বেঙ্গালুরু: ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি (IT) শিল্পে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা Google এবং HCLTech-এর গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা চুক্তির পরিধি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থা। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বার্ষিক প্রায় ২০ কোটি ডলারের এই চুক্তি থেকে প্রায় ৫ কোটি ডলারের কাজ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রায় ১,০০০ HCLTech কর্মী প্রভাবিত হতে পারেন। যদিও তাঁদের অন্য প্রকল্পে স্থানান্তর (Redeployment) করা হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত আবারও দেখিয়ে দিল যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং অটোমেশন কীভাবে ঐতিহ্যগত আইটি পরিষেবা শিল্পের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।
সূত্রের খবর, গত ১০ বছর ধরে Google-এর জন্য অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট এবং ইঞ্জিনিয়ারিং-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা দিয়ে আসছে HCLTech। এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সংস্থার অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হতো।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন সিদ্ধান্তে বার্ষিক প্রকল্পের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাজ কমানো হচ্ছে। যদিও HCLTech-এর মোট বার্ষিক আয় প্রায় ১৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তাই এই কাটছাঁট সংস্থার মোট আয়ের মাত্র ০.৩ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবর্ষের (FY26) অতিরিক্ত আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর প্রভাব প্রায় ৬ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বিষয়ে HCLTech-এর মুখপাত্র কোনও নির্দিষ্ট গ্রাহকের চুক্তি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে, Google-ও এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় সংস্থা খরচ কমাতে, ভেন্ডর সংখ্যা সীমিত করতে এবং AI-ভিত্তিক সফটওয়্যার অটোমেশন বাড়াতে জোর দিচ্ছে। আগে যে ধরনের সফটওয়্যার উন্নয়ন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বাইরের আইটি পরিষেবা সংস্থাকে দেওয়া হতো, তার বড় অংশ এখন AI-এর সাহায্যে দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও বহু সংস্থা প্রযুক্তি খাতে ব্যয় পুনর্বিবেচনা করছে বলে শিল্প বিশেষজ্ঞদের মত।
HCLTech-এর প্রথম ত্রৈমাসিক ফল প্রকাশের সময় সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সি. বিজয়কুমার এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, AI-নির্ভর এবং AI-সমৃদ্ধ পরিষেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে AI-এর কারণে ঐতিহ্যগত এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আইটি পরিষেবার কাজ ক্রমশ কমে যাচ্ছে, কারণ অটোমেশন সেই কাজের বড় অংশ সামলে নিচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আগের কয়েকটি ত্রৈমাসিকে যে কিছু গ্রাহক-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলির প্রভাব এখনও কিছুটা থাকবে।
তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও HCLTech তাদের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের আয় বৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখেছে। সংস্থার আশা, মোট রাজস্ব ১ থেকে ৪ শতাংশ এবং পরিষেবা খাতের রাজস্ব ১.৫ থেকে ৪.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফল অনুযায়ী, HCLTech-এর প্রথম ত্রৈমাসিকে স্থির মুদ্রামানে (Constant Currency) আয় ছিল ৩.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ০.৫ শতাংশ কম, তবে এক বছর আগের তুলনায় ২.৬ শতাংশ বেশি। ভারতীয় মুদ্রায় সংস্থার আয় ১২ শতাংশ বেড়ে ৩৪,৫৭৯ কোটি টাকা হয়েছে এবং আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ১.৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংস্থার দাবি, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে গ্রাহকদের যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার ফলেই স্থির মুদ্রামানে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সামান্য আয় কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, Google-এর এই সিদ্ধান্ত ভারতের আইটি শিল্পে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। AI-ভিত্তিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে ভবিষ্যতে সফটওয়্যার পরিষেবা সংস্থাগুলিকে আরও বেশি উচ্চমূল্যের, AI-কেন্দ্রিক এবং উদ্ভাবনী পরিষেবার দিকে ঝুঁকতে হবে। একই সঙ্গে বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির মধ্যে ভেন্ডর একত্রীকরণ (Vendor Consolidation) এবং অটোমেশনের প্রবণতাও আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে।
