ঢাকা: পারস্পরিক আস্থা, আত্মবিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, কূটনৈতিক আলোচনা এবং মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের (Tarique Rahman) ভারত সফর হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি না হলে এবং সফরের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হলে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা খুবই কম।
কেন পিছিয়ে গেল সম্ভাব্য ভারত সফর?
চলতি সপ্তাহে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক ভারত সফর নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। এর পিছনে বাংলাদেশে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনা গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাউথ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ওই ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। যদিও ভারত স্পষ্ট করেছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না এবং সেখানে প্রকাশিত মতামতকেও ভারত সরকার সমর্থন করেনি।
Also Read | ফাতাহ-৩ পরীক্ষার প্রস্তুতি? ৭৫০ কিমি আকাশসীমা বন্ধ পাকিস্তানের
ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ স্পষ্টভাবে নির্ধারিত না করে ঢাকা কোনও সফর তাড়াহুড়ো করে করতে চাইছে না। তবে দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে ঢাকা ইতিবাচক মনোভাব দেখাবে বলেও তিনি জানান। কবিরের কথায়, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে দুই দেশের ঐকমত্য, উপযুক্ত পরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ না পাওয়া পর্যন্ত ব্রিকস সম্মেলনের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা ‘ক্ষীণ’।

Also Read | পাকিস্তানকে ফের রক্তাক্ত করল BLA! শেষ ৮ দিনে শেষ ২৬ পাক সেনা
ভারতও সম্পর্ক উন্নত করতে আগ্রহী
অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার জন্য বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারতীয় হাইকমিশনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান। তিনি জানান, মোদির পক্ষ থেকে তাঁর বার্তা হল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করলে তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে স্বাগত জানানো হবে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আরও শক্তিশালী যোগাযোগ ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই উপকারী হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তারেক রহমানের ভারত সফরকে ‘স্মরণীয়’ করে তুলতে মোদি আগ্রহী বলেও জানান তিনি। ত্রিবেদী আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সম্পর্কের জন্য পারস্পরিক আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশ বিভিন্ন সময়ে কিছু ‘হেঁচকা’ বা মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে গেলেও সেগুলি যেন বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে দুর্বল না করে, সে বিষয়ে জোর দেওয়া দরকার।
Also Read | ভারত-মার্কিন বাণিজ্যে ঘুচুক জট! কর ও নীতিতে স্থিরতার বার্তা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের
সম্পর্কের কেন্দ্রে এখনও শেখ হাসিনা ইস্যু
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিতর্ক এখনও অন্যতম বড় সমস্যা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৫ আগস্ট হাসিনাকে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে সরিয়ে নিয়ে যায়। এরপর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের দিল্লির হিন্দন বিমানঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানায়। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি এখনও ‘পর্যালোচনাধীন’।
হাসিনাকে নিয়ে ঢাকার ক্ষোভ
হুমায়ুন কবিরের অভিযোগ, ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা তৈরির কোনও কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া কিংবা কোনও দণ্ডিত ব্যক্তি, সন্ত্রাসী বা খুনিকে সেখানে জায়গা দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের বহু মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতির ভিত্তিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার যুক্তিতেও তা সমর্থন করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে হাসিনার সমর্থকদের বক্তব্য, তারেক রহমানও দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানকালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। সেই সময় তাঁকে একাধিক মামলায় অনুপস্থিতিতে দোষী সাব্যস্ত ও সাজা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই মামলাগুলির রায় ও সাজা বাতিল হওয়ার পর তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফেরেন এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে অংশ নেন। ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন শুধু প্রধানমন্ত্রীর সফর নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং শেখ হাসিনা-সংক্রান্ত মতপার্থক্য কীভাবে সামলানো যায়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
