Indian Two Wheeler: ভারত এ বছর স্বাধীনতার ৮০ বছর উদযাপন করছে। এ ই আট দশকে দেশ বদলেছে অনেকটাই। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি থেকে বাণিজ্য, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এসেছে বড় পরিবর্তন। কিন্তু উন্নতির সঙ্গে নিজেদের শিকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও ভারতীয়রা যোগাযোগ ধরে রেখেছে।
ভারতের দুই-চাকার গাড়ির জগতের গল্পটাও অনেকটা একই রকম। একসময় যে মডেলগুলি ছিল সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী, সময়ের সঙ্গে সেগুলিই কখনও হয়ে উঠেছে লাইফস্টাইল আইকন, কখনও আবার নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে ফিরে এসেছে নতুন অবতারে।
রয়্যাল এনফিল্ড: বন্দুক থেকে বুলেট, তারপর ৬৫০ সিসি
একসময় ব্রিটিশ সংস্থা হিসেবে বন্দুক তৈরি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল রয়্যাল এনফিল্ড। আজ সেই ব্র্যান্ডই ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় মোটরসাইকেল নির্মাতা।
রয়্যাল এনফিল্ডের সবচেয়ে বড় পরিচয় অবশ্যই বুলেট। এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদিত মোটরসাইকেল হিসেবে পরিচিত। ১৯৩২ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম বুলেট বাজারে আসে। সেই সময় ২৫০ সিসি, ৩৫০ সিসি এবং ৫০০ সিসির চার-স্ট্রোক সিঙ্গল-সিলিন্ডার ইঞ্জিন ছিল।
১৯৮৫ সালে রয়্যাল এনফিল্ড ইন্ডিয়ার ‘বুলেট মেরি জান’ বিজ্ঞাপন প্রচার মোটরসাইকেলটির ভাবমূর্তিতে বড় পরিবর্তন আনে। শুধুমাত্র ব্যবহারিক যানবাহন থেকে বুলেট হয়ে ওঠে স্বাধীনতা, শক্তি ও রুক্ষ জীবনযাপনের প্রতীক।
২০২০ সালে বিএস৬ নির্গমন বিধি চালু হওয়ার পর ৫০০ সিসির বুলেট বন্ধ হয়ে যায়। ভারতীয় মোটরসাইকেলপ্রেমীদের কাছে সেটি ছিল বড় ধাক্কা।
তবে ২০২৬ সালে আবার বড় বুলেট ফিরেছে ৬৫০ সিসি টুইন-সিলিন্ডার ইঞ্জিন নিয়ে। পুরনো বুলেটের চেনা নকশা ধরে রেখেই নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তির সঙ্গে ফিরে এসেছে কিংবদন্তি নামটি।
টিভিএস: টিভিএস ৫০ থেকে আইকিউব
ভারতের মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে টিভিএসের পরিচিতি তৈরি হয়েছিল টিভিএস ৫০ মোপেডের হাত ধরে।
টিভিএস ৫০ ছিল ভারতের প্রথম দুই-আসনের মোপেড। কম জ্বালানি খরচ, নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যবহারিক সুবিধার কারণে মধ্যবিত্ত পরিবার এবং ছোট ব্যবসার মানুষের কাছে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
একসময় চালক ও যাত্রীর পাশাপাশি ভারী মাল বহনের ক্ষেত্রেও টিভিএস ৫০ হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।
আজ সেই টিভিএসই বৈদ্যুতিক স্কুটারের দুনিয়ায় তৈরি করেছে টিভিএস আইকিউব। ব্যবহারিকতা, শক্তপোক্ত নির্মাণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণে আইকিউব এখন সংস্থার অন্যতম জনপ্রিয় বৈদ্যুতিক স্কুটার।
অ্যাপাচে: ১৫০ সিসি থেকে আরটিএক্স ৩০০
টিভিএসের কথা উঠলে অ্যাপাচে নামটিও বাদ দেওয়া যায় না।
২০০৫ সালে টিভিএস অ্যাপাচে ১৫০ দিয়ে অ্যাপাচে পরিবারের যাত্রা শুরু। দ্রুত ত্বরণ এবং স্পোর্টি ডিজাইনের জন্য মোটরসাইকেলটি দ্রুত নজর কেড়েছিল।
দুই দশক পরে অ্যাপাচে পরিবার অনেকটাই বদলে গিয়েছে। বর্তমানে এই ব্র্যান্ডের অন্যতম বড় নাম অ্যাপাচে আরটিএক্স ৩০০, যেখানে পারফরম্যান্স, আধুনিক প্রযুক্তি এবং রাস্তায় নজরকাড়া উপস্থিতির উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
হিরো মোটোকর্প: স্প্লেন্ডরের অবিশ্বাস্য যাত্রা
১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হিরো মোটোকর্পের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলির একটি স্প্লেন্ডর। হিরো-হোন্ডা যৌথ উদ্যোগের সময়ে ১৯৯৪ সালে ভারতে প্রথম স্প্লেন্ডর আসে। সাশ্রয়ী দাম, নির্ভরযোগ্যতা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের কারণে খুব দ্রুত ভারতীয় পরিবারের অন্যতম পছন্দ হয়ে ওঠে এই মোটরসাইকেল।
আজও হিরো স্প্লেন্ডর প্লাস ভারতের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া মোটরসাইকেলগুলির মধ্যে অন্যতম। তবে হিরোর গল্প শুধু কমিউটার মোটরসাইকেলেই আটকে থাকেনি। ২০১১ সালে সংস্থা ইমপালস বাজারে আনে। এটি ছিল অফ-রোডিংয়ের জন্য তৈরি প্রথম ভারতীয় মোটরসাইকেলগুলির অন্যতম। বাজারে প্রত্যাশামতো সাফল্য না পাওয়ায় ২০১৭ সালে ইমপালস বন্ধ হয়ে যায়।
পরে সেই অফ-রোডিং ভাবনাই নতুন প্রজন্মে ফিরে আসে এক্সপালস ২০০ ৪ভি এবং এক্সপালস ২১০-এর মতো মডেলে।
বাজাজ: চেতক থেকে পালসার
ভারতের দুই-চাকার ইতিহাসে বাজাজের অবদানও বিশাল। তবে ব্র্যান্ডটির সবচেয়ে পরিচিত দুটি নাম হল চেতক এবং পালসার। ১৯৭২ সালে বাজারে আসে বাজাজ চেতক। মহারানা প্রতাপের বিশ্বস্ত ঘোড়া চেতকের নামে নামকরণ করা এই স্কুটার দ্রুত ভারতীয় পরিবারের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে।
সাশ্রয়ী দাম, নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যবহারিকতার জন্য চেতক বহু বছর ধরে ভারতীয় মধ্যবিত্তের পছন্দ ছিল। ২০২০ সালে বাজাজ নতুন যুগের চেতক ফিরিয়ে আনে বৈদ্যুতিক স্কুটার হিসেবে। ধাতব বডি এবং রেট্রো ডিজাইনের সঙ্গে আধুনিক বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির মিশেল ঘটানো হয়।
অন্যদিকে, ২০০১ সালে আসে বাজাজ পালসার ১৫০ এবং ১৮০। পেশিবহুল ডিজাইন, গোল হেডল্যাম্প, বড় ১৮ লিটারের জ্বালানি ট্যাঙ্ক এবং ৫-স্পিড গিয়ারবক্সের মাধ্যমে পালসার ভারতের স্পোর্টস-কমিউটার মোটরসাইকেলের বাজারে নতুন অধ্যায় তৈরি করে।
২৫ বছর পরেও পালসার ব্র্যান্ড শক্তিশালী। বর্তমানে পালসার এন, এনএস, আরএস এবং ক্লাসিক সিরিজে ১২৫ সিসি থেকে ৩৫০ সিসি পর্যন্ত একাধিক মডেল রয়েছে।
কাইনেটিক: ডিএক্স থেকে বৈদ্যুতিক ডিএক্স প্লাস
১৯৮৪ সালে ভারতে আসে কাইনেটিক ডিএক্স। ৯৮ সিসির দুই-স্ট্রোক, গিয়ারলেস স্কুটারটি শহুরে যাতায়াতে বড় পরিবর্তন এনেছিল।
সেলফ-স্টার্ট এবং স্বয়ংক্রিয় ট্রান্সমিশনের মতো সুবিধা সেই সময় এটিকে বিশেষ করে তুলেছিল। পাশাপাশি মহিলাদের ও তরুণীদের স্বাধীনভাবে স্কুটার চালানোর ক্ষেত্রেও কাইনেটিক ডিএক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
২০২৫ সালে কাইনেটিক আবার ফিরেছে তার পরিচিত নাম নিয়ে, তবে সম্পূর্ণ নতুন বৈদ্যুতিক অবতারে। কাইনেটিক ডিএক্স প্লাসে পুরনো বক্সি রেট্রো ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি।
কীলেস পাসকোড স্টার্ট, রিট্র্যাক্টেবল অনবোর্ড চার্জার এবং ৩৭ লিটারের বুট স্পেসের মতো বৈশিষ্ট্য নতুন প্রজন্মের ডিএক্সকে পুরনো মডেলের থেকে আলাদা করেছে।
ইয়ামাহা: আরএক্স১০০ থেকে আর১৫
ইয়ামাহা জাপানি সংস্থা হলেও ভারতের দুই-চাকার ইতিহাসে এই ব্র্যান্ডের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
ইয়ামাহা আরএক্স১০০ ভারতীয় মোটরসাইকেলপ্রেমীদের কাছে এখনও একটি কিংবদন্তি নাম। ১৯৮৫ সালে ইয়ামাহা জাপান এবং ভারতের এসকর্টস গ্রুপের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারতে আসে আরএক্স১০০।
৯৮ সিসির দুই-স্ট্রোক ইঞ্জিন, দুর্দান্ত পাওয়ার-টু-ওয়েট রেশিও, দ্রুত ত্বরণ, বিশেষ এক্সহস্টের শব্দ এবং সহজ রক্ষণাবেক্ষণ মোটরসাইকেলটিকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
আরএক্স১০০ যেখানে আশির দশকে হালকা ওজনের মোটরসাইকেলে কাঁচা গতি ও ত্বরণের সংজ্ঞা তৈরি করেছিল, পরবর্তী সময়ে ইয়ামাহা আর১৫ সেই পারফরম্যান্সের দর্শনকে অন্য স্তরে নিয়ে যায়।
আর১৫-এ ট্র্যাক থেকে অনুপ্রাণিত হ্যান্ডলিং, স্পোর্টি ডিজাইন এবং উচ্চ-রেভিং ইঞ্জিনের মাধ্যমে ভারতীয় রাইডারদের কাছে ইয়ামাহার পারফরম্যান্সের নতুন পরিচয় তৈরি হয়েছে।
আট দশকে বদলেছে বাইক, বদলায়নি আবেগ
রয়্যাল এনফিল্ডের বুলেট, টিভিএস ৫০, হিরো স্প্লেন্ডর, বাজাজ চেতক, পালসার, কাইনেটিক ডিএক্স কিংবা ইয়ামাহা আরএক্স১০০, একসময় এগুলি ছিল ভারতের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের সঙ্গী।
আজ সেই একই নামের অনেকগুলি ফিরে এসেছে আরও শক্তিশালী ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি, উন্নত নিরাপত্তা এবং আধুনিক ফিচার নিয়ে।
ভারতের দুই-চাকার শিল্পের এই বিবর্তন আসলে দেশেরই পরিবর্তনের গল্প। প্রযুক্তি বদলেছে, ডিজাইন বদলেছে, মানুষের চাহিদা বদলেছে। কিন্তু পুরনো ব্র্যান্ডগুলির সঙ্গে তৈরি হওয়া আবেগ এখনও একই রয়ে গিয়েছে।
Also Read | পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব
Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা
Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন
Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের
