কলকাতা: দ্রুতগতির বাইক পছন্দ করেন তিনি। গতি, খোলা রাস্তায় বাতাসের ধাক্কা এবং দীর্ঘ পথে ছুটে চলার আনন্দই ছিল তাঁর কাছে মোটরসাইকেল চালানোর মূল আকর্ষণ। তাই যখন অফিস থেকে একটি ইলেকট্রিক স্কুটার চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হল, তাও আবার তুলনামূলক শান্ত স্বভাবের কম দামের মডেল, প্রথমে মনে হয়েছিল এটি হয়তো মজার ছলে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এক মাসেরও বেশি সময় টিভিএস অরবিটারের (TVS Orbiter) সঙ্গে কাটানোর পর সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। বাড়ি থেকে অফিসের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন যাতায়াতে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। দীর্ঘ যাতায়াত, ভারতের অনিশ্চিত রাস্তা এবং ৬ ফুট উচ্চতার কারণে আরামদায়ক একটি মোটরসাইকেল হিসেবে আগে কেটিএম ৩৯০ অ্যাডভেঞ্চার এক্স কেনা হয়েছিল। কিন্তু অরবিটারের সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রতিদিনের যাতায়াতে সব সময় বেশি গতি বা বড় ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয় না।
ধীর গতির জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া
অফিসে যাওয়ার জন্য মূলত দুটি রাস্তা ছিল। প্রথমটি পুনে শহরের মাঝখান দিয়ে যাওয়া অপেক্ষাকৃত ছোট কিন্তু অত্যন্ত ব্যস্ত পথ। এই পথে প্রতিদিন প্রচুর যানজট এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। দ্বিতীয় পথটি কিছুটা বেশি লম্বা এবং শহরের বাইরের দিক দিয়ে যায়। এতে খুব বেশি সময় বাঁচে না, কিন্তু যাত্রা শেষে মানসিক চাপ তুলনামূলক কম থাকে।
কেটিএম ৩৯০ অ্যাডভেঞ্চারে দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু একই পথে টিভিএস অরবিটার নিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। দ্রুতগতির মহাসড়কের অংশে অরবিটার নিয়ে ধীর গতির লেনে থাকতে হয়। দ্রুতগতির বাইকে যিনি সাধারণত অন্য যানবাহনকে সহজেই ওভারটেক করেন, তাঁর কাছে এই অভিজ্ঞতা প্রথমে অস্বাভাবিক লেগেছে। ধীরগতির অন্য দুই-চাকার গাড়িকে ওভারটেক করাও তুলনামূলক কঠিন। তার ওপর পুনের অনিয়মিত বর্ষা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।

তবে স্কুটারটিকে এমন পরিবেশে জোর করে চালানোর পরিবর্তে ধীরে ধীরে বিকল্প রাস্তা খুঁজে নেওয়া শুরু হয়। এমন কিছু রাস্তা, যেগুলি আগে কখনও ব্যবহার করার কথা ভাবা হয়নি, সেগুলিই নিয়মিত যাতায়াতের অংশ হয়ে ওঠে। অবাক করার মতো বিষয় হল, কম গতির এই যাত্রা প্রতিদিনের যাতায়াতকে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম চাপের করে তুলেছে।
শুরুতে সত্যিই ছিল রেঞ্জ নিয়ে দুশ্চিন্তা
ইলেকট্রিক গাড়ি বা স্কুটারের মালিকরা কেন বারবার ব্যাটারিতে কতটা চার্জ রয়েছে তা নিয়ে চিন্তা করেন, তা আগে কিছুটা বিভ্রান্তিকর মনে হত। কিন্তু অরবিটার ব্যবহার করার পর সেই উদ্বেগের কারণ পরিষ্কার হয়েছে। সিটি মোডে অরবিটার প্রায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি রেঞ্জ দেখায়। কিন্তু সর্বোচ্চ গতির কাছাকাছি, অর্থাৎ ঘণ্টায় ৬৮ কিলোমিটার গতিতে চালালে বাস্তব রেঞ্জ কমে প্রায় ৯০ কিলোমিটারে নেমে আসে। প্রতিদিন যাতায়াতে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হওয়ায় প্রতিদিন চার্জ করা দ্রুতই দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হয়ে যায়।
প্রথম সপ্তাহে ব্যাটারির শতাংশ বারবার পরীক্ষা করতে হত। বাড়ি ফেরার আগে কতটা চার্জ থাকবে, মাঝপথে চার্জের প্রয়োজন হবে কি না, এসব হিসাব মাথায় রাখতে হত। তবে সময়ের সঙ্গে সেই দুশ্চিন্তা কমে যায়। স্কুটারটি কীভাবে ব্যবহার করলে ব্যাটারি কতটা কমে, তা বুঝে যাওয়ার পর চার্জ দেওয়ার পরিকল্পনাও সহজ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত এটি গাড়ির মালিকানার অন্য কোনও নিয়মিত কাজের মতোই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
কেটিএম অ্যাডভেঞ্চারকে ততটা মনে পড়ছে না
অরবিটারের যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে, সেটি হল এর রাইড কোয়ালিটি। ভারতের রাস্তা সাধারণত কোনও যানবাহনের জন্যই খুব একটা সহজ নয়। তাই তুলনামূলক হালকা এবং শান্ত স্বভাবের এই স্কুটারটি গর্ত, ভাঙাচোরা রাস্তা এবং স্পিড ব্রেকার কতটা সামলাতে পারবে, তা নিয়ে শুরুতে সন্দেহ ছিল। কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ অরবিটার গর্ত, ভাঙা রাস্তা এবং স্পিড ব্রেকার বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামলেছে। এর সাসপেনশন খারাপ রাস্তার ধাক্কা যথেষ্ট ভালোভাবে শোষণ করে।
দীর্ঘ ৬০ কিলোমিটারের দৈনিক যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাস্তার প্রতিটি ধাক্কা যদি চালকের শরীরে সরাসরি পৌঁছায়, তাহলে দীর্ঘ যাত্রা দ্রুত ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। অরবিটারের সাসপেনশন সেই চাপ অনেকটাই কমিয়েছে।
এক অর্থে এটি অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেল পছন্দ করার অন্যতম কারণও মনে করিয়ে দেয়। অরবিটার অবশ্যই অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেল নয়। কিন্তু খারাপ রাস্তায় যে আত্মবিশ্বাস এটি দেয়, তা অনেকটাই পরিচিত মনে হয়েছে।
এবার নজর চার্জিং পরিকাঠামো এবং বর্ষায়
এক মাসের বেশি সময় অরবিটারের সঙ্গে কাটানোর পর ইলেকট্রিক দুই-চাকার গাড়ি সম্পর্কে আগের বেশ কিছু ধারণা বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন হল, দৈনিক অফিস যাতায়াতের বাইরে অরবিটার কতটা ব্যবহারিক? পরবর্তী পর্যায়ে দেশের চার্জিং পরিকাঠামো কতটা উন্নত হয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি আরও বেশি যাতায়াতের উপযোগী রাস্তা খুঁজে দেখা হবে।
পুনের প্রবল বর্ষায় অরবিটার কীভাবে কাজ করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে একটি ইলেকট্রিক স্কুটার ব্যবহার সত্যিই তার মালিকদের দাবির মতো ঝামেলামুক্ত কি না, সেটিও বোঝার চেষ্টা করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার বর্তমান হিসাব
- গাড়িটি হাতে পাওয়ার সময় মোট চলেছিল: ২,৬১৪ কিলোমিটার
- এখন পর্যন্ত চালানো হয়েছে: ১,১৫০ কিলোমিটার
- সর্বোচ্চ রেঞ্জ: ১১৭ কিলোমিটার, সিটি মোডে
- সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক: রাইড কোয়ালিটি
- সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক: পারফরম্যান্স
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের এই প্রথম পর্যায়ে টিভিএস অরবিটার একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে, ইলেকট্রিক স্কুটারের অভিজ্ঞতা শুধু গতি বা শক্তির হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রতিদিনের যাতায়াতে আরাম, রাস্তা সামলানোর ক্ষমতা এবং চার্জিংয়ের অভ্যাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
