কলকাতা/বেঙ্গালুরু: কলকাতার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির ব্র্যান্ড K C Das Pvt Ltd, যে সংস্থা ক্যানড রসগোল্লাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল, এবার বেঙ্গালুরুতে ব্যবসায়িক সঙ্কটের মুখে। একই সময়ে সংস্থার শেয়ারহোল্ডিং, পরিচালনা পর্ষদ, ম্যানেজমেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং কথিত অব্যবস্থাপনা নিয়ে পারিবারিক ও কর্পোরেট বিরোধ পৌঁছেছে ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল বা NCLT-এর কলকাতা বেঞ্চে।
বেঙ্গালুরুতে একের পর এক আউটলেট বন্ধ
একসময় বেঙ্গালুরুতে K C Das-এর প্রায় ২০টি নিজস্ব ও ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেট ছিল। বর্তমানে বেশ কয়েকটি আউটলেট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিছু দোকান চালু থাকলেও সেখানে আগের তুলনায় কম সংখ্যক মিষ্টি পাওয়া যাচ্ছে বলে কর্মীদের দাবি। এক কর্মীর কথায়, “মিষ্টি দই এবং সোনপাপড়ি, এখানে সবচেয়ে বেশি চাহিদার দুটি পণ্য, পাঁচ মাস ধরে তৈরি হচ্ছে না। বেতনও সময়মতো দেওয়া হচ্ছে না।” বেঙ্গালুরুতে K C Das-এর ব্যবসার ইতিহাস ছয় দশকেরও বেশি পুরনো। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কর্মী এবং পরিবারের কয়েকজন শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কলকাতার ব্যবসা নিয়েও বাড়ছে আশঙ্কা
বেঙ্গালুরুতে তৈরি হওয়া সমস্যার প্রভাব কলকাতার ব্যবসাতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবারের দুই শেয়ারহোল্ডার। বর্তমানে কলকাতায় K C Das-এর ১২টি আউটলেট রয়েছে। ব্র্যান্ডটির সরবরাহ ব্যবস্থা, আর্থিক কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের সুনাম কলকাতার ব্যবসার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। NCLT-তে আবেদনকারী পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, বেঙ্গালুরুর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে তার প্রভাব প্রায় শতবর্ষের এই সংস্থার সামগ্রিক ব্যবসা এবং ঐতিহ্যের উপর পড়তে পারে।
পরিবারের মধ্যেই শেয়ার ও পরিচালনা নিয়ে বিরোধ
বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে K C Das পরিবারের একাধিক সদস্য। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ৯২ বছর বয়সি বীরেন্দ্রনাথ দাস, তাঁর ভাইপো ধীমান দাস এবং প্রয়াত সঞ্জয় দাস। সঞ্জয়ের স্ত্রী অম্বালিকা এবং তাঁদের ছেলে শ্রীনয়ও এই বিরোধের সঙ্গে যুক্ত। বীরেন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠাতা K C Das-এর নাতি। ধীমান এবং সঞ্জয় ছিলেন তাঁর প্রপৌত্র। NCLT-র মামলায় মূলত শেয়ারহোল্ডিংয়ের পরিবর্তন, পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ, ম্যানেজমেন্টের নিয়ন্ত্রণ এবং কথিত অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শ্রীনয় ও অম্বালিকা শেয়ারহোল্ডিংয়ের কাঠামোয় হওয়া পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। অন্যদিকে ধীমান অভিযোগ করেছেন, যথাযথ নোটিস বা আলোচ্যসূচি ছাড়াই পরিচালকদের নিয়োগের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে কলকাতার ব্যবসার দায়িত্বে রয়েছেন।
LPG সঙ্কট নিয়ে ম্যানেজমেন্টের যুক্তি
বেঙ্গালুরুতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার জন্য ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে LPG-এর ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কর্মী এবং সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বেঙ্গালুরুর অন্য মিষ্টির দোকানগুলিতে একই ধরনের সমস্যা দেখা না গেলেও K C Das-এর উৎপাদন কেন এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। একটি কারখানা স্থানান্তরও পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে বলে কয়েকজনের দাবি। তবে এসব অভিযোগের অনেকটাই বিতর্কিত এবং বর্তমানে NCLT-র বিচারাধীন।
পুরনো পারিবারিক ব্যবস্থাতেও বদল?
কর্মীদের একাংশের দাবি, আগে পরিবারকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় বীরেন্দ্রনাথ বেঙ্গালুরুর ব্যবসা দেখতেন এবং সঞ্জয় ও ধীমান কলকাতার দায়িত্ব সামলাতেন। পরে সিনিয়র ম্যানেজার শম্পা চক্রবর্তী এবং পরামর্শদাতা মহাবীর জৈন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আসার পর সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে বলে তাঁদের অভিযোগ। তবে এই দাবিগুলিও বিতর্কিত এবং আদালতের বিচারাধীন বিষয়। শম্পা চক্রবর্তী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তিনি প্রশ্নগুলি কলকাতায় থাকা “কোম্পানির সদর দফতর”-এর কাছে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
বেতন নিয়েও অভিযোগ
বেঙ্গালুরুর কর্মীদের একাংশের দাবি, কয়েকজন সিনিয়র কর্মী ছয় মাস পর্যন্ত বেতন পাননি। আবার কিছু জুনিয়র কর্মীকে এক মাস অন্তর বেতন দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। K C Das-এর সঙ্গে যুক্ত এক কর্মীর কথায়, “বেঙ্গালুরুর সবচেয়ে পুরনো বাঙালি মিষ্টির ব্র্যান্ডের সুনামই এখন ঝুঁকির মুখে।” ধীমান দাস বেঙ্গালুরুর ব্যবসায় সঙ্কটের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে এর আর্থিক প্রভাব কলকাতার ব্যবসাতেও পড়তে পারে।
প্রায় শতবর্ষের ঐতিহ্য বহন করা K C Das-এর ক্ষেত্রে তাই বেঙ্গালুরুর বর্তমান সঙ্কট শুধু কয়েকটি দোকান বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়। পারিবারিক মালিকানা, কর্পোরেট পরিচালনা, কর্মীদের বেতন এবং ব্যবসার আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তিই এখন সংস্থার ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
