ময়দান থেকে লালবাজার, শান্তনু সিনহা বিশ্বাসকে ঘিরে প্রশ্নের মুখে CAB

ইডি হেফাজতে শান্তনু সিনহা বিশ্বাস। প্রশাসনিক প্রভাব, রিয়েল এস্টেট দুর্নীতি ও CAB নির্বাচনে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ ঘিরে ময়দানে অস্বস্তি।

shantanu-sinha-biswas-ed-custody-cab-controversy

বিট্টু দত্ত, কলকাতা: অনাচার করলে গদি ছাড়তে হয়, সত্যজিৎ রায়ের Hirak Rajar Deshe ছবির সেই মাস্টারমশাইয়ের সংলাপ যেন ফের বাস্তব হয়ে উঠছে বাংলার প্রশাসনিক ও ক্রীড়া মহলে। রাজ্যের এক সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী পুলিশ অফিসার শান্তনু সিনহা বিশ্বাস এখন ইডির হেফাজতে। যাঁকে নিয়ে একসময় প্রশাসনের অন্দরমহলে চাপা ফিসফাস চলত, আজ তাঁর নাম ঘিরেই উঠছে দুর্নীতি, ভয় দেখানো এবং প্রভাব খাটানোর একের পর এক অভিযোগ।

Advertisements

একজন ওসি থেকে উঠে এসে ডেপুটি কমিশনার পদে পৌঁছনো শান্তনুর উত্থান নিয়ে বরাবরই নানা আলোচনা ছিল। অভিযোগ, ক্ষমতাবান মহলের ঘনিষ্ঠতা এবং প্রভাবশালীদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের জেরেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গ পুলিশের অলিখিত “বেতাজ বাদশা”। পুলিশের নিয়োগ, বদলি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক নানা সিদ্ধান্তে তাঁর অঘোষিত প্রভাব ছিল বলেই অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন মহলে।

   

ইডির দাবি আরও গুরুতর। তদন্তকারীদের অভিযোগ, ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের জমি দখল, প্রোমোটারদের সঙ্গে যোগসাজশ এবং অপরাধ জগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে একটি বিশাল রিয়েল এস্টেট দুর্নীতি চক্র চালাতেন শান্তনু। অভিযুক্ত সোনা পাপ্পু ও জয় কামদারের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মে তাঁর যোগের অভিযোগও সামনে এসেছে। রাজনৈতিক মহলেও এই নাম নতুন নয়।

প্রায় এক বছর আগে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা Suvendu Adhikari প্রকাশ্য সভায় শান্তনুকে “ডাকাত” বলে আক্রমণ করেছিলেন। সেই সময় তাঁর মন্তব্য ঘিরে তুমুল বিতর্ক তৈরি হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বক্তব্য ফের নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে প্রশাসনের বাইরেও শান্তনুর প্রভাব যে বিস্তৃত হয়েছিল, তা এখন স্পষ্ট হচ্ছে ময়দানের অন্দরেও। রাজ্য ক্রিকেট নিয়ামক সংস্থা Cricket Association of Bengal-এর নির্বাচনের আগে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্যালকাটা পুলিশ ক্লাবের প্রতিনিধি হিসেবে CAB-এ প্রবেশের পর বিভিন্ন ক্লাব কর্তাদের উপর চাপ সৃষ্টি, ভয় দেখানো এবং ভোট রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে ময়দানের একাংশের মুখে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

Advertisements

ময়দানের কয়েকজন কর্তা দাবি করেছেন, নির্বাচনের আগে প্রথমে নরমভাবে এবং পরে সরাসরি হুমকির পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকাশ্যে কেউই মুখ খুলতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, “সময়ই সব বলবে।” এই নীরবতাই আরও প্রশ্ন তুলছে,  ভয় কি এখনও কাটেনি?শান্তনুর সঙ্গে CAB-এর সম্পর্ক নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জানা গিয়েছে, তাঁর নামে আইপিএলের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ইস্যু করা হয়েছিল। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে লুক আউট নোটিস জারি হওয়ার পরও সেই কার্ড বহাল ছিল বলেও অভিযোগ। গ্রেফতারের পর অবশ্য দ্রুত পদক্ষেপ করেছে সংশ্লিষ্ট মহল। ক্যালকাটা পুলিশ ক্লাব তাঁকে কার্যত নির্বাসনে পাঠিয়েছে এবং CAB-কে জানিয়েছে নতুন প্রতিনিধি পাঠানোর কথা। CAB-ও তাঁর নামে আর কোনও টিকিট বা সুবিধা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি লালবাজার তাঁর ডেপুটি কমিশনার পদের এক্সটেনশন বাতিল করেছে।

এই ঘটনায় CAB-এর ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই সচিব বাবলু কোলে বলেন, ক্লাব কাকে প্রতিনিধি করবে, তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব বিষয়। সংস্থার পক্ষে প্রত্যেক প্রতিনিধির অতীত খতিয়ে দেখা সম্ভব নয়। একই সুর শোনা গিয়েছে ট্রেজারার সঞ্জয় দাসের গলাতেও। তাঁর দাবি, শান্তনুকে তিনি শুধুমাত্র ক্লাব প্রতিনিধি হিসেবেই চিনতেন। কারও ব্যক্তিগত অতীত বা গোপন কার্যকলাপ জানা সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ময়দানের অন্দরে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে— সত্যিই কি ক্রিকেট প্রশাসনের ভেতরেও ভয় ও চাপের সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছিল? নাকি গ্রেফতারের পর সব অভিযোগই এখন নতুন রং পাচ্ছে? উত্তর সময়ই দেবে। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট, শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের পতন শুধু প্রশাসনিক মহল নয়, বাংলার ক্রীড়াজগতেও বড়সড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Advertisements