মুম্বই: সাইবার অপরাধ (Cyber Crime) নিয়ে তৈরি ওয়েব সিরিজ ‘প্রীতম অ্যান্ড পেদ্রো’ দর্শকদের মধ্যে যথেষ্ট প্রশংসা পেয়েছে। কিন্তু সেই সিরিজের গল্পই নাকি এবার বাস্তব জীবনে প্রতারণার ছক তৈরি করতে অনুপ্রেরণা জোগাল এক যুবককে। অভিযোগ, গুরুগ্রামের এক যুবক ভিক্রান্ত ম্যাসির অভিনীত নেতিবাচক চরিত্রের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এক এমবিএ পড়ুয়ার কাছ থেকে ২৪.৬০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। যদিও তাঁর পরিকল্পনা বেশিদিন চলেনি। পুলিশ তদন্ত চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করেছে।
টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত যুবকের নাম অলোক কে। অভিযোগ, তিনি নিজেকে পড়ুয়াদের কাউন্সেলর হিসেবে পরিচয় দিতেন। চলতি বছরের শুরুতে ২১ বছরের এক পড়ুয়ার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই পড়ুয়া একটি নামী ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের দূরশিক্ষা ব্যবস্থায় ফিনান্সে এমবিএ করছিলেন।
জুহুর ক্যাফেতে আলাপ, তারপর তৈরি হয় বিশ্বাস
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুম্বইয়ের জুহুর একটি ক্যাফেতে ওই পড়ুয়ার সঙ্গে দেখা করেছিলেন অলোক। ভর্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পড়ুয়াটিকে সাহায্যও করেছিলেন তিনি। এই কারণেই ধীরে ধীরে অলোকের উপর বিশ্বাস তৈরি হয় ওই পড়ুয়ার। পরে সেই বিশ্বাসকেই কাজে লাগিয়ে প্রতারণার ছক তৈরি করা হয় বলে পুলিশের অভিযোগ।
অনলাইন পরীক্ষার সময় প্রথম ভয় দেখানো
কয়েক মাস আগে ওই পড়ুয়া অনলাইনে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর ডিভাইসের স্ক্রিনে একটি সতর্কবার্তা আসে। সেখানে জানানো হয়, পরীক্ষার সময় নকল করার বিষয়টি শনাক্ত হয়েছে। পড়ুয়া তখন অলোককে ফোন করে জানান যে তিনি কোনও রকম নকল করেননি। কিন্তু পরীক্ষার শেষ দিনেও একই ধরনের সতর্কবার্তা আসে এবং এবার পরীক্ষার অ্যাপ্লিকেশনটি ক্র্যাশ করে যায়। এরপরই অভিযোগ অনুযায়ী, অলোক ফোন করে জানতে চান, পড়ুয়া আবার নকল করেছিলেন কি না। পড়ুয়া ফের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
বহিষ্কার ও ব্ল্যাকলিস্টের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি
টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অলোক ওই পড়ুয়াকে ভয় দেখান যে তাঁকে পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হতে পারবেন না বলে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এরপর অলোক দাবি করেন, তিনি পুরো সমস্যাটি মিটিয়ে দিতে পারবেন। সেই কাজের জন্য টাকা দাবি শুরু করেন। এমনকি তিনি কাজটি করতে না পারলে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এইভাবে ধাপে ধাপে ওই পড়ুয়া অলোককে মোট ২৪ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে দেন। তবে এর মধ্যে মাত্র ১ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।
পরীক্ষা পাশ করার পরও চলতে থাকে টাকা চাওয়া
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শেষ পর্যন্ত ওই পড়ুয়া পরীক্ষায় পাশ করে যান। কিন্তু তারপরও অলোক টাকা দাবি করতে থাকেন বলে অভিযোগ। তখনই পড়ুয়ার সন্দেহ হয় যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বিষয়টি তিনি তাঁর বাবা-মাকে জানান। এরপর চলতি মাসের শুরুতে মুম্বইয়ের বাঙ্গুর নগর থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়।
ফোন ও টাকার সূত্র ধরে গুরুগ্রামে পৌঁছয় পুলিশ
অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পুলিশ অলোকের ফোনের রেকর্ড এবং টাকা লেনদেনের সূত্র অনুসরণ করে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। তদন্তের সূত্র ধরে পুলিশ তাঁর অবস্থান গুরুগ্রামে শনাক্ত করে। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোনও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আগে কল সেন্টারে কাজ করতেন অভিযুক্ত
পুলিশের দাবি, অলোক আগে এমন একটি কল সেন্টারে কাজ করতেন, যেটি ওই ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের হয়ে ভর্তি এবং কাউন্সেলিং সংক্রান্ত বিষয়ে পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। সেখানেই কাজ করার সময় তিনি প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের তথ্যভান্ডার থেকে ওই পড়ুয়ার ফোন নম্বর সংগ্রহ করেছিলেন বলে পুলিশের অভিযোগ। এরপর নির্দিষ্ট পড়ুয়াটিকে লক্ষ্য করে প্রতারণার পরিকল্পনা করা হয়।
অর্থাৎ, পড়ুয়ার সঙ্গে তাঁর আগের পরিচয় এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় সাহায্য করার বিষয়টিই পরে বিশ্বাস অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
‘প্রীতম অ্যান্ড পেদ্রো’ থেকে অনুপ্রেরণার দাবি
গ্রেফতারের পর অলোক পুলিশকে জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে তিনি ‘প্রীতম অ্যান্ড পেদ্রো’ ওয়েব সিরিজের ভিক্রান্ত ম্যাসি অভিনীত নেতিবাচক চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সিরিজে দেখানো সামাজিক কৌশল বা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পরিচয় ভুয়োভাবে ব্যবহার করার পদ্ধতির আদলে ওই পড়ুয়াকে প্রতারণা করতে চেয়েছিলেন। তবে কোনও ওয়েব সিরিজের গল্প বা চরিত্র থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার দাবি অভিযুক্তের বক্তব্যের অংশ। এই দাবির স্বাধীন সত্যতা আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বর্তমানে পুলিশ অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে।
ঘটনাটি আরও একবার দেখিয়ে দিল, পরিচিত ব্যক্তি বা কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা ব্যক্তির কাছ থেকে ফোন, মেসেজ বা অনলাইন পরীক্ষার সতর্কবার্তার ভিত্তিতে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তথ্য যাচাই করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বহিষ্কার, ব্ল্যাকলিস্ট বা ভবিষ্যতে পড়াশোনার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
