তেহেরান: হরমুজ প্রণালী (Strait Of Hormuz) দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা এখনও চলছে বলে জানিয়েছে ইরান। বুধবার এক ইরানি শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই দেশ প্রণালী পরিচালনা এবং রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিলেও এখনও কোনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি দাবি করেছিল, হরমুজ প্রণালীর জলসীমা এবং সেখান থেকে পাওয়া রাজস্ব কীভাবে ভাগ হবে, সে বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছেছে।
ইরানের ওই শীর্ষ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কোনও চূড়ান্ত চুক্তি এখনও স্বাক্ষরিত হয়নি। তবে সমঝোতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়ার জন্য এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মীমাংসা করা বাকি।
এর আগে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি জানিয়েছিলেন, ইরান ও ওমান প্রায় এক মাস ধরে আলোচনা করছে। তাঁর দাবি, হরমুজ প্রণালীর জলসীমায় দুই দেশের অংশ এবং সেখান থেকে পাওয়া রাজস্বের ভাগ নিয়ে দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সমঝোতায় পৌঁছনো গেছে।
তবে ঠিক কোন পর্যায়ে এই সমঝোতা হয়েছে, তা তখন স্পষ্ট ছিল না। ইরান চলতি মাসের শুরুতেই জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালী নিয়ে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
মঙ্গলবার ইরান ও ওমানের মধ্যে বৈঠকের পর ওমানের বিদেশমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি জানিয়েছিলেন, খুব শিগগির হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি অস্থায়ী নৌপথ এবং নিরাপদ জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার বাস্তব ব্যবস্থা ঘোষণা করা যাবে বলে তিনি আশাবাদী। দুই দেশের আলোচনায় একটি যৌথ অস্থায়ী নেভিগেশন করিডর তৈরি এবং প্রণালী থেকে মাইন সরানোর বিষয়ও উঠে এসেছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যেত। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যায়।
ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে বড় ওঠানামা দেখা দিয়েছে। বুধবার ইরান ও ওমানের আলোচনায় অগ্রগতির খবর সামনে আসার পর অপরিশোধিত তেলের দামও কমেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৬.৮০ ডলারে নেমেছিল।
তবে ইরান জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হলেও আমেরিকার সঙ্গে আলাদা বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলবে না। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, জুনে হওয়া একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে আমেরিকার কিছু শর্ত পূরণ করার কথা ছিল। সেই চুক্তি পরে ভেঙে যায়।
ইরানের দাবি করা শর্তগুলির মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলির উপর আমেরিকার অবরোধ তুলে নেওয়া, ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, আমেরিকা যদি বাধা দেওয়া বন্ধ করে এবং আগের সমঝোতায় ফিরে আসে, তাহলে সেই কাঠামোর মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া সম্ভব। অন্যথায় প্রণালী খোলা হবে না বলেও তিনি দাবি করেছেন।
আমেরিকা অবশ্য হরমুজ নিয়ে ইরানের অবস্থানের বিরোধিতা করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমার হরমুজ অংশে থাকা মাইনগুলি সরিয়ে দেওয়া বা বিস্ফোরিত করা হয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করেছেন, কেউ নতুন করে মাইন পেতে গেলে তা ধ্বংস করা হবে।
এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। গত সপ্তাহে রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করেছিল। স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত কম।
ইরান সম্প্রতি ৪৫টি ট্যাঙ্কারকে কালো তালিকাভুক্তও করেছে। দেশটির অভিযোগ, এই জাহাজগুলি হরমুজ প্রণালীর নির্দিষ্ট নিয়ম ভেঙেছে। কালো তালিকায় থাকা জাহাজগুলির বিরুদ্ধে জরিমানা, আটক এবং পণ্য বাজেয়াপ্ত করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে ইরান।
ইরানের এই পদক্ষেপের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলির তেল পরিবহন ব্যবস্থার উপরও চাপ বাড়ছে। কিছু সংস্থা কালো তালিকাভুক্ত জাহাজ ব্যবহার বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে আমেরিকা ইরানের অর্থনীতির উপর চাপ বাড়াতে আরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে নতুন করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবিলম্বে কার্যকর করা হবে না বলেও জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
এই পরিস্থিতিতে ইরান আমেরিকার অর্থনৈতিক চাপকে নিজেদের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছে। তেহরানের বক্তব্য, বহু দেশ আমেরিকার চাপের সঙ্গে যুক্ত হবে না।
এদিকে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধের তীব্রতা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে কিছুটা কমলেও স্থায়ী শান্তিচুক্তির বিষয়ে কূটনৈতিক আলোচনা এখনও অচলাবস্থায় রয়েছে। জাহাজগুলির উপর হামলার আশঙ্কা থাকায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনও ঝুঁকিপূর্ণ।
আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্র দেশগুলিকে জানিয়েছেন, আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনও হামলা চালানোর পরিকল্পনা নেই। বরং ওয়াশিংটন অন্য ধরনের চাপের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে বলে অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
তবে যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যেই ব্যাপক। সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইরান ও লেবাননে। আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান পরিস্থিতি অবশ্য এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্থায়ী নৌপথ চালু হলে অন্তত কিছু বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল শুরু হতে পারে এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু প্রণালী পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে হলে ইরান-ওমান সমঝোতার পাশাপাশি ইরান ও আমেরিকার মধ্যে থাকা বড় রাজনৈতিক বিরোধেরও সমাধান প্রয়োজন হবে।
