নয়াদিল্লি: নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) অন্দরের মতপার্থক্য নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ২৯ জুলাই কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে পাঠানো চিঠি নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এল। নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশি যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, সেটি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে ছিল না। বরং ইসিআই-তে ডেপুটেশনে থাকা এক সিনিয়র ডেপুটি ইলেকশন কমিশনার বা ডিইসির কাজকর্ম নিয়ে ওই চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির বক্তব্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস।
২৯ জুলাইয়ের ওই চিঠির বিষয়বস্তু অবশ্য প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিষয়টি গোপনীয় বা ‘ক্লাসিফায়েড’ হওয়ায় চিঠিতে ঠিক কী লেখা হয়েছিল, তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
চিঠিটি জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে নয়
নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি পাঠানোর খবর সামনে আসার পর থেকেই কমিশনের অভ্যন্তরে সিইসি জ্ঞানেশ কুমার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে নতুন তথ্য অনুযায়ী, ২৯ জুলাইয়ের চিঠিটি কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত বা সিইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে ছিল না। বরং ইসিআইয়ের সঙ্গে ডেপুটেশনে থাকা এক সিনিয়র ডেপুটি ইলেকশন কমিশনারের কাজের ধরন নিয়ে ওই যোগাযোগ করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, কোনও সিনিয়র আধিকারিকের কাজকর্ম নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের উদ্বেগ থাকলে সাধারণত বিষয়টি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নজরে আনা হয়। আর যদি অভিযোগ বা যোগাযোগ সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে লক্ষ্য করে হয়, তাহলে তার জন্য আলাদা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: বিশ বছর অপেক্ষা নয়! পঞ্চম প্রযুক্তির আধুনিক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বার্তা বিমানবাহিনী প্রধানের
ইসির ব্যাখ্যাতেও একই তথ্য
চিঠি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর শনিবার নির্বাচন কমিশন একটি বৈঠক করে। বৈঠকের পর প্রকাশিত বিবৃতিতে ইসি স্পষ্ট করে জানায়, ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো চিঠি কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত বা কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না।
ইসির বক্তব্য অনুযায়ী, চিঠিটি ইসিআই-তে ডেপুটেশনে থাকা এক আধিকারিকের কাজকর্ম নিয়ে ছিল। ওই আধিকারিক কাজের পুনর্বণ্টন সংক্রান্ত কিছু নির্দেশ জারি করেছিলেন। তবে দুই নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশের পর সেই কাজের পুনর্বণ্টনের আদেশ বাস্তবে কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ওপর ডেপুটি ইলেকশন কমিশনারের নজরদারিও প্রত্যাহার করা হয়নি বলে কমিশন জানিয়েছে।
ইসির অন্দরের মতপার্থক্য নিয়ে বিতর্ক
এই চিঠির বিষয়টি সামনে আসার সময়েই নির্বাচন কমিশনের কাজের ধরন নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইসির প্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং ইসিনেট বা ইসিআইনেট প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের উদ্বেগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, সান্ধু এবং যোশি বিভিন্ন সময়ে ইসির সিদ্ধান্ত ও কাজের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি বা মতামত জানিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্বেগের একটি অংশ ছিল ভোটার তালিকা পরিচালনার প্রযুক্তি ব্যবস্থায় মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের প্রবেশাধিকার এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয়করণ।
তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক অংশ। কমিশনের দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে এবং এসআইআর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলিও কমিশনের সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করেছেন।
ইসিনেট নিয়ে কী বলেছে কমিশন?
ইসিনেট নিয়ে ওঠা প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের দায়িত্ব ও আইনগত ক্ষমতার ভিত্তিতে ইসিনেটে ভূমিকা-ভিত্তিক প্রবেশাধিকার রয়েছে।
ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইসিনেট ব্যবস্থাটি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছে। একজন সিনিয়র ডেপুটি ইলেকশন কমিশনারের নেতৃত্বে এই কমিটিতে আইআইটি বা আইআইআইটির একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞও থাকবেন। কমিটি পরীক্ষা করবে, ইসিনেট সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করছে কি না। এরপর তারা কমিশনের কাছে রিপোর্ট জমা দেবে।
কমিশন আরও জানিয়েছে, রাজ্যগুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছ থেকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে গত কয়েক মাসে ইসিনেটে একাধিক পরিবর্তন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত নতুন উদ্যোগ নেওয়ার আগে আধিকারিকদের কমিটিতে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা করা হবে বলেও ইসি জানিয়েছে।
বিতর্কের মধ্যে কমিশনের অবস্থান
চিঠি, ইসিনেট এবং ভোটার তালিকার এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। কমিশনের বক্তব্য, প্রশাসনিক বা নীতিগত বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার অংশ। একই সঙ্গে কমিশন জানিয়েছে, আইন ও বিধি মেনেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে।
ফলে ২৯ জুলাই ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো চিঠিকে সরাসরি সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পাঠানো চিঠি হিসেবে দেখার যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, নতুন তথ্য ও নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যায় তার ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। চিঠিটি মূলত ইসিআই-তে ডেপুটেশনে থাকা এক সিনিয়র ডেপুটি ইলেকশন কমিশনারের কাজকর্ম সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ছিল।
