পুরনো পোস্ট মুছতে হবে! পার্নোর ফুলবদলে ক্ষুব্ধ তৃণমূলের বড় অংশ

পদ্ম ছেড়ে ঘাসফুলের পতাকাতলে অভিনেত্রী পার্নো মিত্র (Parno Mitra)। তাঁর এই “ফুলবদল” ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে যেমন চর্চা তুঙ্গে, তেমনই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেও তৈরি হয়েছে চাপা…

পদ্ম ছেড়ে ঘাসফুলের পতাকাতলে অভিনেত্রী পার্নো মিত্র (Parno Mitra)। তাঁর এই “ফুলবদল” ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে যেমন চর্চা তুঙ্গে, তেমনই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেও তৈরি হয়েছে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ। প্রকাশ্যে কেউ খুব একটা মুখ না খুললেও, দলের অন্দরের বড় অংশ যে এই যোগদানে বিরক্ত, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে কর্মীদের কথাবার্তা ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিক্রিয়ায়। অনেকেই কটাক্ষ করে বলছেন, “এবার পুরনো পোস্ট ডিলিট করতে হবে।”

Advertisements

রাজনীতিতে দলবদল নতুন নয়। বিশেষ করে ভোটের আগে তারকা মুখদের এদল-ওদল হওয়া বাংলার রাজনীতিতে বহুবার দেখা গেছে। কিন্তু পার্নো মিত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, কারণ ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি ছিলেন বিজেপির প্রার্থী। সেই সময়ে তৃণমূলের কর্মী ও সমর্থকদের বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় পার্নোর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণে নেমেছিলেন। ব্যক্তিগত কটাক্ষ, ব্যঙ্গ, এমনকি অভিনেত্রীর ছবি ব্যবহার করেও কটূক্তি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এখন সেই একই পার্নো তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় অনেক কর্মীর মনে প্রশ্ন—তাহলে এতদিনের লড়াই, পোস্ট, আক্রমণ সবই কি অর্থহীন ছিল?

   

তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের বহু কর্মী আক্ষেপ করে বলছেন, “এদের মতো লোকদের নেওয়া হয়, আর ওরাই দল ছেড়ে যাওয়ার সময় বদনাম করে যায়। শেষ পর্যন্ত মাঠে নেমে পরিস্থিতি সামলাতে হয় আমাদের মতো সাধারণ কর্মীদের।” কারও বক্তব্য আরও কড়া, “কাল পর্যন্ত যাকে নিয়ে পোস্ট করেছি, আজ তাকেই ফুল দিয়ে বরণ করতে হবে—এটা খুব অপমানজনক।” এই ক্ষোভ শুধু গোপনে নয়, অনেক ক্ষেত্রে ঘরোয়া আড্ডা থেকে শুরু করে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও প্রকাশ পাচ্ছে।

অনেকেই বিদ্রুপ করে বলছেন, “এবার একুশের মঞ্চে উঠে সেলফি তুলবে, পোস্ট দেবে—আর আমরা হাততালি দেব।” দলের ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠছে, পার্নো মিত্রকে নেওয়ার বাস্তব রাজনৈতিক লাভ কী? কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, “একে নেবার যুক্তিটা কী? দল বা সংগঠনের কাজে কী অবদান রাখবে? শুধু ভিড় বাড়ানোই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা কর্মীদের মূল্য কোথায়?”

Advertisements

তবে বাস্তব রাজনীতিতে তারকা মানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। পার্নো মিত্র জনপ্রিয় অভিনেত্রী, তাঁর পরিচিতি রয়েছে শহরের মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তৃণমূল নেতৃত্ব এই হিসাব করেই তাঁকে দলে নিয়েছে। মঞ্চে পার্নো থাকলে ভিড় হবে, ক্যামেরা থাকবে, সংবাদমাধ্যমে প্রচার বাড়বে। গ্ল্যামারের জোরে কর্মসূচিতে আলাদা আকর্ষণ তৈরি হবে—এই অঙ্কেই শীর্ষ নেতৃত্ব সবুজ সংকেত দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

দলীয় সূত্রে শোনা যাচ্ছে, উত্তর কলকাতার কোনও একটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ভবিষ্যতে পার্নো মিত্রকে প্রার্থী করার ভাবনাও নাকি রয়েছে। এই সম্ভাবনাই ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে তৃণমূলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে। তাঁদের প্রশ্ন, “ভালো ছেলে-মেয়েরা রাজনীতিতে আসে না বলে সবাই আফসোস করে। কিন্তু প্রার্থী বাছাইয়ের সময় যদি দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে আদর্শবাদী, শিক্ষিত, মাঠে কাজ করা লোকজন কেন রাজনীতিতে আসবে?”

তবে সব বিরোধিতার মাঝেও দলের একাংশ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে শিরোধার্য বলেই মেনে নিতে চাইছেন। তাঁদের বক্তব্য, “দিদি বা অভিষেক দা-র থেকে বড় বোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই। সিদ্ধান্ত যখন ওঁরাই নিয়েছেন, তখন তার পিছনে নিশ্চয়ই রাজনৈতিক হিসাব আছে।” কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলছেন, “আজ পার্নো, কাল দেবলীনা, তারপর উষশী—সবাই লাইনে আছে। দল জানে কাকে কোথায় ব্যবহার করতে হবে।”

সব মিলিয়ে পার্নো মিত্রের তৃণমূলে যোগদান শুধুমাত্র একটি দলবদলের ঘটনা নয়, বরং তা আবারও সামনে এনে দিয়েছে তারকা-নির্ভর রাজনীতি বনাম সংগঠন-নির্ভর রাজনীতির পুরনো বিতর্ক। একদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশলী সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে মাঠের কর্মীদের জমে থাকা অভিমান—এই টানাপোড়েনের মধ্যেই আপাতত ঘাসফুল শিবিরে চলছে ‘পুরনো পোস্ট মুছতে হবে’ বিতর্ক। আগামী দিনে এই ক্ষোভ কতটা প্রশমিত হয়, না কি আরও চওড়া হয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।

Advertisements