আয়ারল্যান্ডে বাড়ছে ভারতীয় বিদ্বেষ, সতর্কতা জারি দূতাবাসের

আয়ারল্যান্ডে ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বর্ণ বিদ্বেষী (Indian Embassy)হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় দূতাবাস একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পরামর্শ জারি করেছে। দূতাবাস ভারতীয় নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার…

Indian Embassy advisory for ireland racism

আয়ারল্যান্ডে ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বর্ণ বিদ্বেষী (Indian Embassy)হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় দূতাবাস একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পরামর্শ জারি করেছে। দূতাবাস ভারতীয় নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য ‘যুক্তিসঙ্গত সতর্কতা’ অবলম্বন করতে এবং বিশেষ করে অসময়ে নির্জন এলাকায় যাওয়া এড়াতে পরামর্শ দিয়েছে।

Advertisements

এই পরামর্শ এমন সময়ে এসেছে যখন ডাবলিনে ভারতীয় সম্প্রদায়ের উপর বেশ কয়েকটি হিংসাত্মক হামলার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, যা এই দেশে বসবাসকারী এক লক্ষ ভারতীয় অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও ভয়ের সঞ্চার করেছে। দূতাবাস জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য একটি হেল্পলাইন নম্বর (০৮৯৯৪২৩৭৩৪) এবং ইমেল ঠিকানা ([email protected]) প্রকাশ করেছে।

   

গত ১৯ জুলাই ডাবলিনের তাল্লাঘ্ট এলাকার পার্কহিল রোডে একজন ৪০ বছর বয়সী ভারতীয় পুরুষের উপর নৃশংস হামলার ঘটনা এই পরামর্শের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ। স্থানীয়রা এই হামলাকে ‘অর্থহীন বর্ণবাদী হিংসা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ওই ব্যক্তি, যিনি তিন সপ্তাহ আগে অ্যামাজনের একটি টেক পদে কাজের জন্য আয়ারল্যান্ডে এসেছিলেন, তাঁকে একদল কিশোর-কিশোরী মারধর করে, মুখে ছুরিকাঘাত করে এবং আংশিকভাবে পোশাক খুলে ফেলে।

তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছিল, এবং এক ঘণ্টারও বেশি সময় পর জরুরি পরিষেবা তাঁকে উদ্ধার করে। জেনিফার মারে নামে একজন আইরিশ মহিলা, যিনি ভুক্তভোগীকে সাহায্য করেছিলেন, জানিয়েছেন, গত চার দিনে তাল্লাঘ্টে অন্তত চারজন ভারতীয় পুরুষ এবং আরেকজন ব্যক্তি এই ধরনের হামলার শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, “এই কিশোর গ্যাংটি ভারতীয়দের মুখে ছুরিকাঘাত করছে। এই ঘটনাগুলো কতজন জানেন বা সংবাদে দেখেছেন?”

Advertisements

এছাড়া, ৩১ জুলাই আরেকটি হামলার ঘটনায় ৩২ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা ও এআই বিশেষজ্ঞ ড. সন্তোষ যাদব ডাবলিনের ক্লন্ডালকিন ট্রেন স্টেশনের কাছে ছয়জন কিশোরের দ্বারা আক্রান্ত হন। তিনি লিঙ্কডইনে তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “রাতের খাবারের পর আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টের কাছে হাঁটছিলাম, তখন ছয়জন কিশোর পেছন থেকে আমার উপর হামলা করে।

তারা আমার চশমা ছিনিয়ে ভেঙে ফেলে এবং মাথা, মুখ, ঘাড়, বুক, হাত ও পায়ে নির্দয়ভাবে প্রহার করে। আমি রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলাম।” তিনি জানান, তাঁর গালের হাড় ভেঙে গেছে এবং তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য সেন্ট জেমস হাসপাতালে রয়েছেন। সন্তোষ আরও বলেন, “এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

ডাবলিনে ভারতীয় পুরুষ ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের উপর বর্ণবাদী হামলা বাড়ছে—বাসে, আবাসিক এলাকায় এবং পাবলিক রাস্তায়।” তিনি আইরিশ পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে বলেন, হামলাকারীরা মুক্তভাবে ঘুরছে এবং আরও হামলার জন্য উৎসাহিত হচ্ছে।

আয়ারল্যান্ডে ভারতীয়রা দেশটির বৃহত্তম অ-ইইউ অভিবাসী সম্প্রদায়, যার সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ। তারা আইটি, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। তবে, সাম্প্রতিক বর্ণবাদী হামলার ঘটনাগুলো এই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে।

ইমিগ্রান্ট কাউন্সিল অফ আয়ারল্যান্ডের সিইও টেরেসা বুচকোভস্কা বলেন, “ভারতীয় সম্প্রদায় বর্তমানে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে, তবে এই হামলাগুলো শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশের প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং পুরোনো প্রক্রিয়ার কারণে ঘৃণামূলক অপরাধের রিপোর্টিং কঠিন হয়ে পড়েছে।”

এই ঘটনাগুলোর প্রতিবাদে ডাবলিনে ব্যাপক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। ২৫ জুলাই তাল্লাঘ্টে ‘ইউনাইটেড এগেইনস্ট রেসিজম’ এবং ‘ডাবলিন সাউথ ওয়েস্ট টুগেদার’ সংগঠনের উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

শুক্র ও শনিবার ডাবলিন সিটি হল থেকে ন্যাশনাল গ্যালারি পর্যন্ত প্রায় ৮০০ জন ভারতীয়, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি এবং আইরিশ নাগরিক ‘সে নো টু রেসিজম’ এবং ‘আয়ারল্যান্ড ইজ হোম’ স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল করেন। একটি অনলাইন পিটিশনে ১৫,০০০-এর বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে।

আয়ারল্যান্ডের পুলিশ বাহিনী, আন গার্দা শিওচানা, তাল্লাঘ্টের হামলাকে বর্ণবাদী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে এবং তদন্ত শুরু করেছে। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত অখিলেশ মিশ্র ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেন, “এই হামলাগুলো আয়ারল্যান্ডের সহিষ্ণুতা ও ন্যায়বিচারের ঐতিহ্যের পরিপন্থী।” তিনি দূতাবাসের তরফে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

পুরনো কর ছাড় শেষের পথে! FY26 থেকে ১২ লক্ষ আয়কারীদের জন্য বড় পরিবর্তন

এই ঘটনাগুলো আয়ারল্যান্ডে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনকে আরও জোরদার করেছে। স্থানীয় কাউন্সিলর বেবি পেরেপ্পাডান বলেন, “ভারতীয়রা আয়ারল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা নিয়ে আসছেন। এই ধরনের হামলা তাদের অবদানকে অসম্মান করে।” ভারতীয় সম্প্রদায় এখন নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের জন্য জোরালো দাবি তুলছে, এবং এই ঘটনাগুলো ভারত ও আয়ারল্যান্ডের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

Advertisements