কলকাতা: ভারতে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের (Educated Youth) সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সেই হারে তৈরি হচ্ছে না তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি। ফলস্বরূপ তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। ডিগ্রি আছে, নতুন দক্ষতা শেখা হয়েছে, সার্টিফিকেট আছে, তবু কাজ মিলছে না। অনেকেই বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি, আবেদন, নতুন দক্ষতা অর্জন এবং অপেক্ষার মধ্যে কাটিয়ে দিচ্ছেন।
৩৪ বছরের রঞ্জনের অভিজ্ঞতা এই সমস্যারই প্রতিচ্ছবি। ২০১৮ সালে স্নাতক হওয়ার পর তিনি ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডেটা সায়েন্সে কেরিয়ার গড়তে চেয়েছিলেন। সেই লক্ষ্যেই শিখেছেন এসকিউএল, পাইথন এবং পাওয়ার বিআই। তৈরি করেছেন পোর্টফোলিও প্রজেক্ট, ড্যাশবোর্ড, ফ্রিল্যান্স ডেটা অ্যানালিসিসের কাজও করেছেন। পাশাপাশি বাড়িতে পড়িয়েছেন এবং নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন। আট বছর পরেও তিনি এখনও সেই কেরিয়ারে প্রবেশের সুযোগ খুঁজছেন, যার জন্য নিজেকে তৈরি করেছিলেন। রঞ্জনের মতে, সমস্যা দক্ষতা শেখায় নয়, সমস্যা হল নিয়োগকারীদের বোঝানো যে তিনি কাজটি করার সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।
তাঁর অভিযোগ, বহু চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে এমন প্রযুক্তির জন্য আট থেকে দশ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, যেগুলির অনেকটাই কয়েক বছর আগেই বাজারে এসেছে। জেনারেটিভ এআই, ক্লাউড প্রযুক্তি বা নতুন সফটওয়্যার কাঠামোর ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতার দাবি দেখা যায়। এখানেই ভারতের শ্রমবাজারের একটি বড় বৈপরীত্য সামনে আসে।
পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, নিরক্ষর মানুষের মধ্যে বেকারত্ব ছিল মাত্র ০.৩ শতাংশ। প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষিতদের ক্ষেত্রে ০.৬ শতাংশ এবং মধ্য স্তরের শিক্ষায় ১.৬ শতাংশ। কিন্তু মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬.৫ শতাংশে, যা জাতীয় গড় ৩.১ শতাংশের দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থনীতিবিদ মিতালি নিকোরের মতে, এর একটি সামাজিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।
নিম্ন আয়ের পরিবারের কেউ দীর্ঘদিন চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে পারেন না। তাঁকে যা কাজ পাওয়া যায়, সেটিই নিতে হয়। কৃষিকাজ, দৈনিক মজুরি, অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র বা শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন কাজও তাঁরা গ্রহণ করেন। কিন্তু তুলনামূলক আর্থিক নিরাপত্তা থাকা পরিবার থেকে আসা উচ্চশিক্ষিত তরুণরা নিজেদের যোগ্যতার সঙ্গে মানানসই চাকরির জন্য বেশি সময় অপেক্ষা করতে পারেন। এর ফলে পরিসংখ্যানে শিক্ষিত বেকারত্ব বেশি দেখা যায়।
আরও একটি সমস্যা আছে। কেউ যদি ছয় বা আট মাস চাকরি খুঁজে ব্যর্থ হয়ে সম্পূর্ণভাবে চেষ্টা বন্ধ করে দেন, তখন তাঁকে আর বেকার হিসেবে গণনা করা হয় না। কারণ তিনি আর শ্রমশক্তির সক্রিয় অংশ হিসেবে বিবেচিত হন না। অর্থাৎ সরকারি বেকারত্বের সংখ্যা বাস্তব সমস্যার পুরো চিত্র দেখায় না।
প্রথম চাকরি পাওয়াই সবচেয়ে কঠিন
ইনডিড-এর ফ্রেশার হায়ারিং রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ তরুণ চাকরিপ্রার্থী মনে করেন, তিন থেকে পাঁচ বছর আগের তুলনায় এখন প্রথম চাকরি পাওয়া আরও কঠিন। ৭২ শতাংশ প্রার্থী জানিয়েছেন, প্রবেশস্তরের চাকরিতেও আগের কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হচ্ছে। অথচ পড়াশোনার সময় মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী বেতনযুক্ত ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেয়েছেন।
ইনডিড ইন্ডিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর শশী কুমারের মতে, ২০২১ সালের পর থেকে নতুন স্নাতকদের নিয়োগ কিছুটা কমেছে, বিশেষ করে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে। তবে নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং নিয়োগকারীরা এখন বেশি বেছে নিয়োগ করছেন। তাঁদের কাছে প্রশ্নটি শুধু, “কী পড়েছেন?” নয়। বরং, “বাস্তবে কী করতে পারেন?” এই পরিবর্তন নতুন একটি সমস্যা তৈরি করেছে। কোম্পানি অভিজ্ঞতা চায় যাতে প্রার্থী কাজ করতে পারবেন কি না তার প্রমাণ থাকে। কিন্তু নতুন স্নাতক প্রথম চাকরি না পেলে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন কীভাবে? এটি কার্যত একটি বন্ধ চক্র।
কেরিয়ার গ্যাপ এখন বড় বাধা
রঞ্জনের মতে, দীর্ঘ কেরিয়ার গ্যাপ থাকলে অনেক আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ে যায়। বহু সংস্থা আবেদন বাছাইয়ের জন্য অটোমেটেড ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করে। সেখানে কেরিয়ার গ্যাপ থাকলে প্রার্থীর গিটহাব রিপোজিটরি, ক্যাগল প্রজেক্ট, লাইভ পাওয়ার বিআই ড্যাশবোর্ড কিংবা পাইথনের কাজ অনেক সময় বিবেচনাতেই আসে না। এই পরিস্থিতি আবার ভুয়ো অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেটের একটি অঘোষিত বাজারও তৈরি করেছে বলে অভিযোগ। কিছু চাকরিপ্রার্থী অর্থের বিনিময়ে ভুয়ো অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে নিয়োগের প্রথম ধাপ পেরিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে যারা জীবনবৃত্তান্তে মিথ্যা তথ্য দিতে চান না, তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন।
১৫ হাজার টাকার চাকরির জন্য হাজার মানুষের লাইন
কলকাতার ৩৩ বছরের শাশ্বত চক্রবর্তী এই হতাশা খুব কাছ থেকে দেখছেন। পেশায় সাইবার সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট শাশ্বত নিজের পুরনো চাকরি খোঁজার অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বেকার তরুণদের বিভিন্ন আইটি এবং বিজনেস প্রসেস সার্ভিস সংস্থায় রেফার করতে সাহায্য করেন। এর জন্য তিনি কোনও অর্থ নেন না। তাঁর কথায়, নিয়োগ শিবিরে এমন দৃশ্য দেখা যায় যেখানে হাজার হাজার তরুণ ৪০ ডিগ্রি গরম বা প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও শুধু ইন্টারভিউ দেওয়ার সুযোগের জন্য লাইনে দাঁড়ান। কাজের বেতন হয়তো হাতে ১৫ হাজার টাকা। তবুও শেষ পর্যন্ত অনেককে “অতিরিক্ত যোগ্য” বলে বাদ দেওয়া হয়। এই বৈপরীত্যই শিক্ষিত বেকারত্বের বাস্তব ছবি।
পড়াশোনা একদিকে, চাকরি অন্যদিকে
কলকাতার ৩৭ বছরের অয়ন ২০১২ সালে স্নাতক এবং ২০১৪ সালে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করেন। সামাজিক বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন তিনি। কয়েক বছর সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে বাড়িতে পড়িয়ে নিজের খরচ চালাতেন। পরে বেসরকারি ক্ষেত্রে যোগ দেন। সাত বছর বিজনেস প্রসেস সার্ভিসে কাজ করার পর প্রায় এক বছর আগে আইটি ক্ষেত্রে চলে আসেন। কাজ নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। কিন্তু পড়াশোনা এবং পেশার মধ্যে কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাঁর কথায়, সামাজিক বিজ্ঞান পড়ে এখন আইটি-তে কাজ করার কারণে প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে হয়। এক অর্থে চাকরি আছে, কিন্তু পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই।
গুরুগ্রামের ৩৬ বছরের কৃষ্ণের গল্পও একই রকম। রাজনীতি, সংঘাত ও গবেষণা নিয়ে স্নাতকোত্তর করার পর তিনি কয়েক বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হওয়ায় অন্য পথ বেছে নিতে হয়। ২০২৩ সাল থেকে তিনি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি সংস্থার স্বাধীন ঠিকাদার হিসেবে ডেটা কোয়ালিটি রিভিউয়ের কাজ করছেন। পড়াশোনার সঙ্গে এই কাজের সম্পর্ক নেই। প্রয়োজনীয় দক্ষতাও তাঁকে আলাদাভাবে শিখতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, অর্থনীতির হিসাবে তিনি বেকার নন, কিন্তু আংশিকভাবে আন্ডারএমপ্লয়েড। অর্থাৎ তাঁর যোগ্যতার তুলনায় কাজের মান বা প্রয়োগ সীমিত।
পিএইচডি করেও দেশে কাজের অভাব
৩৩ বছরের অনিকেত ২০২৩ সালে লাইফ সায়েন্সেস ও বায়োটেকনোলজিতে পিএইচডি শেষ করেন। তিন মাসের চাকরি খোঁজার পর ভারতে দুটি বায়োটেক সংস্থা থেকে অফার পেয়েছিলেন। একই সময়ে আমেরিকায় পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুযোগও আসে। তিনি বিদেশের সুযোগটি বেছে নেন। পোস্টডক্টরাল কাজ শেষ হওয়ার পর এখন স্থায়ী চাকরি খুঁজছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। যদি কারও ডিগ্রি থাকে, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ থাকে, গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকে, তবুও যদি সেই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দেশে চাকরিই খুব কম থাকে, তাহলে শুধু “স্কিল গ্যাপ” দিয়ে সমস্যাটি ব্যাখ্যা করা যায় না।
অনিকেতের ক্ষেত্র বায়োটেক গবেষণা ও উন্নয়ন, বিশেষ করে রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন উৎপাদন এবং মেমব্রেন-ভিত্তিক বায়োপ্রসেস। এই ধরনের কাজের সুযোগ ভারতে খুব সীমিত বলেই তাঁর অভিজ্ঞতা। বিদেশে অন্তত সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাচ্ছেন। দেশে সেই কথোপকথনও খুব কম। সমস্যাটি শুধু দক্ষতার নয়, চাকরির সংখ্যারও
অর্থনীতিবিদ ও গবেষক দিব্যা শ্রীনিবাসনের মতে, ভারতের শিক্ষিত বেকারত্বের সমস্যার দুটি দিক রয়েছে। একদিকে সরবরাহের অসামঞ্জস্য। অর্থাৎ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে চাহিদার ঘাটতি। অর্থাৎ সেই হারে মানসম্মত চাকরি তৈরি হচ্ছে না।
ভারত তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং আধুনিক পরিষেবা ক্ষেত্রে শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রগুলি তুলনামূলকভাবে উচ্চ দক্ষতানির্ভর এবং দেশের সম্পূর্ণ শিক্ষিত কর্মশক্তিকে শোষণ করতে পারে না। ফলে শ্রমবাজারে একটি “মিসিং মিডল” তৈরি হয়েছে।
মাধ্যমিক, ডিপ্লোমা বা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল ও ভালো বেতনের চাকরি নেই। উৎপাদন শিল্পে কর্মসংস্থানের অংশ এখনও প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ। উৎপাদন ক্ষেত্রের মধ্যেও বৃদ্ধি ক্রমশ বেশি পুঁজিনির্ভর শিল্পের দিকে যাচ্ছে, যেখানে তুলনামূলক কম মানুষ প্রয়োজন। দিব্যা শ্রীনিবাসনের কথায়, “দশজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি পাঁচটি চাকরি তৈরি হয়, তাহলে পাঁচজন তবু চাকরি ছাড়াই থাকবেন।”
ডিগ্রি আর চাকরির যোগ্যতা এক জিনিস নয়
অন্যদিকে নিয়োগকারীদেরও অভিযোগ রয়েছে। নেক্সটলিপ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও অরিন্দম মুখার্জির মতে, এখন “ডিগ্রি থাকা” এবং “চাকরি করার উপযুক্ত হওয়া” দুটি আলাদা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন স্নাতক কোনও বিষয়ের তত্ত্ব জানতেই পারেন, কিন্তু বাস্তব ব্যবসায়িক সমস্যায় সেই জ্ঞান প্রয়োগ করা, কাজের সফটওয়্যার ব্যবহার করা, পরিষ্কারভাবে যোগাযোগ করা বা স্বাধীনভাবে কাজ করা, এই দক্ষতাগুলি অনেকের মধ্যে থাকে না।
নীতিআয়োগের আগস্টের “রিইম্যাজিনিং স্কিলিং ফর বিকশিত ভারত @২০৪৭” রিপোর্ট অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে তাঁদের পড়াশোনায় বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা এবং শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে পরিচয়ের বড় অভাব রয়েছে। রিপোর্টে অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪-২৫-এর তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মাত্র ৮.২৫ শতাংশ স্নাতক উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশায় কাজ করছেন।
তৈরি হয়েছে ‘অভিজ্ঞতার প্যারাডক্স’
টিমলিজ এডটেক-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও শান্তনু রুজের মতে, এখন “এক্সপেরিয়েন্স প্যারাডক্স” বা অভিজ্ঞতার বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। প্রবেশস্তরের চাকরিতে নিয়োগকারীরা আগের অভিজ্ঞতা চান। কিন্তু চাকরিতে ঢোকার আগেই সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ শিক্ষার্থীদের খুব সীমিত। শিক্ষাব্যবস্থা এখনও মূলত “যোগ্যতার প্রমাণ” দেয়। কিন্তু নিয়োগকারী এখন চান “কাজ করার সক্ষমতার প্রমাণ”। এই দুটির মধ্যে ব্যবধানই তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের বড় সমস্যায় ফেলছে।
সরকারি চাকরির আকর্ষণও সমস্যা বাড়াচ্ছে
ভারতে সরকারি চাকরির প্রতি আকর্ষণও শিক্ষিত তরুণদের কেরিয়ারকে প্রভাবিত করছে। স্থায়িত্ব, সামাজিক মর্যাদা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং চাকরির নিরাপত্তার কারণে বহু তরুণ বছরের পর বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু সফল না হলে পরে বেসরকারি ক্ষেত্রে ফেরার সময় তাঁদের জীবনবৃত্তান্তে কয়েক বছরের ফাঁক তৈরি হয়।
নীতিআয়োগের রিপোর্ট অনুযায়ী, নভেম্বর ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫-এর মধ্যে মাত্র ৫৫ হাজার সরকারি পদের জন্য ১.৮৬ কোটি আবেদন জমা পড়েছিল। এই পরিসংখ্যান সরকারি চাকরির প্রতি চাহিদার মাত্রা স্পষ্ট করে।
কী বদলানো দরকার?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম পরিবর্তন দরকার শিক্ষাব্যবস্থায়। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষমতা তৈরি করতে হবে। শিল্পক্ষেত্রকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, বাস্তব প্রজেক্ট এবং সংস্থার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা বাড়ানো দরকার। তবে শুধু শিক্ষাব্যবস্থা বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে না। ভারতের দরকার আরও বেশি উৎপাদনশীল, স্থিতিশীল এবং ভালো বেতনের চাকরি। উৎপাদন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কৃষি, কেয়ার ইকোনমি, লজিস্টিক্স, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অন্যান্য নতুন ক্ষেত্রে বড় আকারে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। কেরিয়ার সম্পর্কে তরুণদের ধারণাও বাড়াতে হবে। এখনও অনেক পরিবারের কাছে কেরিয়ার মানে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, শিক্ষক বা সরকারি কর্মচারী। কিন্তু ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে আরও বহু ধরনের পেশা তৈরি হচ্ছে।
সরকার ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা, ন্যাশনাল অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোমোশন স্কিম, ক্রাফ্টসম্যান ট্রেনিং স্কিম এবং ফিউচারস্কিলস প্রাইম-এর মতো উদ্যোগ চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত রোজগার যোজনায় ৯৯,৪৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করে দুই বছরে ৩.৫ কোটির বেশি চাকরি তৈরিতে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। টিমলিজ এডটেক-এর কেরিয়ার আউটলুক রিপোর্ট অনুযায়ী, জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ৭৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা নতুন স্নাতকদের নিয়োগের পরিকল্পনা করেছেন।
তবুও রঞ্জন, অয়ন, কৃষ্ণ এবং অনিকেতের অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু মোট বেকারত্বের হার দিয়ে সমস্যাটি বোঝা যায় না। কেউ আট বছর ধরে প্রথম বড় সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। কেউ এমন পেশায় কাজ করছেন যার সঙ্গে তাঁর পড়াশোনার সম্পর্ক নেই। কেউ চাকরি করেও নিজেকে আংশিক বেকার মনে করছেন। আবার পিএইচডি এবং পোস্টডক্টরাল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কেউ বিশেষায়িত কাজের জন্য দেশের বাইরে তাকাচ্ছেন। ভারত তার তরুণদের আগের চেয়ে বেশি শিক্ষিত করছে।
এখন বড় প্রশ্ন হল, সেই শিক্ষার যোগ্য পর্যাপ্ত কাজ কি অর্থনীতি তৈরি করতে পারছে? কারণ একটি ডিগ্রি দরজা খুলতে পারে। কিন্তু দরজার ওপারে যদি উপযুক্ত চাকরিই না থাকে, তাহলে সেই ডিগ্রি একা খুব বেশি কিছু বদলাতে পারে না।
