কলকাতা: ভ্রমণের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। শুধু দর্শনীয় স্থান ঘোরা নয়, এখন পর্যটকদের বড় অংশই খুঁজছেন কোনও গন্তব্যের সংস্কৃতি, উৎসব, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় জীবনযাত্রার কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ। বিশ্বখ্যাত ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম স্কাইস্ক্যানার (Skyscanner) প্রকাশিত ‘দ্য ইন্ডিয়া কালচার ট্রাভেল ইনডেক্স’-এ উঠে এসেছে, ভ্রমণকারীদের কাছে কলকাতার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক পরিচয় এখন দুর্গাপূজা ও উৎসব-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি।
সমীক্ষা অনুযায়ী, কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে ৬৯ শতাংশ ভ্রমণকারী দুর্গাপূজা ও উৎসবমুখর পরিবেশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এরপর রয়েছে বাঙালি খাবার ও মিষ্টি (৫৩ শতাংশ) এবং দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট ও বেলুড় মঠের মতো আধ্যাত্মিক স্থান (৫২ শতাংশ)। অর্থাৎ, কলকাতার পরিচয় এখন শুধু ঐতিহাসিক স্থাপত্য বা পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শহরের জীবন্ত সংস্কৃতিই পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠছে।
সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, কলকাতার ৪৭ শতাংশ ভ্রমণকারী এখন মূলত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। অন্যদিকে ৭৬ শতাংশ জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে সংস্কৃতি-কেন্দ্রিক ভ্রমণের প্রতি তাঁদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আরও ৩৯ শতাংশ মনে করেন, ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য অন্য কিছু হলেও স্থানীয় সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা তাঁদের সফরকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।

স্কাইস্ক্যানার ইন্ডিয়ার ট্রাভেল ট্রেন্ডস অ্যান্ড ডেস্টিনেশনস বিশেষজ্ঞ নীল ঘোষ বলেন, কলকাতায় সংস্কৃতি এখন আর ভ্রমণের একটি অংশ নয়, বরং অনেকের কাছে সেটাই ভ্রমণের মূল কারণ। তাঁর কথায়, “উৎসব, ইতিহাস এবং ঐতিহ্য এই শহরের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাই ভ্রমণকারীরা কলকাতাকে উৎসবের শহর হিসেবে দেখবেন, সেটাই স্বাভাবিক।”
সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, কলকাতার ৯৬ শতাংশ ভ্রমণকারী সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার জন্য পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও ভ্রমণ করেছেন। আবার প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই দেশের অন্য রাজ্য বা কম পরিচিত গন্তব্যে গিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতির স্বাদ নিতে আগ্রহী। এই প্রবণতার পিছনে ভারতের ঐতিহ্যের প্রতি বাড়তে থাকা আগ্রহ এবং স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী স্থানের জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভারতের কোন রাজ্য সবচেয়ে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা দেয়, সেই প্রশ্নে ১৭ শতাংশের সমর্থন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম স্থানে রয়েছে। এরপর রয়েছে উত্তর প্রদেশ (১৫ শতাংশ), রাজস্থান (১৪ শতাংশ) এবং কেরালা (১৩ শতাংশ)।
উৎসব-কেন্দ্রিক ভ্রমণের ক্ষেত্রেও দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। সমীক্ষা অনুযায়ী, ৫৯ শতাংশ ভ্রমণকারী দুর্গাপূজার সময় সফরের কথা ভাবেন। এছাড়া রথযাত্রা (৪৮ শতাংশ), কালীপূজা (৪২ শতাংশ), কুম্ভ মেলা (৩৩ শতাংশ), পার্ক স্ট্রিটের বড়দিন (৩১ শতাংশ) এবং শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা (৩০ শতাংশ) ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের তালিকায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সংস্কৃতি-কেন্দ্রিক ভ্রমণের আগ্রহ বাড়ছে। কলকাতার ২৮ শতাংশ ইতিমধ্যেই এমন বিদেশ সফর করেছেন। আরও ২৬ শতাংশ নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যতে এমন ভ্রমণে যেতে চান এবং ৩১ শতাংশ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ভ্রমণের প্রতি আগ্রহের হার ৮৫ শতাংশ। বিদেশের গন্তব্যগুলির মধ্যে জাপান (২২ শতাংশ) সবচেয়ে জনপ্রিয়। এরপর রয়েছে ইতালি (১৫ শতাংশ), থাইল্যান্ড (১৫ শতাংশ), ভিয়েতনাম (১৫ শতাংশ), মিশর (১৩ শতাংশ) এবং ফ্রান্স (১১ শতাংশ)।
তবে সংস্কৃতি-কেন্দ্রিক ভ্রমণের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, অতিরিক্ত ভিড় (৪১ শতাংশ), থাকার জায়গার সীমিত প্রাপ্যতা (৪১ শতাংশ), উৎসবের সময় বাড়তি খরচ (৪০ শতাংশ) এবং সামগ্রিক ভ্রমণ ব্যয় (৩৩ শতাংশ) এখনও পর্যটকদের প্রধান উদ্বেগের কারণ।
এই পরিস্থিতিতে স্কাইস্ক্যানার ভ্রমণকারীদের জন্য এআই-ভিত্তিক সার্চ, প্রাইস অ্যালার্ট, পুরো মাসের ভাড়া তুলনা, নিকটবর্তী বিমানবন্দর অনুসন্ধান এবং রিয়েল-টাইম ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের মতো একাধিক ডিজিটাল টুল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থার দাবি, এই পরিষেবাগুলি ভ্রমণকারীদের আরও সহজে পরিকল্পনা করতে এবং সাশ্রয়ী বিকল্প খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।
সমীক্ষার ফলাফল স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, কলকাতার পরিচয় এখন শুধু একটি ঐতিহাসিক শহর হিসেবে নয়, বরং উৎসব, খাবার, আধ্যাত্মিকতা এবং জীবন্ত সংস্কৃতির শহর হিসেবেই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
