কলকাতার হাসপাতালে ফুসফুসের রোগী বাড়ছে ২৫%, ইনফ্লুয়েঞ্জা-নিউমোনিয়ায় উদ্বেগ

কলকাতা: শহরের (Kolkata) বিভিন্ন হাসপাতালে এ বছর ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের রোগ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্ব ফুসফুস দিবস উপলক্ষে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, গত…

kolkata-hospitals-lung-disease-patients-rise-25-percent-influenza-pneumonia

কলকাতা: শহরের (Kolkata) বিভিন্ন হাসপাতালে এ বছর ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের রোগ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্ব ফুসফুস দিবস উপলক্ষে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় বিভিন্ন হাসপাতালে ফুসফুসের রোগে ভর্তি প্রায় ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কয়েকটি হাসপাতালে আবার এই বৃদ্ধির হার আরও বেশি। কোথাও রোগীর সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ, আবার কোথাও ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

Advertisements

চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় শুধু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, অনেক ক্ষেত্রেই সংক্রমণের তীব্রতাও আগের তুলনায় বেশি। ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দি-কাশি ও অন্যান্য ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন বহু মানুষ। অনেক রোগীকেই অক্সিজেন ও আইসিইউয়ের প্রয়োজন হচ্ছে।

   

কোভিডের পর বদলেছে কি শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ধরন?

নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতালের পরামর্শদাতা পালমোনোলজিস্ট সুজন বর্ধনের বক্তব্য, কোভিডের পর ভাইরাসজনিত সংক্রমণ আরও ঘন ঘন এবং তীব্রভাবে দেখা যাচ্ছে। তাঁর দাবি, যাঁদের আগে খুব সামান্য বা মাঝে মধ্যে ব্রঙ্কোস্পাজমের সমস্যা ছিল, তাঁদের একটি অংশ এখন পূর্ণমাত্রার অ্যাজমায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

বর্ধন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগের বছরগুলির তুলনায় ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ-র মতো ভাইরাসজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে তীব্রতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা রোগীদের মধ্যে গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। তাঁদের অনেকেরই নন-ইনভেসিভ অথবা ইনভেসিভ ভেন্টিলেটরি সাপোর্টের প্রয়োজন হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতিকে সরাসরি কোভিডের পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফল হিসেবে দেখছেন না সব চিকিৎসক।

Advertisements

Read More: রাতের অন্ধকার, জেলিফিশ আর প্রতিকূল ঢেউকে হারিয়ে ক্যাটলিনা চ্যানেল জয় করলেন বঙ্গ তনয়া

চ্যারনক হাসপাতালে জুন থেকে কমেনি রোগীর চাপ

চ্যার্নক হাসপাতালে জুন মাসে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকেই ফুসফুসের রোগীদের চাপ কমেনি। বর্তমানে সেখানে ১৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আইসিইউতেও চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের পালমোনোলজি বিভাগের প্রধান সৌম্য সেনগুপ্ত সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় ফুসফুসের রোগে ভর্তি প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি রোগের তীব্রতাও বেশি।

তাঁর মতে, বিভিন্ন বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দি-কাশির সংক্রমণ অনেক সময় গুরুতর নিউমোনিয়ায় পরিণত হচ্ছে। ফলে অক্সিজেন এবং আইসিইউয়ের প্রয়োজন হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতির কারণ হিসেবে কোভিড-পরবর্তী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ব্যাখ্যা তিনি মানতে নারাজ। তাঁর মতে, কোভিডের পর আরও তীব্র ইনফ্লুয়েঞ্জা স্ট্রেনের প্রভাবও এর অন্যতম কারণ হতে পারে।

সেনগুপ্ত আরও জানিয়েছেন, কোভিডের পর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। টিকা নেওয়া বহু রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে হালকা হওয়ায় তাঁদের চিকিৎসা সহজ হয়েছে।

Read More: জয়ের স্বপ্নভঙ্গ! রিঙে এগিয়ে থেকেও ইনজুরির জেরে ছিটকে গেলেন ভারতীয় বক্সার সুমিত কুণ্ডুু

সিএমআরআইয়ে ফুসফুসের রোগী বেড়েছে ২৫ শতাংশ

কলকাতার সিএমআরআই হাসপাতালে পরিস্থিতি আরও উল্লেখযোগ্য। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় ফুসফুসের রোগীর সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। সিএমআরআইয়ের পালমোনোলজি বিভাগের পরিচালক রাজা ধর জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী বর্ষাকাল এবং তার সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য ভাইরাসের সংক্রমণ এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, এই সংক্রমণগুলি এখন দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং বেশি সংখ্যক মানুষকে আক্রান্ত করছে। হাসপাতালের পালমোনোলজি আইসিইউগুলিও নিয়মিতভাবে পূর্ণ থাকছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

রাজা ধর মাস্ক ব্যবহার, হাতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে যাঁরা বয়স্ক এবং আগে থেকেই ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বিপি পোদ্দার হাসপাতালেও রোগীর চাপ বাড়ছে

বিপি পোদ্দার হাসপাতালের পালমোনোলজিস্ট অভিষেক কোলায়ের মতে, ফুসফুসের রোগ নিয়ে আসা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীর অতীতে কোভিড বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতার ইতিহাস রয়েছে।

হাসপাতালের চেস্ট ক্লিনিকের ওপিডিতে গত বছরের তুলনায় রোগীর চাপ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। একই ধরনের প্রবণতা হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি কোভিডের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না বলে জানিয়েছেন কোলায়। তাঁর মতে, অতীতে হওয়া দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের কারণে কিছু মানুষের শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা বেড়ে গিয়ে থাকতে পারে। ফলে পরিবেশগত পরিবর্তন বা ভাইরাসের সংক্রমণে তাঁদের অ্যাজমা, সিওপিডি বা অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা ফের বেড়ে যেতে পারে।

Read More: ইতিহাস গড়েও সোনা অধরা! এশিয়ান গেমসে রূপোতেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো রোশাবিনাকে

গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা, কমেনি শ্বাসযন্ত্রের রোগ

বিপি পোদ্দার গ্রুপের উপদেষ্টা সুপ্রিয় চক্রবর্তী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এ বছর যে বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে পড়েছে তা হল শ্বাসযন্ত্রের রোগের চাপ কোনও একটি ছোট মরসুমি সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা পর্যন্ত ওপিডি এবং হাসপাতালে ভর্তি, দুই ক্ষেত্রেই রোগীর ধারাবাহিক চাপ দেখা গেছে। অনেক রোগী দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাসকষ্ট, শ্বাস নেওয়ার সময় সাঁই সাঁই শব্দ এবং অ্যাজমা বা সিওপিডির আকস্মিক সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন।

চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে বয়স্ক, দীর্ঘদিনের ফুসফুসের রোগী এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মাস্ক ব্যবহার, হাত পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া এবং শ্বাসকষ্ট বা দীর্ঘস্থায়ী কাশির মতো উপসর্গকে অবহেলা না করার উপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

Advertisements