গুরুগাঁও: পাঁচ বছরের বিরতির পর ফের বাজারে ফিরল মিতসুবিশি পাজেরো (Mitsubishi Pajero)। ২০২১ সালে বিশ্ব বাজার থেকে নাম সরিয়ে নেওয়ার পর এবার পঞ্চম প্রজন্মের পাজেরো আত্মপ্রকাশ করল। নতুন প্রজন্মের মডেলেও আগের মতোই ল্যাডার-ফ্রেম চ্যাসিস এবং চার-চাকা চালিত ব্যবস্থা রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে লো-রেঞ্জ ট্রান্সফার কেস, ডিজেল ইঞ্জিন এবং সম্পূর্ণ আধুনিক ডিজাইন।
ভারতে নতুন পাজেরো লঞ্চ হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই। তবে ভারতীয় বাজারে পাজেরোর নাম একেবারেই অপরিচিত নয়। ২০০২ সালে ভারতে প্রথম পাজেরো এসেছিল। পরবর্তী সময়ে একাধিক প্রজন্ম ও মডেল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গাড়িটি দেশের বাজারে বিশেষ জনপ্রিয়তা তৈরি করেছিল। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে ভারতে বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২১ সালে বিশ্ব বাজার থেকেও পাজেরো নামটি সরিয়ে নেয় মিতসুবিশি।
২.৪ লিটারের ডিজেল ইঞ্জিন, ৪৮০ এনএম টর্ক
নতুন পাজেরোতে দেওয়া হয়েছে ২.৪ লিটারের ডিজেল ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিনের সর্বোচ্চ শক্তি কত, তা এখনও প্রকাশ করেনি মিতসুবিশি। তবে ইঞ্জিনটি সর্বোচ্চ ৪৮০ এনএম টর্ক উৎপন্ন করবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইঞ্জিনের সঙ্গে রয়েছে ৮-স্পিড টর্ক-কনভার্টার স্বয়ংক্রিয় গিয়ারবক্স। ফলে নতুন পাজেরোতে অফ-রোড সক্ষমতার পাশাপাশি হাইওয়ে ও শহরের রাস্তায় আরামদায়ক ড্রাইভিংয়ের দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে।

৪টি ৪WD মোড ও ৭টি ড্রাইভ মোড
অফ-রোডিং পাজেরোর অন্যতম প্রধান পরিচয়। নতুন প্রজন্মেও সেই চরিত্র বজায় রাখা হয়েছে। গাড়িতে রয়েছে চারটি চার-চাকা চালিত মোড।
- ২এইচ: পিছনের চাকা চালিত ব্যবস্থা
- ৪এইচ: ফুল-টাইম চার-চাকা চালিত ব্যবস্থা
- ৪এইচএলসি: লকড সেন্টার ডিফারেনশিয়াল
- ৪এলএলসি: লকড সেন্টার ডিফারেনশিয়াল এবং লো-রেঞ্জ গিয়ার
এর পাশাপাশি চালকের জন্য রয়েছে সাতটি ড্রাইভ মোড। এগুলি হল নর্মাল, ইকো, গ্র্যাভেল, স্নো, মাড, স্যান্ড এবং রক। অর্থাৎ রাস্তার ধরন অনুযায়ী গাড়ির ড্রাইভিং চরিত্র বদলে নেওয়ার সুযোগ থাকছে।
ল্যাডার-ফ্রেম চ্যাসিস ও ২৩০ মিমি গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স
আগের পাজেরো মডেলগুলির মতো নতুন গাড়িতেও ল্যাডার-ফ্রেম চ্যাসিস ব্যবহার করা হয়েছে। সামনে রয়েছে ইনডিপেনডেন্ট ডাবল-উইশবোন সাসপেনশন এবং পিছনে ফাইভ-লিঙ্ক রিজিড রিয়ার অ্যাক্সেল। গাড়িতে অ্যাক্টিভ ইয়ো কন্ট্রোল বা এওয়াইসি প্রযুক্তিও রয়েছে। সামনের ব্রেক ব্যবহার করে বাম ও ডান চাকার মধ্যে টর্ক বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করতে এই ব্যবস্থা সাহায্য করে। নতুন পাজেরোর গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স ২৩০ মিমি। অ্যাপ্রোচ অ্যাঙ্গেল ৩০.৪ ডিগ্রি, ব্রেক-ওভার অ্যাঙ্গেল ২২.৬ ডিগ্রি এবং ডিপার্চার অ্যাঙ্গেল ২৫.৮ ডিগ্রি। ফলে কঠিন রাস্তা ও অফ-রোড ব্যবহারের জন্য গাড়িটির সক্ষমতা যথেষ্ট বেশি।
আকারে টয়োটা ফরচুনারের থেকেও বড়
নতুন পাজেরোর দৈর্ঘ্য ৪,৯২০ মিমি, প্রস্থ ১,৯২৫ মিমি এবং উচ্চতা ১,৯১০ মিমি। হুইলবেস ২,৮৭০ মিমি। তুলনায় টয়োটা ফরচুনারের থেকে নতুন পাজেরো ১২৫ মিমি লম্বা, ৭০ মিমি চওড়া এবং ৭৫ মিমি বেশি উঁচু। এর হুইলবেসও ফরচুনারের তুলনায় ১২৫ মিমি বেশি।
আধুনিক ডিজাইনে পুরনো পাজেরোর ছোঁয়া
নতুন পাজেরোর ডিজাইন আগের মডেলগুলির তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক হলেও গাড়িটির বক্সি ও শক্তপোক্ত চরিত্র বজায় রাখা হয়েছে। সামনে রয়েছে সংযুক্ত এলইডি লাইট বার, যার প্রান্তে সেগমেন্টেড ডিজাইন দেখা যায়। এর সঙ্গে রয়েছে প্রজেক্টর এলইডি হেডল্যাম্প। বনেটে রয়েছে একাধিক আগ্রাসী ক্রিজ এবং বড়সড় অনুভূমিক স্ল্যাট দেওয়া গ্রিল। সামনের বাম্পারে এয়ার ইনলেট চ্যানেলের পাশাপাশি ধূসর স্কিড প্লেট রয়েছে।
পাশের অংশে রয়েছে ২০ ইঞ্চির কালো অ্যালয় চাকা, স্কোয়ার আকৃতির হুইল আর্চের চারপাশে কালো ক্ল্যাডিং এবং সাইড স্টেপ। সামনের ফেন্ডারে ‘পাজেরো’ লেখা এমবস করা কালো গার্নিশ দেওয়া হয়েছে। পিছনে রয়েছে সামনের দিনের আলো বা ডিআরএল-এর ডিজাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ র্যাপঅ্যারাউন্ড এলইডি টেল-ল্যাম্প। মাঝখানে কালো প্যানেলের উপর পাজেরো লেখা রয়েছে। তবে পুরনো পাজেরোর অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য, টেলগেটে লাগানো অতিরিক্ত চাকা এবার নেই। মিতসুবিশির দাবি, নতুন ডিজাইনে চতুর্থ প্রজন্মের পাজেরোর অতিরিক্ত চাকার নকশা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে।
১৪.৫ ইঞ্চির দুটি স্ক্রিন
কেবিনেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ড্যাশবোর্ডে রয়েছে দুটি ১৪.৫ ইঞ্চির স্ক্রিন। একটি ইন্সট্রুমেন্ট ক্লাস্টারের জন্য এবং অন্যটি ইনফোটেনমেন্ট ব্যবস্থার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। চার-স্পোক স্টিয়ারিং হুইলে রয়েছে ফিজিক্যাল কন্ট্রোল। পুরনো পাজেরোর পরিচিত মাল্টি-মিটার ডিসপ্লে না থাকলেও ইনফোটেনমেন্ট স্ক্রিনে ডিজিটাল রোটারি ডায়ালের মাধ্যমে গাড়ির পিচ, রোল এবং টায়ারের অ্যাঙ্গেল সম্পর্কিত তথ্য দেখা যাবে। এসি নিয়ন্ত্রণের জন্যও প্রচুর ফিজিক্যাল বোতাম ও স্ক্রলার রাখা হয়েছে। ড্যাশবোর্ড এবং দরজার গুরুত্বপূর্ণ অংশে সফট-টাচ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।
৭ আসনের কেবিন ও একাধিক আধুনিক ফিচার
নতুন পাজেরোতে তিন সারিতে মোট সাতজন যাত্রী বসতে পারবেন। সমস্ত আসনে অ্যাডজাস্টেবল হেডরেস্ট এবং কালো-ট্যান লেদারেট আপহোলস্টারি রয়েছে। শেষ সারির আসন ভাঁজ করে সমতল করা যায়, ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী বুটস্পেস বাড়ানো সম্ভব। অন্যান্য ফিচারের মধ্যে রয়েছে থ্রি-জোন ক্লাইমেট কন্ট্রোল, ১২-স্পিকার ইয়ামাহা সাউন্ড সিস্টেম এবং ভেন্টিলেটেড ফ্রন্ট সিট। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রয়েছে একাধিক ব্যবস্থা। গাড়িতে ৮টি এয়ারব্যাগ, ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা এবং অ্যাডভান্সড ড্রাইভিং অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেম বা এডিএএস দেওয়া হয়েছে। ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এটি গাড়ির বনেটের নিচের অংশের দৃশ্যও দেখাতে পারে, যা অফ-রোডিংয়ের সময় বিশেষভাবে কাজে আসতে পারে।
প্রথমে থাইল্যান্ড, পরে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া
মিতসুবিশি প্রথমে থাইল্যান্ডের বাজারে পঞ্চম প্রজন্মের পাজেরো লঞ্চ করবে। এরপর ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার বাজারেও গাড়িটি আসবে। পরবর্তীতে আসিয়ান, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজার-সহ বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে নতুন পাজেরো আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আপাতত ভারতের বাজারে পাজেরোর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নেই। ফলে ভারতীয় পাজেরোপ্রেমীদের জন্য নতুন প্রজন্মের এই এসইউভিকে আপাতত আন্তর্জাতিক বাজারের গাড়ি হিসেবেই দেখতে হবে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন
