেপালের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক সাধারণত শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে ছোটখাটো ঘটনা বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক চাপ এসব সংঘাতকে উস্কে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ চান শান্তি। দোকানপাট, যানবাহন বন্ধ, পরীক্ষা স্থগিত এসবের কারণে দৈনন্দিন জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।নেপাল এখন এক সংবেদনশীল মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব হল উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
