কলকাতার রবীন্দ্র সরোবরে (Rabindra Sarobar) পাখিদের প্রজননস্থল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা কেএমডিএ। সরোবর চত্বরে থাকা পদ্মপুকুরের অস্বাভাবিক সময়ে শুরু হওয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। জলচর পাখিদের প্রজনন মরশুমে জলজ উদ্ভিদ পরিষ্কার করলে তাদের বাসা ও ছানাদের ক্ষতি হতে পারে বলে পাখিপ্রেমীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
এই বিষয়টি সামনে আসার পর পাখিপ্রেমীদের উদ্বেগের কথা গুরুত্ব দিয়ে দেখে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার সকালে পদ্মপুকুরে ছানাসহ ব্রোঞ্জ-উইংড জাকানা এবং হোয়াইট-ব্রেস্টেড মুরহেনের দেখা মেলায় পাখিপ্রেমীদের আশঙ্কাও আরও জোরালো হয়।
ছানাসহ দেখা গেল ব্রোঞ্জ-উইংড জাকানা
পদ্মপুকুর পরিষ্কারের কাজ গত শনিবার শুরু হয়েছিল। জলাশয়ের জলজ উদ্ভিদ এবং অন্যান্য গাছপালা সরানোর কাজ শুরু হতেই পাখিপ্রেমীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এই জলজ উদ্ভিদই বর্তমানে একাধিক প্রজাতির জলচর পাখির বাসা তৈরি এবং খাবার সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
যে সময়ে পাখিরা ডিম পাড়ছে এবং ছানাদের বড় করে তুলছে, সেই সময়ে জলজ উদ্ভিদ সরিয়ে দিলে সরাসরি তাদের প্রজননস্থল নষ্ট হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে পাখিপ্রেমীরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মঙ্গলবার সকালে পদ্মপুকুরে ব্রোঞ্জ-উইংড জাকানাকে ছানাদের সঙ্গে খাবার খুঁজতে দেখা যায়। একইসঙ্গে একটি হোয়াইট-ব্রেস্টেড মুরহেনও সেখানে ছিল। ফলে জলাশয়টি যে বর্তমানে প্রজননরত জলচর পাখিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
পাখিপ্রেমী নন্দিতা সরকার প্রথম বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছিলেন। পরিষ্কার করার কাজ বন্ধ হওয়ায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এখন জলচর পাখিরা তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশে তাদের ছানাদের বড় করতে পারবে।
তিনি বলেন, মানুষের পাশাপাশি পাখি এবং অন্যান্য জীবের জন্যও পরিবেশের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। মঙ্গলবার সকালে ছানাদের সঙ্গে ব্রোঞ্জ-উইংড জাকানাকে খাবার সংগ্রহ করতে দেখেছেন বলেও জানান তিনি।
পূর্ব প্রান্তের কিছু অংশ ইতিমধ্যেই পরিষ্কার
রবীন্দ্র সরোবরের কর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কাজ বন্ধ করার নির্দেশ আসার আগে পদ্মপুকুরের পূর্ব প্রান্তের জলের কাছাকাছি একটি অংশ ইতিমধ্যেই পরিষ্কার করা হয়েছিল। পরে পাখিপ্রেমীদের উদ্বেগের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর বাকি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাখিপ্রেমীদের বক্তব্য, পদ্মপুকুরের জলজ গাছপালা শুধুমাত্র পাখিদের বাসা তৈরির জায়গা নয়। এই উদ্ভিদের মধ্যে শৈবাল, ছোট জলজ পোকামাকড় এবং ছোট মাছও থাকে। ফলে জলাশয়ের খাদ্যশৃঙ্খলেও এই গাছপালার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
‘যা আগাছা মনে হয়, সেটিই পাখির বাসা’
পাখিপ্রেমী অবিজিৎ দত্ত বলেন, পদ্মপুকুরের জলজ উদ্ভিদ জলচর পাখিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলির সাহায্যে পাখিরা বাসা তৈরি করে এবং ছানাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাবারও খুঁজে পায়। তাঁর মতে, পদ্মপুকুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল। এখানে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপস্থিতি রয়েছে। জলজ উদ্ভিদ সরিয়ে দিলে শুধু পাখির বাসাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, জলাশয়ের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে রবীন্দ্র সরোবরে পাখির ছবি তোলা প্রবীণ পাখিপ্রেমী সুদীপ ঘোষও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে আরও সংবেদনশীলভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, জলাশয়ের রক্ষণাবেক্ষণের সময় সেখানে থাকা প্রাণী ও পাখিদের প্রজননচক্রও মাথায় রাখা জরুরি।
আরেক পাখিপ্রেমী নির্বাণ জৈনও কেএমডিএ-র সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পাখি দেখা এবং ছবি তোলার সময় তিনি বহুবার দেখেছেন, জলজ উদ্ভিদ পাখিদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, মানুষের চোখে কোনও গাছপালা অনেক সময় আগাছা মনে হতে পারে। কিন্তু সেটিই হয়তো কোনও পাখির বাসা বা খাবার সংগ্রহের জায়গা। তবে প্লাস্টিক এবং আবর্জনা অবশ্যই পরিষ্কার করা দরকার। সেই কাজ এমনভাবে এবং এমন সময়ে করা উচিত, যাতে পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর উপর সবচেয়ে কম প্রভাব পড়ে।
রবীন্দ্র সরোবরের পদ্মপুকুরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ আপাতত বন্ধ হওয়ায় সেখানে প্রজননরত জলচর পাখি ও তাদের ছানারা কিছুটা নিরাপদ পরিবেশ পেয়েছে। আগামী দিনে সরোবরের রক্ষণাবেক্ষণের সময় পাখিদের প্রজনন মরশুম এবং জলাশয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, এখন সেটিই নজরে থাকবে।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories — On Kolkata24x7 Business.
