ড্রোনের যুগে বদলাচ্ছে Abrams Tank, নতুন M1E3 নিয়ে বড় পরীক্ষা মার্কিন সেনার

প্রায় পাঁচ দশক আগে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যে যুদ্ধক্ষেত্রের কথা মাথায় রেখে আব্রামস ট্যাঙ্ক তৈরি হয়েছিল, সেই যুদ্ধক্ষেত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। সামনে আর শুধু…

m1e3-abrams-tank-us-army-drone-era-modernization

প্রায় পাঁচ দশক আগে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যে যুদ্ধক্ষেত্রের কথা মাথায় রেখে আব্রামস ট্যাঙ্ক তৈরি হয়েছিল, সেই যুদ্ধক্ষেত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। সামনে আর শুধু ভারী সাঁজোয়া ট্যাঙ্কের বহর নয়, রয়েছে ড্রোন, দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র এবং সারাক্ষণ নজরদারি চালানো প্রযুক্তি। এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতেই মার্কিন সেনা তৈরি করছে এম১ই৩ আব্রামস (Abrams Tank)।

Advertisements

এবার নতুন প্রজন্মের এই ট্যাঙ্কের পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে মার্কিন সেনার ১ম ক্যাভালরি ডিভিশন। মার্কিন সেনাবাহিনীর ঘোষণা নিয়ে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় ডিভিশনটি জানিয়েছে, তারা এম১ই৩-এর পাশাপাশি এক্সএম৩০ প্রোটোটাইপও পরীক্ষার জন্য পাবে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতের সাঁজোয়া বাহিনী কীভাবে কাজ করবে, সেই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা এবং মতামত পাওয়ার আশা করছে মার্কিন সেনা।

   

১ম ক্যাভালরি ডিভিশনের হাতে যাবে এম১ই৩

১ম ক্যাভালরি ডিভিশন জানিয়েছে, তারা এম১ই৩ এবং এক্সএম৩০-এর প্রোটোটাইপ পরীক্ষা করবে। পরীক্ষার ফলাফল ও সেনাদের মতামত ভবিষ্যতের সাঁজোয়া যুদ্ধব্যবস্থার পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। ডিভিশনটি জানিয়েছে, নতুন প্রোটোটাইপগুলি পরীক্ষা করার পাশাপাশি সেগুলি সম্পর্কে মতামত দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতের সাঁজোয়া যুদ্ধের কাঠামো তৈরিতে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। অর্থাৎ, এম১ই৩ শুধু একটি নতুন ট্যাঙ্কের পরীক্ষা নয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে মার্কিন সেনার সাঁজোয়া ইউনিট কীভাবে পরিচালিত হবে, তারও একটি ধারণা তৈরি হতে পারে।

ঠান্ডা যুদ্ধের ট্যাঙ্ক থেকে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে

আব্রামস ট্যাঙ্কের জন্ম হয়েছিল ঠান্ডা যুদ্ধের সময়। ইউরোপে সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন ওয়ারশ প্যাক্ট-এর ভারী সাঁজোয়া বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় শক্তিশালী ট্যাঙ্কের প্রয়োজন ছিল। এম১ আব্রামস ১৯৮০ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীতে পরিষেবায় প্রবেশ করে। সেই সময় বড় আকারের প্রচলিত স্থলযুদ্ধ এবং ভারী সাঁজোয়া বাহিনীর সংঘর্ষ ছিল প্রধান চিন্তার বিষয়। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষ করে ইউক্রেনের যুদ্ধে ড্রোন নজরদারি এবং হামলার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ফলে একটি ট্যাঙ্ক বা সাঁজোয়া যান সহজেই শত্রুর নজরে চলে আসতে পারে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিই এম১ই৩-এর নকশাকে প্রভাবিত করছে।

Advertisements

এম১ই৩ শুধু পুরনো আব্রামসের আপগ্রেড নয়

মার্কিন সেনা এম১ই৩-কে শুধু আগের আব্রামসের আরেকটি আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখছে না। বরং নতুন ট্যাঙ্কটির নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল ট্যাঙ্কটির ওজন কমানো এবং সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে এর ওপর চাপ কমানো। একই সঙ্গে নতুন ধরনের সুরক্ষা প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন সেনা এখনও এম১ই৩-এর চূড়ান্ত প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ্যে জানায়নি। তবে কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটিতে স্বয়ংক্রিয় গোলাবারুদ লোডিং ব্যবস্থা বা অটোলোডার, নতুন প্রধান কামান, উন্নত গোলাবারুদ, সক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন-বিরোধী সক্ষমতা থাকার কথা।

ড্রোনের বিরুদ্ধে বাড়বে সুরক্ষা

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাঙ্কের জন্য সবচেয়ে বড় নতুন হুমকিগুলির মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র ড্রোন এবং লোইটারিং মিউনিশন। লোইটারিং মিউনিশন এমন অস্ত্র, যা নির্দিষ্ট এলাকায় অপেক্ষা করতে পারে এবং সুযোগ পেলে লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানতে পারে। ফলে ট্যাঙ্ককে এখন শুধু প্রচলিত অ্যান্টি-আর্মার অস্ত্রের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত রাখলেই হবে না। এম১ই৩-এর জন্য একটি সমন্বিত অ্যাক্টিভ প্রোটেকশন সিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যবস্থা প্রচলিত অ্যান্টি-আর্মার অস্ত্রের পাশাপাশি নতুন ধরনের হুমকি মোকাবিলার লক্ষ্যেও তৈরি করা হচ্ছে। মার্কিন সেনার মতে, ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে এই ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা ট্যাঙ্কের নকশার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বাইরে একের পর এক অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা বসালে ট্যাঙ্কের ওজন বাড়তে থাকে।

তিনজনের ক্রু এবং আনম্যানড টারেট

এম১ই৩-এর নকশায় আরও একটি বড় পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। নতুন ট্যাঙ্কে তিনজনের ক্রু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অটোলোডার ব্যবহারের ফলে ট্যাঙ্কের টারেট বা কামানের অংশে ক্রু সদস্য রাখার প্রয়োজন কমবে। এর পরিবর্তে আনম্যানড টারেট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রু সদস্যদের ট্যাঙ্কের মূল বডির একটি সুরক্ষিত অংশে রাখার কথা। অন্যদিকে টারেটটি ক্রু ছাড়াই পরিচালিত হবে। এই নকশার লক্ষ্য হল ক্রুদের আরও ভালো সুরক্ষা দেওয়া এবং একই সঙ্গে ট্যাঙ্কের সামগ্রিক ওজন কমানো।

হাইব্রিড-ইলেকট্রিক প্রযুক্তির সম্ভাবনা

এম১ই৩-এর ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্র এবং সুরক্ষা নয়, শক্তি ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ট্যাঙ্কটিতে হাইব্রিড-ইলেকট্রিক ড্রাইভ ব্যবহারের কাজ চলছে। এর ফলে জ্বালানি খরচ কমানোর পাশাপাশি ট্যাঙ্কের বিভিন্ন অনবোর্ড ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক শক্তি পাওয়া যেতে পারে। আধুনিক ট্যাঙ্কে সেন্সর, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কম্পিউটিং ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে বৈদ্যুতিক শক্তির চাহিদাও বাড়ছে।

কমানো হবে তাপ ও ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্বাক্ষর

শত্রুর নজরদারি ব্যবস্থার কাছে ট্যাঙ্ককে কম দৃশ্যমান করাও এম১ই৩-এর উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্যাঙ্কটির থার্মাল এবং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিগনেচার কমানোর কাজ চলছে। এর ফলে শত্রুর সেন্সর ও নজরদারি ব্যবস্থার কাছে ট্যাঙ্কের উপস্থিতি শনাক্ত করা আরও কঠিন করার লক্ষ্য রয়েছে। এর পাশাপাশি এম১ই৩-এ উন্নত নেটওয়ার্কিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সক্ষমতা যুক্ত করার কাজও চলছে।

রোবটের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করবে ট্যাঙ্ক?

ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু মানুষ পরিচালিত ট্যাঙ্ক নয়, রোবোটিক সামরিক যানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এম১ই৩-এর নকশাতেও সেই সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ট্যাঙ্কটি রোবোটিক সামরিক যানগুলির সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা পেতে পারে। এর অর্থ, একটি সাঁজোয়া ইউনিটে মানুষের পরিচালিত ট্যাঙ্কের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় বা দূরনিয়ন্ত্রিত যান ব্যবহার করে নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য সামরিক কাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা

এম১ই৩-এর উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার দেখিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে একটি ভারী সাঁজোয়া যান দীর্ঘ সময় ধরে অদৃশ্য থেকে চলাচল করতে পারে না। ড্রোন নজরদারি, দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র এবং ক্রমাগত নজরদারির কারণে ট্যাঙ্কের টিকে থাকার কৌশলও বদলাতে হচ্ছে। তাই নতুন এম১ই৩-এ একদিকে ওজন কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ানো হচ্ছে সুরক্ষা, নেটওয়ার্কিং এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষমতা।

আব্রামসের নতুন অধ্যায়

এম১ আব্রামস যখন ১৯৮০ সালে মার্কিন সেনায় প্রবেশ করেছিল, তখন এর সামনে ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের ভারী সাঁজোয়া বাহিনী। প্রায় পাঁচ দশক পরে এম১ই৩-এর সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র। এখন ট্যাঙ্ককে একই সঙ্গে ড্রোন, লোইটারিং মিউনিশন, নির্ভুল দূরপাল্লার অস্ত্র এবং উন্নত নজরদারি ব্যবস্থার মোকাবিলা করতে হবে। এই কারণেই এম১ই৩-এর পরীক্ষাকে শুধু একটি নতুন ট্যাঙ্কের পরীক্ষা হিসেবে দেখছে না মার্কিন সেনা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের সাঁজোয়া যুদ্ধের জন্য কী ধরনের যান, সুরক্ষা ব্যবস্থা, অস্ত্র, সেন্সর এবং নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি প্রয়োজন, তারও বাস্তব পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। ঠান্ডা যুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য তৈরি আব্রামস এখন ড্রোনের যুগে প্রবেশ করছে। এম১ই৩ সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯

আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ

আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন

Advertisements